৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, রবিবার ১৯ নভেম্বর ২০১৭ , ৩:১৯ পূর্বাহ্ণ

ভয়াল নাইন এলেভেনে উঠে আসে নারায়ণগঞ্জে সেই সাদেকীর নাম


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:০৯ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০৮:৫৪ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার


ভয়াল নাইন এলেভেনে উঠে আসে নারায়ণগঞ্জে সেই সাদেকীর নাম

নাইন এলেভেন আসলেই উঠে আসে স্মরণ হয় আমেরিকাতে সেই টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা। আর এতে উঠে আসে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক এহসানুল ইসলাম সাদেকী ওরফে শিফার (৩৬) নাম যার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায়।

সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ২০০৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর আটলান্টাস্থ ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের জজ উইলিয়াম এস ডাফি জুনিয়র প্রদত্ত রায়ে সাদেকীকে ১৭ বছরের জেল এবং এ দন্ডভোগের পর আরো ৩০ বছর কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ে কাটাতে হবে। এছাড়া আমেরিকাতে সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভিডিওচিত্র ধারণ এবং সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গত ১৫ জুন সাদেকীকে ১৭ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে জর্জিয়ার আদালত।

জার্মান বাংলা গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের তথ্য সূত্র মতে, সাদেকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভিডিওচিত্র ধারণ করে সেগুলো বিদেশে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে পাঠাচ্ছিল এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছি। কানাডার তথাকথিত ‘‘টরোন্টো ১৮’’ গ্রুপের সঙ্গেও তার যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ‘‘টরোন্টো ১৮’’ গ্রুপটি কানাডার পার্লামেন্ট ভবন, শিকাগোর সিয়ার্স টাওয়ার এবং নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৬ সালে কানাডায় ওই গ্রুপের ১৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। জর্জিয়ার বিচারক উইলিয়াম দুফি তাঁর রায়ে মন্তব্য করেন, ‘সম্প্রতি এ ধরণের মামলার ঘটনাগুলোতে এটা স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামি উগ্রপন্থার বিস্তারের আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।
 

সাদেকী সম্পর্কে এফবিআইর রিপোর্ট
এর আগে আটলান্টাস্থ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা (ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিকেশন) এফবিআইয়ের এক স্পেশাল এজেন্ট বলেছেন, ‘সাদেকী কখনোই বন্দুকের ট্রিগার টিপেনি কিংবা বোমাও ফাটায়নি। কিন্তু সে সারাবিশ্বে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিতদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসী হামলার জন্য যাবতীয় কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিল।’

সাদেকীর পরিচয়
এহসানুল ইসলাম সাদেকী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা পোস্ট অফিস রোড এলাকার সরদার মো. শরীফ সাদেকীর ছেলে। ফতুল্লার দাপা এলাকার মৃত সরদার সাদেক আলীর ৫ ছেলের মধ্যে সরদার মো. শরীফ সাদেকী সবার ছোট। ১৯৭৯ সালে শরীফ সাদেকী স্বপরিবারে চলে যান আমেরিকা। ৮১ সালের দিকে আমেরিকাতে স্বপরিবারে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পান। শরীফ সাদেকীর ২ ছেলে ২ মেয়ের মধ্যে সবার ছোট এহসানুল হক সাদেকীর শৈশব ও কৈশর ওখানেই কাটে। ফলে নারায়ণগঞ্জের আত্মীয়-স্বজনরাও তাকে তেমন একটা চিনতো না।

ফতুল্লায় আসেন সাদেকী
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ ও ২০০৩ সালে সাদেকী ফতুল্লায় আসেন। সবশেষ ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সাদেকী তার বাবার সঙ্গে ফতুল্লার বাসায় এসেছিলেন বলে জানা গেছে।

যেভাবে গ্রেপ্তার
২০০৬ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে স্ত্রী হ্যাপি শাহনাজকে নিয়ে শপিং শেষ করে বারিধারা এলাকার কাছে কালাচাঁদপুর সেতু পুলিশ চেকপোস্টের সামনে থেকে সাদা পোশাক পরিহিত এবং ওয়্যারলেস ও আগ্নেয়াস্ত্র বহনকারী বিশেষ টিম সাদেকীকে আটক করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এবং পরে তাকে একটি বিশেষ বিমানে করে নেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে। গ্রেপ্তারের মাত্র ১৭ দিন পূর্বে ১ এপ্রিল আপন বড় চাচা রহমতউল্লাহর মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্রী হ্যাপি শাহনাজকে বিয়ে করে সাদেকী। ঢাকার ধানমন্ডিস্থ পাটি প্যালেসে বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। সাদেকীর মা, ২ বোন ও ১ভাই বিয়ের সময়ে আমেরিকাতে ছিলেন। বিয়ের পর স্ত্রী হ্যাপিকে নিয়ে তার আমেরিকায় যাওয়ার কথা ছিল।

সাদেকীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাদের এক রিপোর্টে বলেন, আটলান্টার মিড টাউনে অবস্থিত মসজিদে সাদেকীর সঙ্গে পাকিস্তানি-আমেরিকান সাঈদ হারিস আহমদের সাক্ষাতের পর তারা উভয়ে একই মনোভাবাপন্ন বলে পরষ্পরের কাছে প্রতীয়মান হওয়ার পর জিহাদে অংশ নেয়ার ব্যাপারে একই মত পোষণ করে। ২০০৪ সালের শেষার্ধে তারা জর্জিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল ভ্রমণ করে আধা-সামরিক বাহিনীর অস্ত্র পরিচালনার যাবতীয় প্রশিক্ষণ শিখে নেয়। ওই বছরের মার্চে কানাডায় সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বোমা হামলার ষড়যন্ত্র করার দায়ে কানাডা পুলিশের হাতে পরবর্তী সময় গ্রেপ্তার হওয়া ১৮ জনের একজনের সঙ্গেও তারা দীর্ঘ বৈঠকে মিলিত হয়। কানাডায় সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্র ফাঁস হয় ২০০৬ সালে।

এফবিআই’র তথ্যে আরও জানা যায়, ২০০৫ সালের এপ্রিলে সাদেকী এবং হারিস ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলের গম্বুজ, হোয়াইট হাউজসহ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সংরক্ষণাগার ধ্বংসের পরিকল্পনা হিসেবে এসকল এলাকা ভ্রমণ ও ভিডিও টেপ তৈরি করেছিল। পরে সাদেকী সেগুলো প্রেরণ করে ইউনূস টিসোলি ওরফে ইরহাবি এবং আবিদ হুসেন খানের কাছে। ইউনূস টিসোলি হচ্ছে আল কায়েদার ওয়েবমাস্টার, আল কায়েদায় ভর্তির মূল ব্যক্তি এবং আল কায়েদার অভিযানের সপক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালানোর প্রধান সংগঠক। অন্যদিকে আবিদ হুসেন খান হচ্ছে পাকিস্তানভিত্তিক দু’টি সন্ত্রাসী গ্রুপের সহায়তাকারী। ওরা দু’জনই যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত থাকার দায়ে বর্তমানে জেল খাটছে।

২০০৫ সালের ১৮ আগস্ট সাদেকী বাংলাদেশে আসার সময় আমেরিকার কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল বিমান বন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সন্দেহ হলে তার লাগেজ তল্লাশি করলে তার ল্যাপটপের সিডিরমে আমেরিকার ওয়াশিংটনের পুরো অঞ্চলের ম্যাপ পাওয়া যায়। তখন সে বাংলাদেশে খালার বাড়িতে বেড়াতে আসছে বলে মন্তব্য করলে এফবিআই’র কর্মকর্তাদের সন্দেহ বেশ জোরালো হয়। কিন্তু তাকে আটক করা হয়নি।

ঢাকায় এসে সাদেকী মিলিত হয় সন্ত্রাসী টিসোলি এবং সুইডেনের সন্ত্রাসী মিরসাদ বেকটাসেভিচের সঙ্গে। তারা তিনজনে পরামর্শ করে ইউরোপে জিহাদি গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে। সুইডেনভিত্তিক এ সংগঠনের নাম ঠিক করা হয়-আল কায়েদা ইন নর্দার্ন ইউরোপ (এজন্য সাদেকী আগেই সুইডেনের ভিসা সংগ্রহ করে)। এর কয়দিন পরই মিরসাদ গ্রেপ্তার হয় বসনিয়া-হারজেগোভিনার রাজধানী সারাজেভোতে। তাকেও জেলদ- দেয়া হয়েছে সন্ত্রাসে লিপ্ত থাকার দায়ে। সাদেকী ও হারিস ২০০৬ সালের ৬ মার্চ কানাডার টরেন্টোতে গিয়ে কানাডায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সদস্য বলে আন্তর্জাতিক তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহযুক্ত অন্তত ৩টি ইসলামী জঙ্গি গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং একই সঙ্গে আমেরিকায় ফিরেছে ১৩ মার্চ।

সাদেকীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ২৮০ ডলার দিয়ে বাসের দু’টি টিকিট ক্রয় করা হয় এবং একই কনফারমেশনে টিকিট দু’টি হস্তান্তর করা হয়েছে। ইমিগ্রেশনের নথিতেও দেখা যায়, তারা দু’জনে কানাডা থেকে আমেরিকায় ফেরার সময় কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে সীমান্ত অতিক্রম করেছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ