১১ বৈশাখ ১৪২৪, মঙ্গলবার ২৫ এপ্রিল ২০১৭ , ১:০৭ পূর্বাহ্ণ
bangla fonts
facebook twitter google plus rss
Laisfita

একই কায়দায় ৭জনকে হত্যার পর ইট বেঁধে ফেলে দেয় শীতলক্ষ্যায়


০৯ জানুয়ারি ২০১৭ সোমবার, ০৮:৪৯  পিএম

নিউজ নারায়ণগঞ্জ


একই কায়দায় ৭জনকে হত্যার পর ইট বেঁধে ফেলে দেয় শীতলক্ষ্যায়
ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডারের ঘটনায় ৭জনকে হত্যাকান্ডের ঘটনায় একই পন্থা ও কায়দা অবলম্বন করা হয়। নিহতদের মধ্যে সবাইকে একই স্টাইলে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। যাতে করে লাশ ভেসে উঠতে না পারে। উদ্ধার করা লাশের সবারই হাত পা বাঁধা ছিল, পেটে ছিল ফাঁড়া। ১২টি করে ইট ভর্তি সিমেন্টের বস্তার দুটি বস্তা বেঁধে দেওয়া হয় প্রতিটি লাশের সাথে। তাদের সবার লাশের মুখ ছিলো ডাবল পলিথিন দিয়ে মোড়ানো।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাশ ৭টি এক কিলোমিটারের মধ্যে পায়ে ২৪টি করে ইট বোঝাই সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ছিল নদীতে ডোবানো ছিল। পা ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধা। হাত পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। মুখমন্ডল ডাবল পলিথিন দিয়ে গলার কাছে বাধা ছিল। পেট ধারালো অস্ত্র দিয়ে সোজাসুজি ফাড়া ছিল।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সবারই হাত-পা বাঁধা ছিল। পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন। প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তা বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শান্তিনগর এলাকা সংলগ্ন নদীতে কয়েকটি লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। এরপর পুলিশ গিয়ে নদীর এক কিলোমিটারের মতো এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একে একে ছয়টি লাশ তুলে আনে। পরে যার যার স্বজনরা লাশগুলো সনাক্ত করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা লাশ উদ্ধারের সময় লাশের অবস্থা দেখে তাদের হত্যার লোমহর্ষক কথা মনে করে আতঁকে উঠে। এ সময় তাদের মন্তব্য করতে শোনা যায় দেশের ইতিহাসে এমন জঘণ্যতম ঘটনা আর ঘটেছে কিনা তা তাদের জানা নেই।

নারায়ণগঞ্জে কাউন্সিলর ও আইনজীবীসহ সাত জনকে অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনায় কয়েকজন ছাড়া সবাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিল।

অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের চেষ্টার পুরো বিষয় নিজে উপস্থিত থেকে তদারক করেন র‌্যাব ১১-এর মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। হত্যার পর লাশ ফেলে ফেরার পথে লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ ও মেজর (অব.) আরিফ হোসেনকে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশের মুখোমুখি হতে হয়। এসময় তারা বলেন, আমরাও আপনাদের মতো ‘ওদের’ উদ্ধারে অভিযানে রয়েছি। এরপর পুলিশ তাদের আর কিছু বলেনি। তবে লে. কমান্ডার এম এম রানা কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই তার ক্যাম্পে ফিরে যান।

সূত্র জানায়, অপহরণ থেকে হত্যাকান্ড শেষ হওয়া পর্যন্ত নূর হোসেনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেছেন আরিফ। নূর হোসেন ও আরিফের মধ্যে কথোপকথনের একটি অডিও টেপ মামলার তদন্তকারী টিমের হাতে রয়েছে। নূর হোসেনের সঙ্গে আরিফের সখ্য ছিল আগে থেকেই। আরিফ র‌্যাব-১১ আদমজী ক্যাম্পে যোগদান করার অল্প সময়ের মধ্যে নূর হোসেনের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়। এরপর থেকে আরিফ হোসেন বিভিন্নভাবে নূর হোসেনের কাছ থেকে ব্যাপক আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। ঢাকার মাটিকাটা এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট নিয়েছেন। এর টাকা দিয়েছেন নূর হোসেন।

যেভাবে অপহরণ ও হত্যা: নাসিক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে অপহরণের দিনক্ষণ আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি চাঁদাবাজির মামলায় স্থায়ী জামিন নিতে নজরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ আদালতে আসবে। এ সম্পর্কে মেজর (অব.) আরিফ হোসেন নিশ্চিত হন। নিশ্চিত হয়েই সকালেই অপহরণ পার্টিকে বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড় করানো হয়। সাদা পোশাকে একটি টিম নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নেয়। তারা সার্বক্ষণিক মেজর আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। নজরুল ইসলাম সেদিন তার গাড়ি না এনে তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়ি ব্যবহার করেন। স্বপনের সাদা রঙের এক্স করোলা প্রাইভেটকার যোগে নজরুল ইসলাম আদালত প্রাঙ্গণে আসেন।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অন্তবর্তীকালীন জামিন নিয়ে আদালত থেকে একটি সাদা প্রাইভেটকারযোগে নজরুল ইসলাম বের হওয়ার পরপরই মেজর আরিফের কাছে খবর পৌঁছে দেয় আদালতের আশপাশে অবস্থান নেয়া সাদা পোশাকের র‌্যাব সদস্যরা। নজরুলের সঙ্গে একই গাড়িতে নজরুলের সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম। গাড়ি ড্রাইভ করে স্বপনের ব্যক্তিগত গাড়িচালক জাহাঙ্গীর। নজরুলদের গাড়ির পেছনে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি। নজরুলদের বহনকারী গাড়িটি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোড হয়ে উত্তর দিকে যাওয়ার পথে ফতুল্লা স্টেডিয়ামের সন্নিকটে (ময়লা ফেলার স্থান) পৌঁছার পর মেজর আরিফের নেতৃত্বে গাড়ির গতি রোধ করা হয়। নজরুলের গাড়ির পেছনে ছিল আইনজীবী চন্দন সরকারের গাড়ি। পরে দু’টি গাড়ি থেকে সাত জনকে র‌্যাবের দু’টি গাড়িতে তুলে নেয়া হয় অস্ত্র দেখিয়ে। গাড়িতে তাদের ওঠানোর পর একে একে প্রত্যেকের শরীরে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করা হয়। অচেতন হওয়া সাত জনকে কয়েক ঘণ্টা তাদের গাড়িতেই রাখা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় নরসিংদীতে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পরিকল্পনা মতে কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু-পাথর ব্যবসাস্থল জনমানুষ শূন্য করার জন্য নূর হোসেনকে ফোন দেয় মেজর (অব.) আরিফ হোসেন। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর র‌্যাবের গাড়ি ওই স্থানে পৌঁছায়। গাড়ির ভেতরই অচেতন প্রত্যেকের মাথা ও মুখ পলিথিন দিয়ে মোড়ানো হয়। পরে গলা চেপে ধরার পর একে একে শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যায় সাত জন। পরে সাত জনের নিথর দেহ গাড়ি থেকে নামানো হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৫ নম্বর ঘাট থেকে র‌্যাবের নির্দিষ্ট নৌকা নিয়ে যাওয়া হয় কাঁচপুর ব্রিজের নিচে। লাশগুলো নৌকায় উঠিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে যাওয়ার পথে ‘নির্দিষ্ট স্থান’ থেকে লাশ গুমের উপকরণ নৌকায় তোলা হয়। নৌকার মধ্যেই একে একে প্রত্যেকটি লাশের সঙ্গে ইট বাঁধা হয়। একটি করে ফুটো করে দেয়া হয় নাভির নিচে-গ্যাস বের হয়ে যাতে লাশ ভেসে না ওঠে। তারপর শীতলক্ষ্যা নদীর নির্দিষ্ট স্থানে লাশগুলো ফেলে দেয়া হয়। পুরো অপারেশনে র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাসহ অনেকেই অংশ নেয়। লাশ ফেলে নৌ পুলিশ ফাঁড়ি সংলগ্ন ঘাট দিয়ে উঠে শহরের ভেতর দিয়ে নিজ গন্তব্যে পৌঁছার পথে শহরের হাজীগঞ্জে পুলিশ চেকপোস্টে লে. কর্নেল তারেক সাঈদ পুলিশের মুখোমুখি হয়। এসময় তারেক সাঈদ দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে বলেন, ‘আমরা আপনাদের মতো ‘ওদের’ উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছি।’ তখন পুলিশ আর কিছু বলেনি। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা লিংক রোডে ফতুল্লা মডেল থানার এক কর্মকর্তার মুখোমুখি হয় মেজর আরিফ হোসেন। মেজর আরিফকে দেখে ওই পুলিশ কর্মকর্তা আর কিছু বলেননি।


নিউজ নারায়াণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:

Shirt Piece
মহানগর -এর সর্বশেষ