৫ কার্তিক ১৪২৪, শুক্রবার ২০ অক্টোবর ২০১৭ , ৯:৫৩ অপরাহ্ণ

বার একাডেমি স্কুলে তুলকালাম, প্রধান শিক্ষককে টেনে হেচড়ে বের করলো


স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৫:৫০ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ১০:৩৮ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার


বার একাডেমি স্কুলে তুলকালাম, প্রধান শিক্ষককে টেনে হেচড়ে বের করলো

নারায়ণগঞ্জে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমী’ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বহিস্কার দাবীতে বিক্ষোভ দেখিয়েছে এলাকার স্থানীয় কয়েকজন যাদের অনেকেই আগেই ছিলেন ব্যবস্থাপনা কমিটিতে। বিক্ষোভ ও তোপের মুখে এক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামানকে টেনে হেছড়ে বের করে আনা হয়।

১৮ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা হতে দুপুর ২টা পর্যন্ত ওই ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, ১৯০৬ সালে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী বার স্কুলটি স্থানীয়ভাবে বেশ সমাদৃত ছিল। নারায়ণগঞ্জের অনেক এমপি ও বর্তমানে সরকারের শীর্ষ স্থানীয় পদে কর্মরতদের অনেকেই এ স্কুলের ছাত্র। ৯০ দশক এ স্কুলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা এনায়েত হোসেনের মৃত্যুর পর থেকেই তিন দশক ধরেই স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদ মূলত স্কুলটি নিয়ন্ত্রন করে আসছিল। ওই সময়ে স্কুলটির নিয়ন্ত্রক ছিলেন খানপুর এলাকার মিজানুর রহমান বাচ্চু, সামসুজ্জামান খান ভাষানী সহ অনেকে। নির্বাচন ছাড়াই সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে এসব কমিটি হওয়ায় স্কুলের ছিল না কোন তদারকী। ফলে ইচ্ছেমত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি যেমন ছিল তেমনি পরিস্থিতি ছিল ‘ওলট পালট করে দে মা লুটে পুটে খাই’। তবে ২০০৪ সালের শেষের দিকে স্কুলের ওই ম্যানেজিং কমিটিতে আমূল পরিবর্তন আসতে থাকে। যুক্ত হন খানপুর এলাকার ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান সরদার, মাহাবুব সহ আরো কয়েকজন। তারা বেশ কয়েকবছর স্কুল পরিচালনার পর কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব হিসেবে থাকা শামীম চৌধুরীকে স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি করা হয়।

শামীম চৌধুরী শুরুতে স্কুলের উন্নয়নে কাজ করতে গেলেও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় স্থানীয়দের অনেকের। আর এসব নিয়ে দেখা দেয় উত্তেজনা। এক পর্যায়ে শামীম চৌধুরী ঠিকমত খোঁজ খবর না নেওয়ায় সুযোগ পেয়ে প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান সরকার নানা ধরনের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। এতে করে স্কুলের ভাবমূর্তি ক্রমশ নষ্ট হতে থাকে।

এর মধ্যে স্কুলের ব্যবস্থানা পরিষদের নির্বাচন দাবী করতে থাকে স্থানীয় লোকজন ও অভিভাবকেরা। গত ২০ আগস্ট মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস তফসিল ঘোষণা করলেও মনিরুজ্জামান পুরো বিষয়টি গোপন রাখে। তিনি আবারও শামীম চৌধুরীকে প্রধান রেখে একটি কমিটি জমা করে সেটাকে অনুমোদন আনার চেষ্টা করেন।

এর মধ্যে গত ২১ আগষ্ট প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান মনিরের বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরে তাকে বরখাস্তের দাবিতে জেলা প্রশাসকের বরাবরে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।

বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের কয়েকজন ক্ষোভে ফুঁসে উঠতে থাকে। তারা এ ব্যাপারে কয়েকদিন ধরেই আন্দোলন করার প্রস্তুতি নেয়। এর অংশ হিসেবে সোমবার সকালে সেখানকার কয়েকজন মিলে স্কুলের গেটের বাইরে ও পরে প্রধান শিক্ষকের রুমে প্রবেশ করে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন।

এদিকে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান জেলা শিক্ষা অফিসার শরিফুল ইসলাম, কমিটির ২ সদস্য জেলা শিক্ষা অফিসের গবেষণা কর্মকর্তা নাজমুন্নাহার খানম ও প্রধান সহকারী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম সকাল সাড়ে ১১টায় স্কুলে আসে। কিন্তু এর আগে থেকেই সেখানে জড়ো হয় অনেকে। তারা ওই কমিটির সামনে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। পরে খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এরপর প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামানের কক্ষে বসেন তদন্তকারী সংস্থা। এসময় বিক্ষুব্দরা বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি ও সেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে ধরেন এবং তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। ওইসময়ে শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও একটি অভিযোগ প্রদান করা হয়।

সোমবার প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন সামসুজ্জামান খান ভাষানী যিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি, নুরুজ্জামান সরদার যিনি ব্যবসায়ী। এছাড়া ছিলেন পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল হোসেন নিলু মিয়া প্রমুখ। তাদের মধ্যে ভাষানী, নুরুজ্জামান সরদার এর আগেও এ স্কুলের কয়েক দফা ব্যবস্থাপনা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

নুরুজ্জামান সরদার জানান, ১০৫ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বার একাডেমী স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনেক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তাঁর আমলে স্কুলে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। এ কারণে স্কুলের ফলাফল ক্রমশ অবনতি ঘটছে। আমরা স্কুলটিকে জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুলে পরিণত করতে চাই। আমরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারলেও মানের উন্নয়ন করতে পারিনি। স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শামীম চৌধুরী ৪-৬ মাসেও স্কুলে আসেন না। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। তাই তাকে বরখাস্ত রেখে এরপর তদন্ত কমিটি তাদের কার্যক্রম চালালে ভাল হবে। তিনি জানান, মনিরুজ্জামানের উপস্থিতিতে তদন্ত সুষ্ঠু হবে না। তদন্তকালীন সময়ে তিনি স্কুলে থাকবেন না। ওই সময়ে হুমায়ন কবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করবেন।

সামসুজ্জামান খান ভাষানী জানান, প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শিক্ষার্থীদের তার নিজস্ব কোচিং সেন্টারে বাধ্যতামূলক কোচিং করা, ভর্তি ও বই বাণিজ্য এবং বোর্ডের সকল স্তরের পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস করা সহ বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি করে আসছেন। যার কারণে শিক্ষার মান দিন দিন অবনতি হয়ে শিক্ষার্থীদের ফলাফলও খুব খারাপ হচ্ছে।

সেখানকার অভিভাবক পরিবহন ব্যবসায়ী আবুল হোসেন নিলু মিয়া জানান, ‘প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান স্কুলের পুরো ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। সে কারণে স্কুলের মান উন্নতি হচ্ছে না। আমরা চাই নতুন প্রধান শিক্ষক স্কুলে নিযুক্ত হউক।’

জেলা শিক্ষা অফিসার শরীফুল ইসলাম জানান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আগামী তিনদিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বিক্ষুব্ধদের স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যেসকল অভিযোগ রয়েছে সেগুলো লিখিত আকারে তাদের কাছে জমা দেয়ার আহবান জানান।

এদিকে মনিরুজ্জামান সরকার জানান, স্থানীয়দের অনেকেই স্কুলকে নিয়ে ব্যবসা করতে চায় তাদের মনের মত কমিটি না হওয়ার কারণেই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। সেটার অংশ হিসেবেই আমাকে লাঞ্ছিত করে স্কুল থেকে বের করে দেয়। এটা শোভনীয় কোন কাজ না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

শিক্ষাঙ্গন -এর সর্বশেষ