৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, রবিবার ১৯ নভেম্বর ২০১৭ , ৩:২১ পূর্বাহ্ণ

৫ খুন : স্ত্রী সন্তান হারিয়ে এখনো নির্বাক বাবা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৭:০৮ পিএম, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার | আপডেট: ০৭:৫৬ পিএম, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শনিবার


৫ খুন : স্ত্রী সন্তান হারিয়ে এখনো নির্বাক বাবা

নারায়ণগঞ্জে একই পরিবারের দুই শিশু সহ ৫ জনকে হত্যার মামলায় একমাত্র আসামী সাইলেন্ট কিলার ভাগ্নে মাহফুজকে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন আদালত। গত ৭ আগষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ বেগম হোসনে আরা আকতারের আদালত এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদন্ডের আদেশ দেন আদালত।  এদিকে ৫ খুনের রায় হলেও স্ত্রী আর সন্তানদ্বয়কে হারিয়ে নির্বাক বাবা শফিকুল।

জানা গেছে, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ঢাকার কলাবাগান এলাকার একটি বাসায় ভাড়া নিয়ে বসবাস করছিলেন শফিকুল। তাসলিমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল ১২ বছর পূর্বে। তিনি নিউজিল্যান্ড ডেইরী নামক একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জিয়ারুল হাসানের প্রাইভেটকার চালাতেন। তাদের সংসারে জন্ম নেয় শান্ত (১১) ও সুমাইয়া (৬)। তবে স্ত্রী তাসলিমার রহস্যে ঘেরা ১২ লাখ টাকা ঋন নিয়ে পাওনাদারদের তাগাদা ও হুমকীর পরে বাসা বদল করতে বাধ্য হয় শফিকুল। ২০১৫ সালের নভেম্বরে নারায়ণগঞ্জ শহরের ২ নং বাবুরাইলের খানকা সংলগ্ন আমেরিকা প্রবাসী ইসমাইল হোসেনের ৬তলা ভবনের নিচ তলার ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় শফিকুল ও তাসলিমা। ওই ফ্ল্যাটটি তার শ্যালক মোরশেদুলের কারখানার পাশেই ছিল। যে কারণে শফিকুল না থাকলে মোরশেদুলও বোন ও ভাগ্নেদের সঙ্গেই রাত্রে থাকতো। ঢাকার কলাবাগানে থাকাকালীনই তাদের সঙ্গে থাকতো ছোট ভাই শরীফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী লামিয়া। সে সুবাদে শরীফুল ও লামিয়াও নারায়ণগঞ্জে চলে আসে। তবে চাকুরীর কারনে শরীফুলও নিয়মিত বাড়িতে আসতো না।

শফিকুল জানান, ঢাকায় চাকুরীর কারণে তিনি সপ্তাহে একদিন বাড়িতে আসতেন। তবে যেদিন ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ১৫ জানুয়ারী শুক্রবার তিনি তার অধীনে চাকরি করতেন (জিয়ারুল হাসানের) তার সঙ্গে সোনারগাঁয়ে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে রাতে ফিরেন। যেকারণে তিনি আর নারায়ণগঞ্জে আসতে পারেননি। তবে রাতে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এছাড়া ওইদিন তার ছোট ভাই শরীফুল ইসলামও ময়মনসিংহে গিয়েছিলেন এক বন্ধুর বিয়েতে। ঘটনার দুই সপ্তাহ আগেই সর্বশেষ তার সঙ্গে স্ত্রী তাসলিমা, ছেলে শান্ত ও মেয়ে সুমাইয়ার দেখা হয়েছিল। ওইদিন বাড়িতে শরীফুল ও লামিয়াও ছিল। ওইদিন শরীফুলের নতুন কেনা মোবাইল ফোন দিয়ে শান্তই তাকে ও সুমাইয়াকে নিয়ে সেলফি তুলতে বলে। একই ফ্রেমে পিতা পুত্র ও মেয়ে বন্দী হলেও তাসলিমা ছিলেন না সেই সেলফিতে। কারণ তাসলিমার ছবি তোলার আগ্রহ খুব একটা ছিলনা। ওই ছবিটিই (সেলফি) তাদের তোলা সর্বশেষ ছবি। একথা বলতে বলতেই কেঁদে ফেলেন শফিকুল। তার দুচোখে তখন যেন অশ্রুর বন্যা ছুটতে থাকে।   

৫ খুনের ঘটনায় নিহত দুই ভাই বোনই শহরের ১নং বাবুরাইল এলাকার মোবারক শাহ্ রোডের ১৮ ও ১৯ নং বাবুরাইল বালক/বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। যার মধ্যে মো. শান্ত (১০) তৃতীয় শ্রেনীতে ও সুমাইয়া (৫) শিশু শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিল।

গত বছরের ৪ জানুয়ারি নিহত সুমাইয়া ওই স্কুলে ভর্তি হয়। এর মাত্র দুইদিন পর ৬ জানুয়ারি ভর্তি হয় মো. শান্ত। ওই ঘটনায় নিহতের মা তাসলিমা বেগম নিজেই দুই ভাইবোনকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। এছাড়াও যে ক’দিন স্কুলে আসেন তাও মায়ের সঙ্গেই। তবে যে দিনটিতে মো. শান্ত ও সুমাইয়া নিহত হয়েছে ওই দিনটিতে তারা স্কুলে আসেনি।

১৬ জানুয়ারী সকালে ছেলে শান্তকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ওঠে তাসলিমা। সে শান্তকে স্কুল ড্রেস পরিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে পাঠায়। এরপর তাসলিমা সবার জন্য রুটি বানানোর উদ্দেশ্যে আটার খামি তৈরী করে। এর এক ফাঁকে সে ভাই মোরশেদুলকে ডাকতে যায় তাসলিমা। দরজার সামনে দাড়িয়েই বিছানায় মোরশেদুলের রক্তাক্ত লাশ দেখতে পেয়ে তাসলিমা চিৎকার দেয়ার চেষ্টা করলে মাহফুজ তাসলিমার মাথায় শিলপাটার শিল দিয়ে আঘাত করে। এরপর শ^াসরোধ শেষে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে তার লাশটি টেনে ওই কক্ষের ভেতরে নিয়ে যায়। মোরশেদুল ও তাসলিমাকে হত্যার পর মাহফুজ ভেতরের কক্ষে যায়। যেখানে ঘুমিয়ে ছিল লামিয়া ও ৫ বছরের শিশু সুমাইয়া। এসময় লামিয়া জেগে উঠলে মাহফুজ শিলপাটার শিল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলেও সেটা ঠিকমতো লাগেনি। তখন লামিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ওইসময় মাহফুজ লামিয়াকে শ^াসরোধে হত্যায় উদ্যত হলে লামিয়া পাশে পড়ে থাকা শিলপাটার শিলটি মাহফুজকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলে সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে শিশু সুমাইয়ার মাথায় পড়লে সে মারা যায়। এরপর মাহফুজ শিলপাটার শিলটি দিয়ে লামিয়ার মাথায় আবারো আঘাত করে। এরপর শ^াসরোধে লামিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এদিকে ওইদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শান্ত সকাল সোয়া ৭ টার দিকে আবারও বাসায় ফিরে আসে। দরজা খোলার পরে মাহফুজকে দেখে সে মা তাসলিমা কোথায় জানতে চায়। তখন ঘরের ভেতরে রক্ত দেখে শান্ত চিৎকার করে উঠতে চাইলে মাহফুজ শান্তর গলাটিপে ধরে দেয়ালের সঙ্গে শান্তর মাথা আঘাত করে এরপর তাকে গলাটিপে হত্যা করে মাহফুজ।

উল্লেখ্য ৫ খুনের ঘটনায় নিহত দুই ভাইবোনই শহরের ১নং বাবুরাইল এলাকার মোবারক শাহ্ রোডের ১৮ ও ১৯ নং বাবুরাইল বালক/বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। যার মধ্যে মো. শান্ত (১০) তৃতীয় শ্রেনীতে ও সুমাইয়া (৫) শিশু শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছিল। ১৬ জানুয়ারী রাতে শহরের বাবুরাইল এলাকা থেকে তাসলিমা, তার ছেলে শান্ত ও মেয়ে সুমাইয়া, ভাই মোরশেদুল ওরফে মোশারফ ও জা লামিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদেরকে মাথায় ভোতা অস্ত্রের আঘাতে ও শ^াসরোধে নৃশংসভাবে হত্যা করে ঘাতক ভাগ্নে মাহফুজ।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ