৯ শ্রাবণ ১৪২৪, সোমবার ২৪ জুলাই ২০১৭ , ২:৪১ অপরাহ্ণ

diamond world

একজন চন্দন শীলের কান্না


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:১৯ পিএম, ২০ জুন ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ১০:৩৭ পিএম, ২০ জুন ২০১৭ মঙ্গলবার


একজন চন্দন শীলের কান্না

তরুণ বয়সে সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন চন্দন শীল। যার কারণে সব সময় সব কিছুতেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন তিনি। খেলাধুলা আর নাচ গানই ছিল সব থেকে প্রিয়। নিয়মিত খেলাধুলা আর ধর্মীয় উৎসব কিংবা কোন অনুষ্ঠানে নাচে গানে জমিয়ে রাখতেন তিনি। তেমনি রাজনীতিতেও ছিলেন খুব সক্রিয়। দলীয় কর্মসূচির সভা সমাবেশে অথবা মিছিলে হৃদমের সঙ্গে জোড়ালো স্লোগানে মুখরিত করে রাখতেন রাজপথ। তবে একটা সন্ধ্যা জীবনের সব আশা আকাঙ্খা নিভিয়ে দিয়ে গেছে। নিহতদের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও বেঁচে আছেন স্ত্রীর সিঁথির সিঁদুর হয়ে আর একজন অসহায় রাজনীতিবিদ হয়ে। তিনি বলেন ‘আমার সব থেকে বড় আত্মতৃপ্তি হচ্ছে আমি দলের একজন প্লেয়ার। স্কোয়াডে আছি। বাইরে থাকলে কি করার আছে? সাইড লাইনেই হোক বা স্ট্যান্ডিং লাইনেই হোক টিমে আছে। অধিনায়ক যখন মনে করে আমাকে খেলাতে পারে। আর প্রত্যাশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষন মুক্ত সমাজ ও সোনার বাংলা গড়ে তোলা। যেখানে অভাব অনটন থাকবে না, মানুষের মৌলিক অধিকার গুলো পূরণ করবে।’
 
২০০১ সালের ১৬ জুন চাষাড়া শহীদ মিনার ঘেষা আওয়ামী লীগ অফিসে তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের গণসংযোগ কর্মসূচিতে সাংগঠনিক কর্মকান্ডে জড়িত নেতৃবৃন্দরা জড়ো হতে থাকে। রাত ৭টার মধ্যে পুরো অফিস লোকে লোকারন্য হয়ে পড়ে। রাত পৌনে ৯টায় বিকট শব্দে বিষ্ফোরিত হয় বোমাটি। হামলায় শামীম ওসমান সহ অর্ধশতাধিক আহত হয়।  যেখানে দুই পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন চন্দন শীল।
 
চন্দন শীল নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সহ সভাপতির পদে রয়েছেন। এছাড়াও তিনি ঘাতক দালল নির্মূল কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি।
 
চন্দন শীল বলেন, ‘আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি খুব গান পাগল লোক। এখনও খুব ভালোবাসি। পূজা, ঈদ, নববর্ষ সহ সকল উৎসবগুলোতে বন্ধু বান্ধব নিয়ে খুব উপভোগ করতাম। নাচ গান করতাম। আমি নিজেও এগুলো করতাম। আর সব থেকে বেশি আমি খেলাধুলা করতাম। এখন এগুলো খুব মিস করি। স্লোগান দিতে খুব ভালোবাসতাম। এখনও স্লোগান দেই। কিন্তু এখন রিকশায় বসে বসে স্লোগান দেই। এগুলো খুব মিস করি। কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে তার আর কথাও বন্ধ হয়ে যায়।’

দু’হাতে চোখের চল মুছতে গিয়ে চন্দন শীল বলেন ‘আমার একমাত্র ছেলে অরজিত শীল তখন ছোট, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ালেখা করতো। সেই সময় একটা ভালো খেলোয়ার ছিল। সেই সময় জাতীয় দলের অধীনে ক্রিকেটে অনূর্ধ্ব ১৩ এর একটি স্কোয়াড হয়েছিল, সেখানে তাকে ডাকা হয়েছিল। একটা সম্ভাবনা ছিল তার কিন্তু এ ঘটনায় তা আর হয়নি। সেই স্বপ্নটা চুরমার হয়ে গেছে। এ ক্ষতি কেউ পূরণ করতে পারবে না।’

সেইদিনের ঘটনা সম্পর্কে চন্দনশীল বলেন, প্রতি সপ্তাহের শনি ও সোমবার সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সেইদিন আমার আশার কথা ছিল না। আমি জ্বরে আক্রান্ত ছিলাম বলে আসতে চাইনি। পরে নেতাকর্মীরা আমাকে ফোন দিয়ে বলে আসতেই হবে। তাই সন্ধ্যায় কার্যালয়ে এসে দেখি শামীম ওসমানের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ লোক খুব জোরগলায় কথা বলছেন। তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য একটি দরখাস্তে স্বাক্ষর দিতে হবে শামীম ওসমানের। পরে সেখান থেকে শামীম ওসমানকে সরিয়ে দেতেই বৃদ্ধাও কোন কিছু না বলে চলে যায়। সেই মুহূর্তে পায়ের একটু সামনে প্রচন্ড বিস্ফোরণ। চোখের সামনে আগুনের গোলা। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। দুই পা বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিল ক্লাবের সামনে। রক্তের বন্যা বয়ে গেছে। নিথর দেহের পাশে আহতদের গোঙানির শব্দ যেন মৃত্যুপুরী। আরো কয়েকজন সহ আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর পরে আর কিছু বলতে পারি না। পরে আমাকে ও রতন দাসকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শামীম ওসমান ও আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জার্মানিতে পাঠান। টাকার অভাবে জার্মানিতে পুরোপুরি চিকিৎসা করাতে পারিনি। যতটুকু হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন এমপি শামীম ওসমানের বদৌলতে। জার্মানি থেকে ফিরে ভারতে চিকিৎসারত অবস্থায় আর্থিক সংকটে পড়েছি। এমনও দিন গেছে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা খেয়েছি। বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমার ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা ছিল সেটাও বন্ধ করে দেয় তৎকালীন বিএনপি জামায়াত জোট সরকার এছাড়াও বিভিন্নভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা করেছে।`
 
তিনি আরো বলেন, ‘এখন কৃত্রিম পা নিয়ে কিছুটা চলাফেরা করছি। একটা বীমা কোম্পানিতে চাকুরি করি। আমার স্ত্রী সুতপা শীল রমা একটি বেসরকারি স্কুলের চাকুরি করেন। ছেলে সদ্য একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকুরি পেয়েছে। এ নিয়েই সংসার চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি, তাই একে আর ভয় পাই না। যারা চাষাঢ়াসহ সারা দেশে এ বর্বরোচিত বোমা হামলা চালিয়েছে, আমৃত্যু তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাব।’

তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে কখনো পদ চাই নাই। আমরা কাছে ভালো লাগে না চেয়ে নেওয়া বা হাত পাতা।  যোগ্যতা অনুযায়ী রাজনীতিতে আসা উচিত। সর্বনি¤œ এক মেধা থাকা উচিত। কারণ রাজনীতি একটা বিশাল ব্যাপার। রাজনীতিবিদদের কাছে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পড়ে, মানুষের সেবার দ্বায়িত পড়ে। সেখানে যদি কোন কিছু জানা না থাকে, কোন মেধা না থাকে তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।’
 
চন্দন শীল বলেন, ‘আমি মনে করি এটি একটি দল। এ দলের ক্যাপটেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমার সব থেকে বড় আত্মতৃপ্তি হচ্ছে আমি দলের একজন প্লেয়ার। স্কোয়াডে আছি। বাইরে থাকলে কি করার আছে। সাইড লাইনেই হোক বা স্ট্যান্ডিং লাইনেই হোক টিমে আছে। অধিনায়ক যখন মনে করে আমাকে খেলাতে পারে।’

স্ত্রী সুতপা শীল রমা বলেন, `পা হারালেও ও তো (চন্দন) বেঁচে আছে। আমার সিঁথির সিঁদুর তো আর মুছে যায়নি। এতেই আমি সুখী।`
 
চন্দন শীল বলেন, তবুও প্রত্যাশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন শোষন মুক্ত সমাজ ও শোষন মুক্ত সোনার বাংলা। যেখানে অভাব অনটন থাকবে না। মানুষের যে মৌলিক অধিকার গুলো সেগুলো পূরণ করবে। প্রধানমন্ত্রী অনেক উন্নয়ন করছেন। আশা করি সেটা পূরণ হবে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

সাক্ষাৎকার -এর সর্বশেষ