৬ শ্রাবণ ১৪২৪, শুক্রবার ২১ জুলাই ২০১৭ , ১০:৩৯ অপরাহ্ণ

diamond world

বাবাকে যা বললেন আইভী


|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১১:৩৪ পিএম, ৯ জানুয়ারি ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ০৮:৪৬ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৭ বুধবার


বাবাকে যা বললেন আইভী

নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা বিলুপ্ত করেই গঠন করা হয় সিটি করপোরেশন। সেই পৌরসভায় দুইবারের জনপ্রতিধি ছিলেন আলী আহাম্মদ চুনকা। তিনি যে চেয়ারে বসে দাপ্তরিক কাজ করতেন সেই চেয়ারটি এখনো নিজের চেয়ারের পাশেই রেখে দিয়েছেন মেয়ে আইভী। হাতের ডান পাশে থাকা সেই চেয়ারেই থাকে বাবা চুনকার বাধাই করা একটি ছবি।

৯জানুয়ারী সোমবার তখন সকাল সাড়ে ১১টা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের দ্বিতীয় তলায় মেয়রের কক্ষে প্রবেশ করেই হাতে থাকা ফুলগুলো দিলেন বাবা আলী আহাম্মদ চুনকার ছবির পাশে। ছবির সামনে দাঁড়িয়ে টলমল চোখে বলতে লাগলো ‘বাবা আমি তোমাকে কথা দিয়েছিলাম আবার আসবো, এসেছি’।

কথাগুলো বলেই কিছুটা আবেগ আপ্লুত হয়ে আবারও নিজের চেয়ারেই বসেন আইভী যে চেয়ার ছেড়ে প্রস্থান করেছিলেন গত ২৩ নভেম্বর। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারী হতে আইভী বসছেন এ চেয়ারটিতেই।

বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে একবার দলের সমর্থন ও অপরবার সমর্থন ছাড়াই টানা দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলী আহাম্মদ চুনকা যাঁকে নারায়ণগঞ্জবাসী ‘পৌরপিতা’ উপাধি দেয়। কিন্তু তৃতীয়বার নির্বাচনে তিনি পরাজয় বরণ করেন। তবে মেয়ে হিসেবে প্রথম দুইবার বাবার পথে থাকলেও তৃতীয়বার সে রীতি ভঙ্গ করতে সক্ষম হয়েছেন সেলিনা হায়াৎ আইভীকে যাকে এখন নারায়ণগঞ্জবাসী এক ‘বিস্ময়ের নারী’ বলেই আখ্যা দিয়েছেন।

২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দ্বিতীয় নির্বাচন। এখানেও ৭৯ হাজার ৫৬৭ ভোটে আইভী পরাভূত করেন বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খানকে। আর এ জয়ে টানা তৃতীয়বারের মত হ্যাটট্রিক জয়ী হয়েছেন আইভী।

চুনকা ও নির্বাচন

১৯৩৪ সালে ১৬ডিসেম্বর দেওভোগের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আলী আহাম্মদ চুনকা জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ওয়াহেদ আলী, মাতার নাম গোলেনুর বেগম। ১৯৫২ সালে তিনি মহান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে জনমত গড়ে তুলতে স্বক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৮ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ মহকুমা থেকে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অসামান্য অবদান রাখেন। ১৯৭১ সালে তিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং যুদ্ধে তরুণ ও যুব সমাজকে সংগঠিত করেন। চুনকা শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ পাট শ্রমিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭৪ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নিজ দল আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি তৎকালীন দলের স্থানীয় সাধারণ মানুষের নেতা আলী আহমদ চুনকা। দলের সমর্থন পান মহিউদ্দিন আহমেদ খোকা। এই নির্বাচনে একই দলের খাজা মহিউদ্দিনও প্রার্থী হন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলী আহমদ চুনকাই সর্বাধিক ভোটে বিজয়ী হন। তিন বছর পর ১৯৭৭ সালে তিনি টানা দুইবারের মত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে ১৯৮৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চুনকার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন দেওভোগ এলাকার নাজিমউদ্দিন মাহমুদ। নির্বাচনে চুনকা পরাজয় বরণ করেন। ১৯৮৪ সালের ২৫ফেব্রুয়ারী সুবে সাদিক এর সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ আলী আহাম্মদ চুনকা ইন্তেকাল করেন।


আইভীর নির্বাচন

২০০৩ সালের ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচনের মাত্র ১৭দিন আগে নিউজিল্যা- থেকে তাকে উড়িয়ে দেশে আনা হয়। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিয়ে তার পক্ষে নারায়ণগঞ্জে জোর প্রচারণা চালান দলের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও ১৬ হাজারের বেশী ভোটে বিপলু ভোটে পরাজিত করেন বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম সরদারকে। ওই বছরের (২০০৩) ২ ফেব্রুয়ারী দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১১ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত একটানা পৌর চেয়ারম্যানের আসনে বসে উন্নয়নের চেষ্টা করেন তিনি।

২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোট। কিন্তু ওই নির্বাচনে অনেক নাটকীয়তার পর আওয়ামী লীগ সমর্থন দেয় প্রভাবশালী শামীম ওসমানকে। তবে দলের সিনিয়র নেতাদের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাজিমাত ঘটান আইভী। নির্বাচনে ৬ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে শামীম ওসমান (দেওয়াল ঘড়ি) ৭৮ হাজার ৭০৫, সেলিনা হায়াত আইভী (দোয়াত কলম) ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পান। টানা দ্বিতীয়বারের মত নির্বাচিত হন আইভী।

২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনটি হয় দলীয় প্রতীকে। এ নির্বাচনেও নাটকীয়তার পর নৌকা প্রতীক পান আইভী। আর ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাখাওয়াত হোসেন খান। নির্বাচনটিকে ঘিরে সবার কৌতুহল ছিল কী ঘটবে। বিএনপির প্রার্থী শুরু থেকেই নিরব বিপ্লব ঘটবে বলে ধারণা করেন। অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেন নির্বাচনে বাবার পথে হাটবেন নাকি তিনি বাবার সেই রীতির ভঙ্গ করবেন। তবে নানা নাটকীয়তার পর সুষ্ঠু ভোটেও আইভী বাজিমাত দেখাান। নির্বাচনে ১৭৪ কেন্দ্রে সেলিনা হায়াৎ আইভী (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) প্রতীক : নৌকা পেয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ৬১১ ভোট। সাখাওয়াত হোসেন খান (জাতীয়তবাদী দল বিএনপি) প্রতীক : ধানের শীষ পেয়েছেন ৯৬ হাজার ০৪৪ ভোট। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির কোদাল প্রতীকের মাহাবুবুর রহমান ইসমাইল পেয়েছেন ৬৭৪ ভোট, মিনার প্রতীকে ইসলামী ঐক্যজোটের এজহারুল হক পেয়েছেন ৯১০ ভোট, হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মাসুম বিল্লাহ পেয়েছেন ১৩ হাজার ৯১৪ ভোট, হাতঘড়ি প্রতীকের কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস পেয়েছেন ৪৮০ ভোট ও ছাতা প্রতীকে এলডিপির কামাল প্রধান পেয়েছেন ৪৩২ ভোট।

আলী আহাম্মদ চুনকার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার বড় হলেন ডা. সেলিনা হায়াত আইভী। ১৯৭৯ সালে ট্যালেন্টপুলে জুনিয়র স্কলারশিপ পান এবং ১৯৮২ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় স্টারমার্কসহ উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ১৯৮৫ সালে রাশিয়ান সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে শিক্ষাগ্রহণের জন্য ওডেসা পিরাগোব মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। ১৯৮৬ সালে আইভী বৃত্তি নিয়ে পড়তে যান তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওদেসা নগরের পিরাগভ মেডিকেল ইনস্টিটিউটে। ১৯৯২ সালে কৃতিত্বের সাথে ডক্টর অব মেডিসিন ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯২-৯৩ সালে ঢাকা মিডফোর্ট হাসপাতালে ইন্টার্নি সম্পন্ন করেন। ডা. আইভী তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষা জীবনের পর ১৯৯৩-৯৪ সালে মিডফোর্ট হাসপাতালে এবং ১৯৯৪-৯৫ সালে নারায়ণগঞ্জ ২০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে অনারারি চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন। ডা. আইভী ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর রাজবাড়ী নিবাসী "কাজী আহসান হায়াৎ"-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী কাজী আহসান হায়াৎ বর্তমানে কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে নিউজিল্যান্ডে কর্মরত আছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি কাজী সাদমান হায়াত সীমান্ত ও কাজী সারদিল হায়াত অনন্ত নামে দুই পুত্র সন্তানের জননী। কাজী সাদমান হায়াত সীমান্ত ১৯৯৮ সালের ৫মে ও কাজী সারদিল হায়াত অনন্ত ২০০২ সালের ২০জুন জন্মগ্রহন করেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ