৮ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ

মুষলধারের বৃষ্টিতে ফের অশ্রুসজল ডিএনডিবাসী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:১৭ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ রবিবার | আপডেট: ০৩:৪৭ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার


মুষলধারের বৃষ্টিতে ফের অশ্রুসজল ডিএনডিবাসী

পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে বৃষ্টির পরে দীর্ঘ ৮ দিনে আর বৃষ্টি হয়নি। তবে রোববার ১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে মুষলধারের বৃষ্টিতে ফের অশ্রুসজল ডিএনডিবাসী। গত কয়েক মাস ধরেই ডিএনডির অভ্যন্তরের বিভিন্ন এলাকাতে বিরাজ করা কৃত্রিম বন্যা আর জলাবদ্ধতার মধ্যে মুষলধারের বৃষ্টি আবার বিষিয়ে তুলেছে ডিএনডি অধিবাসীদের জনজীবন।

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটির পরে রোববার কর্মমুখর হয়ে উঠেছিল নারায়ণগঞ্জ। খুলেছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। তবে মুষলধারের বৃষ্টির কারণে বাড়ি ফিরতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়ি ফেরা সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের। এদিকে ডিএনডির অভ্যন্তরে বসবাসরত ২০ লাখ মানুষকে কৃত্রিম বন্যা আর জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে গেল বছরের মাঝামাঝিতে একনেকে ৫৩৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও সেই প্রকল্পের কাজ এখনো শুরু হয়নি। ফলে বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতাকে নিজেদের জন্য অভিশাপ বলেই মনে করছেন ডিএনডি অধিবাসীরা।

জানা গেছে, ইরি ধান চাষাবাদের জন্য ১৯৬৫ সালে ৮ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি করা হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ। ৩২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডিএনডি বাধের ভেতর ৫৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ২০ লাখ লোকের বসবাস। তখন ডিএনডির ভেতর সেচ প্রকল্প ছিল পাঁচ হাজার ৬৪ হেক্টর। সূত্র জানায়, ডিএনডি বাঁধের ভেতর কংস নদ এবং নলখালী খালের মতো ৯টি খাল ছিল। যা ডিএনডির ইরিগেশন প্রজেক্টে সেচখাল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এসব খালের ছিল আরও ৯টি শাখা খাল। এছাড়াও ছিল ২১০টি আউটলেট, ১০টি নিষ্কাশন খাল। এসব খালের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ১৮৬ কিলোমিটার। এ মধ্যে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ইনটেক খাল, ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ মেইন ক্যানেল টার্ন আউট খাল রয়েছে। এর মধ্যে চ্যানেল-১ খালের র্দৈঘ্য ৭ দশমিক ৯০ কিলোমিটার, চ্যানেল-২ এর দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৮০ কিলোমিটার, পাগলা খাল ৩ কিলোমিটার, জালকুড়ি খাল ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার, শ্যামপুর খাল ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার, ফতুল্লা খাল ১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ও সেকেন্ডারী চ্যানেলের দৈর্ঘ্য ১০ কিলোমিটার। কংস নদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই। এ সকল খালগুলোর অধিকাংশই ভরাট হয়ে গেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানান।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, আশির দশকের পর থেকে লোকজন ডিএনডি বাঁধের ভেতর জমি কিনে অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, ইটের ভাটা, ছোট-বড় শিল্প-কারখানা নির্মাণ করে। কিন্ত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের রক্ষনাবেক্ষন না থাকায় খাল দখল ও ভরাট করে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, কলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মান করায় নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য স্থাপনা অল্প বৃস্টিতেই হাটু পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে ডিএনডির জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্প্রতি প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খালের মধ্যে ৩৯ কিলোমিটার জায়গার ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়েছিল। তবে সেটা শুধুমাত্র কচুরিপানা পরিস্কারেই শেষ হয়েছে। দুই বছর আগে ডিএনডির সকল খাল ও দখলদারদের তালিকা তৈরী করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশ দিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা। তবে নির্দেশ দেয়া হলেও তালিকা তৈরী কিংবা অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০১৫ সালের ২৩ জুলাই পরিকল্পনামন্ত্রী ও শামীম ওসমান ডিএনডি এলাকা ঘুরে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানানোর পরে আশার সঞ্চার হয় ডিএনডি অধিবাসীদের মধ্যে।

এরমধ্যে গেল বছরের ৯ আগষ্ট একনেকের সভায় ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) সেচ প্রকল্প এলাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে এবং জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ৫৩৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (ফ্রেজ-২)’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ওই প্রকল্প অনুমোদনের পরে ডিএনডি অধিবাসীরা যেমন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে তেমনি বিভিন্ন এলাকাতেও বইতে শুরু করে খুশির জোয়ার।

ওই সময়ে পাউবোর ঢাকা কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কাজ শুরুর পর আগামী বর্ষার আগেই কিছু অগ্রগতি আশা করা যায়। তবে পুরো ফল পাওয়া যাবে কাজ শেষ হলে। তিনি বলেন, বাঁধের ভেতর ১০ শতাংশ জায়গা রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। তবে সেখানে অপরিকল্পিত বাড়িগুলো প্রকল্পের কাজে খুব প্রভাব ফেলবে না। তারপরও রাজউক এবং ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় থাকবে। এই প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন পাম্পহাউস করা হবে। একটি পাম্পহাউস আদমজী নগরে এবং আরেকটি হবে শিমরাইলে পুরোনো পাম্পহাউসের পাশে। এ ছাড়া শিমরাইলে ৭টি, আদমজী নগরে ৬টি, শ্যামপুরে ২টি, পাগলায় ১০টি ও ফতুল্লায় ছোট-বড় ১২টি পাম্পস্টেশন বসানো হবে। এসব পাম্পহাউস ও স্টেশন বসানোর পর শুরু হবে বাঁধের ভেতরে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল সংস্কারের কাজ।

এদিকে ওই প্রকল্পটি একনেকে পাশ হওয়ার পরে অধিবাসীদের ধারনা ছিল শীঘ্রই প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। তবে ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবধি শুরু হয়নি প্রকল্পটির কার্যক্রম। বরং ডিএনডি এলাকার বেশীরভাগ পানি নিস্কাশনের পাম্প বিকল হয়ে পড়েছে। কয়েকদফা বৃষ্টিতে ডিএনডির বেশ কিছু নি¤œাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ফলে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা উৎসবেও অধিবাসীদের অনেকের মধ্যে ঈদের আনন্দ ছিলনা। জলাবদ্ধতার কারণে এবছর ডিএনডি অধিবাসীদের অনেকেই কোরবানী দিতে পারেননি বলে জানা গেছে। আর যারাও কোরবানী দিয়েছেন তাদেরকেও পোহাতে হয়েছে নানা দুর্ভোগ। এদিকে পবিত্র ঈদুল আযহার দিন সকালে বৃষ্টি হলেও এরপর দীর্ঘ ৮ দিনেও কোন বৃষ্টি হয়নি। যে কারণে ডিএনডির বিভিন্ন এলাকাতে জলাবদ্ধতার পানি কমে আসতে শুরু করেছিল। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল মোড়ে অবস্থিত ডিএনডি পাম্প হাউজে আরো দু’টি পাম্প বৃদ্ধির কারণে পানি অল্প অল্প করে কমছে। কিন্তু রোববারের মুষলধারের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ আরো কয়েকগুন বেড়েছে বলে জানান অধিবাসীরা

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Loading...
Shirt Piece

ফিচার -এর সর্বশেষ