৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

সড়কে মৃত্যু : ঘণ্টায় দেড় জন খুন!!


মীর আব্দুল আলীম || সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত : ০৬:৩৩ পিএম, ৩০ জুন ২০১৭ শুক্রবার


সড়কে মৃত্যু : ঘণ্টায় দেড় জন খুন!!

আমাদের সড়ক-মহাসড়কের সর্বত্রই যেন চলছে বিশৃঙ্খলার মহোৎসব! এতে প্রাণ যাচ্ছে অকাতরে। কেবল এই ঈদের আগে ও পরে ৬ দিনে সড়কে ঝরে গেছে অন্তত ৭৯টি তাজা প্রাণ। আহত হয়েছেন আরও দুই শতাধিক ব্যক্তি। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ২৯ জুন ১৮ জন, ২৮ জুন ১৯ জন, ২৭ জুন ৪ জন, ঈদের দিন ২৬ জুন ১০ জন, ২৫ জুন ২ জন এবং ২৪ জুন অন্তত ২৬ জন নিহত হন। যানজট আর দুর্ঘটনা কমাতে দেশে নির্মিত হয়েছে অনেকগুলো ফ্লাইওভা। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা ময়মনসিংহসহ কয়েকটি মহাসড়ক চারলেনে উন্নীত হয়েছে। যমুনাসহ অসংখ্য সেতু নির্ন্মিত হয়েছে। বাধায় আটকে থাকা স্বপ্ন পদ্মাসেতু আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। এমনই আরও অনেক উন্নয়ন হয়েছে দেশের সড়ক খাতে। সড়ক মন্ত্রীকেও প্রতিনিয়ত দেখা যায় সড়কে। এত কিছুর পরও সড়ক দুর্ঘটনা কমেছে না কেন?
 
হিসাব কষলে গত ১২০ ঘন্টায় ৭৯ জন অর্থাৎ প্রতি ঘন্টায় দেড় জনের প্রাণ গেছে। এভাবেই কি দেশের সড়ক মহাসড়কগুলোতে মানুষের মৃত্যুর বিভীষিকা চলতেই থাকবে? দেশে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে যে, দুর্ঘটনা রোধে হালে বিশেষ বাহিনী গঠনের দাবি উঠছে। দেশে সন্ত্রাস দমনে যদি র্যা বব বাহিনী গঠন করা যায়, দুর্ঘটনা রোধে এ-জাতীয় বাহিনী নয় কেন? এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে সন্ত্রাসীদের হাতে শতকরা ৩০ জন লোক মারা গেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭০ জন। ৩০ জনের জীবনসহ অন্যান্য জানমাল রক্ষায় সরকারের একটি বাহিনী থাকলে শতকরা ৭০ জনের জীবনসহ অসংখ্য অহত ও ডলারে কেনা পরিবহন রক্ষায় সরকার সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বাহিনী গঠন করছে না কেন? দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দুর্ঘটনা রোধে চরমভাবে ব্যর্থ সরকারকে দেশের মানুষের স্বার্থে যতসম্ভব দ্রুত ভাবতে হবে। আমরা জেনেছি, কেবল সড়ক দুর্ঘটনায়ই দেশে গড়ে প্রতিদিন ৩০ জনের প্রাণহানি ঘটছে। এ হিসাবে মাসে ৯০০ জন এবং বছরে ১০ হাজার ৮০০ জন মারা যাচ্ছে। তবে বিআরটিএ’র পরিসংখ্যানমতে এ সংখ্যা দিনে ১৬ এবং বছরে ৫ হাজার ৭৬০ জন। বাস্তবতা হচ্ছে সড়কে প্রাণ যাওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে না। সরকারের নানা বিভাগ, একেকজন একেক দিকে। কেউ সঠিক ভাবনা ভাবছে না। তাই যা হবার তাই হচ্ছে।
 
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুই যেন আমাদের নিয়তি হয়ে উঠছে। সড়ক-মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া চালক ও বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা পরাবে কে? দিনের পর দিন এ অবস্থা তো চলতে পারে না। এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র মুখ বুঝে থাকতে পারে না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। সড়ক দুর্ঘটনার মূল অনুষঙ্গ বেপরোয়া গতি। চালকেরা বেপরোয়া গতিতে এবং একের পর এক পাল্লা দিয়ে যান চালানোর কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) মতে, মহাসড়কে গড়ে প্রতি মিনিট পরপর একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে ওভারটেকিংএর চেষ্টা করে। একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে পাশকাটাতে গিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি প্রতিরোধে মহাসড়কে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। সড়কে শৃঙ্খলা নেই বলেই দুর্ঘটনা। আর সরকারের পক্ষ থেকে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগও খুব একটা চোখে পড়ে না। সড়ক নিরাপত্তা শুধু মুখে মুখেই। বাস্তবে কর্মসূচি নেই বললেই চলে। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মহাসড়কে বিশেষ ক্যামেরা বসাতে হবে। কম খরচেই এটা করে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। সরকারি এক  হিসাবে, গত ৩ বছরে গড়ে ২ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায়  মারা গেছে। বাস্তবে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষ ঐসময়ে হতাহত হয়েছে বলে জানান,  চিত্র নায়ক ইলিয়াছ কাঞ্চন। তবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির  এক হিসাবে, ২০১৬ সালেই ৪ হাজার ৩১২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬ হাজার ৫৫ জন। আহত হয়েছেন প্রায় ১৬ হাজার মানুষ। এর আগের বছর প্রাণহানি হয় ৮ হাজারের বেশি মানুষের। আর এটাই বাস্তব চিত্র। আইন না মানাই হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ ক্ষেত্রে সবাইকে আইন মানতে বাধ্য করতে হবে।
 
ট্রাফিক পুলিশসহ চলমান প্রশাসন এ আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে তাদের ঢেলে সাজাতে হবে, অন্যথায় নতুন করে দুর্ঘটনা রোধে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে। দুর্ঘটনার অন্যতম কারণের মধ্যে ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল ২. মোবাইল ফোন ব্যবহার ৩. অতিরিক্ত যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন ৪. ট্রাফিক আইন না মানা ৫. নিয়োজিতদের দায়িত্বে অবহেলা ৬. চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা ও অসতর্কতা। এ ৬টি বিষয়ে সরকার সজাগ দৃষ্টি দিলে দেশে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু অনেকাংশে কমে যাবে। একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, আর এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে, সরকারিভাবে নতুন নতুন সুপারিশ তুলে ধরা হচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। পাগলা ঘোড়ার লাগামও মনে হয় টেনে রাখা সম্ভব, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার হাত থেকে মানুষের নিস্তার নেই, তার লাগাম টানে কার সাধ্য! সড়ক দুর্ঘটনার এমন মৃত্যুমিছিল যেন নিত্যদিনের দুঃসংবাদ! বিশ্বব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ১২ হাজার মানুষের।
 
সড়ক দুর্ঘটনা; এ যেন অলঙ্ঘনীয় ব্যাপার; মৃত্যুদূত ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতো। ঘর থেকে বের হয়ে আবার ঘরে ফেরা যাবে কি? এমন সংশয় বরাবরই থেকে যায়। এ প্রশ্নের ইতিবাচক জবাব পাওয়া কঠিন বাংলাদেশে। প্রশ্ন হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত প্রাণ ঝরে যাবে? নিত্যনৈমিত্যিক এ সড়ক দুর্ঘটনার দায় কার? কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর? প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অকালমৃত্যু বরণ করতে হচ্ছে মানুষকে। ফলে এ প্রশ্ন করা অসঙ্গত নয় যে, আর কত মানুষকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে এ অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়? এ জন্য কি সরকারের মোটেও দায় নেই?
 
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ১৯৯৭ সাল থেকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় তিন বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা করে আসছে। এর মধ্যে সাতটি পরিকল্পনা হয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার যে হিসাব প্রকাশ করছে, তাতে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।  বরং সড়কে মৃত্যুও সংখ্যা আরও বাড়ছে। কথায় বলে ‘ঘুমন্ত লোকের ঘুম ভাঙানো সম্ভব, কিন্তু জেগে জেগে ঘুমালে তা কঠিন’। শত চেষ্টায়ও তাকে জাগানো যায় না। আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যেন সেই দশা। কয়েক মাস আগে খোদ জাতীয় সংসদে অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়সী হেলপার বাস-মিনিবাস চালানোর ফলে দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানালেন যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন, গাড়ির সংখ্যা যে হারে বাড়ছে সে হারে দক্ষ চালক বাড়ছে না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক অমূল্য প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক, শিশু, নববধূ-বরসহ পুরো বরযাত্রী, সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা এমনকি সাবেক মন্ত্রীও এ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হওয়ার খবর আমরা পত্রিকার পাতায় প্রত্যক্ষ করেছি, যার একটিও সহজভাবে মেনে নেয়া যায় না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পরিবহন মালিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে সমন্বিত আন্তরিকতা, সচেতনতা, দৃঢ় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা আশা করি।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ