৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭ , ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ

নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মী ও তার প্রাপ্তি


তৈমূর আলম খন্দকার || কলামিষ্ট ও বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা

প্রকাশিত : ০৮:৪২ পিএম, ৯ আগস্ট ২০১৭ বুধবার


নিবেদিত রাজনৈতিক কর্মী ও তার প্রাপ্তি

প্রায়ই যার টেলিফোন আসতো সাংগঠনিক বিষয়, দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচী বা পত্রিকায় প্রকাশিত আমার লেখা আর্টিকেল বা টকশোর কোন বক্তব্য প্রভৃতির আলোচনা সমালোচনা নিয়ে বা দলের কর্মকান্ডকে কি ভাবে বেগমান করা যায় সে বিষয়ে। দলীয় কর্মসূচী পালন করতে পুলিশ দ্বারা নিগৃহীত হয়েছেন, আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, জেল খেটেছেন বহুবার। সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক মোকদ্দমায় আসামী হয়ে নরসিংদী শহরে মেয়ের বাড়ীতে আত্মগোপনে ছিলেন। অসুস্থতার জন্য মেয়ের বাড়ীতেও তাকে দেখতে গিয়েছি, সেখানেও আলাপ হয়েছে কি ভাবে সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায়? বয়স তার ৬৪/৬৫ বৎসর। ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, কিন্তু সরকারী তালিকাভুক্ত হন নাই। স্বাধীনতার পর জাসদ করতেন, পরে জিয়াউর রহমানের আহবানে জাসদ থেকে জাগদলে যোগ দেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানার জালকুড়ির স্থায়ী বাসিন্দা। নিজস্ব বাড়ী থাকলেও ঋণের দায়ে ব্যাংকের নিকট দায়বদ্ধ। স্ত্রী মানসিক ভারসাস্যহীন, ২টি কন্যা প্রতিবন্ধী, তাও একটি প্রায় দুই মাস পূর্বে সড়ক দূর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল, এখনো স্বাভাবিক জীবন ফিরে পায় নাই। নরসিংদীতে থাকা মেয়ের অবস্থা খুবই স্বচ্ছল না হলেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করার জন্য আর্থিক সংগতি ছিল। সর্বোপরি মেয়েটির শশুরবাড়ীর লোকজন সহনশীল না হলে আতœগোপন অবস্থায় সেখানে সে থাকতে পারতো না। লোকটি আর কেহ নন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক আলী হোসেন প্রধান।

আমাদের দেশে নীতি কথা অনেক বলা হয়। কিন্তু আমরা পিছু নেই টাকাওয়ালাদের। দলীয় পদ পদবীর ক্ষেত্রে দলীয় কর্মীরাও টাকা ওয়ালাদেরই খোজে। সে হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে একজন ধনী ব্যক্তিকেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপি’র আহবায়ক করা হলেও আন্দোলন সংগ্রামে তাকে না পাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটাপন্ন ব্যক্তি আলী হোসেনকেই ঐ পদে খোজে বের করা হয়ে ছিলো রাজনীতির প্রতি যার ছিল কমির্টমেন্ট।

তিনি আত্মগোপনে ছিলেন, জেলে যাওয়া তার সমস্যা ছিল না, কিন্তু জেলে গেলে তার অসুস্থ্য শরীরে তিনি কতটুকু দখল সইতে পারবেন এটাই ছিল তার বড় সমস্যা। এছাড়াও তার পারিবারিক সমস্যাতো রয়েছেই। এতো প্রতিকুলতার মধ্যেও যে মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিতে এতো সক্রিয় ছিলেন, দেশ, জাতি, দল বা আইনের আশ্রয় কতটুকু তিনি পেলেন?

উল্লেখ্য, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা ২(১)২০১৪ একটি রাজনৈতিক মামলা, ০৪/১/২০১৪ ইং তারিখে দায়েরকৃত মামলায় এলাকার অন্যান্য বিরোধী দলীয় নেতাদের সাথে আসামী হিসাবে আলী হোসেনের নামও ছিল। যেহেতু মামলাটিতে বিষ্ফোরক আইনের ধারা সংযুক্ত ছিল সেহেতু ৩১/১২/২০১৪ইং তারিখে ২ভাবে মামলায় চার্জশীট হয়। তপছিল ভুক্ত চার্জশীটের মামলা বিচারের জন্য ২৫/৬/২০১৫ তারিখে শেসন জজ (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) মামলাটি রেকর্ড করে এবং ২৯/৯/২০১৫ তারিখে উক্ত আদালত চার্জশীট গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের জন্য থানায় প্রেরণ করে।

ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত সকল আসামী জামিন প্রাপ্ত হয়। কোন আসামীর বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকা স্বত্বেও সেশন জজ (স্পেশাল ট্রাইবুনাল নং-১) জনাব সৈয়দ এনায়েত হোসেন মামলাটি ২৯/৯/২০১৫ তারিখে অধিকতর তদন্তের জন্য প্রেরণ করেন। ১ বৎসর ৩ মাস অতিক্রম করলেও অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন আসে নাই। আলী হোসেন ৩/১১/২০১৬ তারিখে গ্রেফতার হন। উক্ত আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে জামিনের প্রার্থনা করা হলে তিনি ২৮/১১/২০১৬ ইং প্রার্থনা নামঞ্জুর করে নিম্ম আদালতে জামিনের প্রার্থনা করে “বিবিধ মিস কেইসের” মাধ্যমে জামিনের প্রার্থনা করতে বললে ১৫/১২/২০১৬ ইং তারিখে মিস কেইস শুনানীয়ান্তে তিনি জামিন নামঞ্জুর করেন।

উল্লেখ্য, ফৌজদারী কার্য বিধি ৪৯৬/৪৯৭ ধারায় অজামিনযোগ্য মামলায় কেন জামিন দিতে হবে তার বিষয়াদ্দি উল্লেখ করা আছে। জামিন বিচারের একটি অংশ। কিন্তু সাজার অংশ হিসেবে জামিন না দেয়া “ন্যায় বিচার” নহে। বর্ণিত বিবেচনায় আলী হোসেন জামিন পাওয়া কি যুক্তিযুক্ত ছিল না? মাননীয় প্রধান বিচারপতি মহোদয় কি বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন? এ বিষয়টি টেষ্ট কেইস হিসাবে যাচাই বাছাই করলেই বিচার বিভাগ সরকারের দায়ের করা মামলায় প্রতি কতটুকু যত্মবান পরিষ্কার হবে। স্মরণ রাখা দরকার বিচার বিভাগের নিকট সরকার একটি পক্ষ মাত্র, বিরোধী দল বা আসামীও একটি পক্ষ, ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার উভয় পক্ষেরই রয়েছে। ইতোমধ্যে উচ্চ আদালত জামিন দেয়ার প্রশ্নে যে নজীর প্রদান করেছেন তাতে কি আলী হোসেন জামিন পাওয়ার হকদার ছিল না?

দল থেকেই আলী হোসেন কি পেলো? দল থেকে তার মূল্যায়ন হওয়ার কি সূযোগ রয়েছে? জীবিত থাকলেও তা মূল্যায়ন হতো না এ কারণে যে, তার টাকা ছিল না। টাকা এখন সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, এমন কি রাজনীতিও। এ কথাগুলি বলাও যাবে না। কেন বলা যাবে না তার কারণও ব্যাখ্যা করা যাবে না। মূখে মূখে মুল্যায়নের যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় ভুক্তভোগিরাই জানেন আদর্শবান নিবেদিতদের মূল্যায়ণ হয় কতটুকু?

হয়তো প্রতি বৎসর আলী হোসেনের জন্য একটি কুলখানি বা শোকসভা হবে। দুঃখ ভরাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে অনেক নেতা কথা বলবেন, অনেক নেতাই হয়তো শোক সভায় আসতে সময় করতে পারবেন না। রাজনৈতিক দলে অনেক আলী হোসেন জন্ম হয়েছে যারা ঝড়ে পড়েছে, আবার অনেক আলী হোসেনের জন্ম হবে যারা পরিবারকে সাপোর্ট না করে দলকে সাপোর্ট করবে, তাদের পরিনতি কি এর ব্যতিক্রম হবে? সে জন্য তৃণমূলকেই এগিয়ে আসতে হবে তাদের টিকে থাকার জন্য। বিলীন হয়ে যাওয়ার চেয়ে টিকে থাকার পন্থা উদ্ভাবন শ্রেষ্ঠতার অংশ, বিজয়ের জন্য টিকে থাকা অত্যান্ত জরুরী।

আলী হোসেন যদি সরকারী দলের হতো তবে একই অপরাধের জন্য কারাগারে মৃত্যু বরণ করতে হতো না। একটি সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ার কারণে কবরস্থ করার সময়ও সে সম্মানটুকু পায় নাই। দলের কেন্দ্রীয় কমান্ড থেকেও তার একটি শোকবার্তা আসে নাই। অর্থ বিত্তহীন হওয়ার কারণে নিবেদীত নিপীড়িত কমিটেড নেতা কর্মীদের ভাগ্যে এমনটাই জোটে যা জোটেছে আলী হোসেনের ভাগ্যে। অনেক নিপীড়িত কমিটেড নেতা কর্মী ঝড়ে গেলেও সুবিধাবাদীরা রয়েছে বহাল তাবিয়তে এবং থাকবে চিরকাল যতদিন বর্জুয়া রাজনীতি থাকবে বহমান।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ