৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, সোমবার ২০ নভেম্বর ২০১৭ , ৮:২১ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গবন্ধু প্রেমিক খালেক মিয়া আজ বড় অসহায়


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৭:৫১ পিএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বুধবার


বঙ্গবন্ধু প্রেমিক খালেক মিয়া আজ বড় অসহায়

বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নারায়ণগঞ্জ জেলার একজন নিঃস্বার্থ কর্মী মো. খালেক যিনি দলকে ভালবেসে সারাটি জীবন দলের জন্য শুধু কাজ করে গেছেন। কখনো কোন পদ পদবি কিংবা অর্থ-সম্পদ পাবার আশায় তিনি রাজনীতি করেননি। কেননা তার জীবনের এক অংশে ছিল আওয়ামীলীগের রাজনীতি অন্য অংশে ছিল তার খেটে খাওয়া কষ্টের কর্মজীবন যা থেকে উপার্জিত টাকায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জীবন-যাপন করতে বেশ সাচ্ছন্দ বোধ করতেন তিনি।

শত কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন-যাপন করলেও তিনি কখনো কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি, কখনো কারো কাছ থেকে কিছু পাবার আশা করেননি। সমাজের আত্মনির্ভরশীল খালেক মিয়ার কারো কাছ থেকে কোন রকম সাহায্য-সহযোগিতা নিতে আত্ম সম্মানে বাধত, তাই বিধাতা ছাড়া কখনো কারো কাছ থেকে কিছু আশা করেননি।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কাছে তার সেই সম্মান বলি হতে চলেছে। মাস কয়েক আগে তিনি ব্রেইন স্ট্রোক করে এখন শয্যাশয়ী হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। তাই এখন সংসারের হাল ধরতে তার একমাত্র ছেলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ৬হাজার টাকা বেতনে কাজ করছে। তার এই দুর্দিনে কোন বিত্তবান কিংবা কোন রাজনীতিবিদ তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি, নেয়নি তার কোন খোঁজ-খবর। তবে কি ভাগ্যের কাছে পরজয় বরণ করবে সমাজের খালেক মিয়ারা?

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ছালেহনগর এলকার পাশেই এক ভাড়া বাড়িতে খালেক মিয়ার (৬০) সাথে কথা হলে তিনি দুঃখ ভারাকান্ত কণ্ঠে কষ্টের কথা নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বয়স কম হওয়ার কারণে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করতে না পারলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে সেই সাধ পূরণ করেছেন। তবে তিনি এর আগে থেকেই আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন।

খালেক মিয়া বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করে জীবনের একমাত্র অর্জন বলতে কর্মী হিসেবে একটি কার্ড পেয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। জাতির জনক শেখ মুজিবুরের প্রতি একনিষ্ঠ ভালবাসার কারণে তার নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামীলীগের হয়ে কাজের আন্তরিকতা দেখে তৎকালীন সময়ে তাকে আওয়ামীলীগের কর্মী কার্ড দেয় হয়। সেই কার্ডে তৎকালীন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। আর কার্ডের এক কোনে বঙ্গবন্ধু একটি ছবি দেয়া আছে যা আকড়ে ধরে এখনো জাতির জনক শেখ মুজিবকে নিরবে ভালবেসে যান তিনি। তাই দীর্ঘ ২১ বছর পরেও কার্ডটি অক্ষত আছে তার কাছে। তবে বঙ্গবন্ধু যে এখনো মরেনি তার সেই ভালবাসই তার দৃষ্টান্ত। তাছাড়া এই কার্ডটি তৎকালীন সময়ে বেছে বেছে গুটি কয়েকজন কর্মীকে এই কার্ড দেয়া হত তার মধ্যে খালেক মিয়াও একজন ছিলেন।

মৃত মো. তৈয়্যব আলীর ছেলে মো. খালেক মিয়া ১৯৫৬ সালে বিক্রমপুরের লৌহজং থানার ওয়ারী গ্রামে জন্ম গ্রহণ করলেও জন্মের কিছুদিন পরেই নারায়ণগঞ্জের ছালেহনগর এলাকায় বসবাস করতে শুরু করে। তবে ছোট বেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ তার মনকে ছুয়ে যায়।

জাতির জনক শেখ মুজিবুরের প্রতি ভালবাসা থেকে আওয়ামীলীগের প্রতি এক অদ্ভুত ভালবাসা জন্ম নেয় তার ভেতরে। তাই কর্মজীবনের ফাঁকে সময় করে রাজনীতি করতেন, কখনো কখনো কাজ বন্ধ করেও রাজনীতি করতেন। এর পর থেকে নিঃস্বার্থভাবে দলের হয়ে কাজ করে গেছেন তিনি। এর প্রতিদানে কখনো কিছু চাননি তিনি, এমনকি কখনো কিছু পাননি তিনি। সব সময় চাইতেন যেন তিনি নিজের উপর নির্ভরশীল হয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারেন এবং কারো কাছ থেকে যেন কোন রকমের সাহায্য সহযোগীতা নিতে না হয়। কিন্তু ভাগ্য তার উপর প্রসন্ন হয়নি। তার সেই আত্মনির্ভরশীল হওয়া জীবনটা এক রাতে এলোমেলো হয়ে গেল।

এ বছরের শুরুতে এক রাতে তার হাত-পা ভীষণ ব্যাথা সহ মুচরিয়ে বেকে যেতে থাকে। এর এক পর্যায়ে সেই রাতে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে চিকিৎসকের সরণাপন্ন হলে তার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে বলে চিকিৎসক জানায়। তাই তার শরীরের ডান দিকের অংশ প্যারালাইজড হয়ে অচল হয়ে পড়ে। এতে তার ডান হাত-পা সহ মুখ প্রায় অচল হয়ে পড়ে। যেকারণে তিনি হাঁটা চলাফেরা সহ কোন ধরণের কাজ করতে পারেন না। এমনকি ঠিক মত কথাও বলতে পারেন না। অথচ তিনিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য ছিলেন। তিনি ফুটপাতে জামা-কাপড় বিক্রি করতেন। আর তাতেই কোন রকমে কষ্ট করে জীবন অতিবাহিত করলেও কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়নি বলে সমাজে বেশ মাথা উচু করেই জীবন যাপন করতেন। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে পুরো পরিবার প্রায় অচল হয়ে পড়ল। এসময় সংসারের হাল ধরতে তার অনার্স অধ্যয়নরত ছেলে পড়াশোনা বাদ দিয়ে উপার্জন করতে শুরু করে। মাত্র ৬ হাজার টাকা বেতনে নিতাইগঞ্জের একটি চালের গদিতে সে ছেলেটা চাকরি করে কিন্তু তাতে সংসারের কি হয়। তবে এতো সামান্য টাকা দিয়ে তার সংসার খরচ তো দূরের কথা অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ যোগাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ৪ জনের সংসারে মেয়েটা এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাই মেয়েটার পড়াশোনার খরচ সহ সংসারের খরচতো রয়েছেই। তাছাড়া খালেক মিয়ার চিকিৎসা খরচ সহ সংসার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই কখনো কখনো ধার-দেনা করে, কখনো ওষুধ না খেয়ে কোন রকমে তিনি দিন কাটাচ্ছেন।

তবে চিকিৎসক বলেছে, তাকে সুস্থ হতে বেশ সময় লাগবে তাই নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। তার এই দুর্দিনে সেই রাজনীতি দলের কোন নেতারা তার পাশে এসে দাঁড়ায়নি , কোন খোঁজ খবরও নেয়নি।

খালেক মিয়া কথাগুলো নিউজ নারায়াণগঞ্জের প্রতিবেদককে বলতে গিয়ে তাঁর চোখ ছল ছল করছিল আর বুকের ভিতর লুকিয়ে থাকা চাপা কান্নায় তার কন্ঠ বেশ ভারি হয়ে উঠে।

তিনি আরো বলেন, মানুষের কাছে কখনো কিছু চাইনি। কখনো কারো কাছ থেকে একটি পয়সাও সাহায্য হিসেবে নেই নি। শুনেছি আওয়ামীলীগের কর্মীরা বিভিন্ন সময় নানা রকমের সাহায্য-সহযোগীতা পেয়েছে, কিন্তু আমি কখনো পাইনি। কখনো কারো কাছ থেকে সাহায্য পাবার আশাও করিনা। আমি চাই সৃষ্টিকর্তা আমাকে সুস্থ করে দিক, আমি যেন আগের মত কাজ-কর্ম করে উপার্জন করতে পারি। আমার অসুস্থতার কারণে যেই কটা টাকা জমিয়েছিলাম তা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। আত্মীয় স্বজনরা অনেকেই আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেদের ইচ্ছায় আমাদেরকে সহযোগীতা করছে। তারপরও টাকা-পয়সার সংকটের কারণে অনেক সময় ওষুধ কিনতে পারিনা। তাছাড়া ছেলে-মেয়ে দুটোর একটা ভবিষ্যৎ আছে। ওদের জন্য কিছুই করে যেতে পারলাম না। তাই ভীষণ চিন্তা হয়। চারিদিকে শুধু অন্ধকার দেখছি। এখন উপর ওয়লা (আল্লাহ) ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। তিনি এখন আমার মত অসহায়ের সম্ভল, তিনিই আমার আশা-ভরসা।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ