৮ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৭:২৯ পূর্বাহ্ণ

একাত্তরের নয় মাস শহীদের আর্তনাদ ছড়িয়েছিল নারায়ণগঞ্জের বাতাসে


রীতা ভৌমিক || অতিথি লেখক

প্রকাশিত : ০৯:৩৯ পিএম, ১৯ মে ২০১৭ শুক্রবার


একাত্তরের নয় মাস শহীদের আর্তনাদ ছড়িয়েছিল নারায়ণগঞ্জের বাতাসে

একাত্তরের ২৮ মার্চ দুপুর ১২টার দিকে পাকসেনারা মাসদাইরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এরপর বৃষ্টির মতো গুলি করতে করতে পাকসেনারা নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। মর্টার, ট্যাঙ্ক, গোলাগুলির শব্দে নারায়ণগঞ্জ শহরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণভয়ে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পালাতে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় হানাদাররা ক্যাম্প করে। পাকসেনাদের আক্রমণের খবর পেয়ে আমেনা মঞ্জিলের মালিক আমেনা বেগম ছাদে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের পতাকা নামাতে। পৌরসভা থেকে হানাদারবাহিনী আমেনা বেগমকে পতাকা নামাতে দেখে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। সেখানেই শহিদ হন তিনি।

নিরীহ মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ধ্যায় পাকসেনারা গাড়িতে চড়ে শহরের এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়। পাকসেনাদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাহাবুদ্দীন আহম্মেদ বলেন, নারায়ণগঞ্জ টানবাজার এলাকায় আশা সিনেমা হলের মালিক মোশারফ হোসেন মাশা ছাত্রলীগের কার্য্যালয়ে চিন্তাক্লিষ্ট মুখে সহকর্মীদের নিয়ে ভাবছিলেন। কিভাবে পাকসেনাদের তাদের বর্বরতার জবাব দেয়া যায়। তারা যে ছাত্রলীগের কার্য্যালয়ে অবস্থান করছিলেন সেই খবর পাকসেনাদের কাছে পৌঁছতে সময় লাগেনি। নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত এক দালাল সেই খবর হানাদারবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে হানাদারবাহিনী ওখানে আক্রমণ চালায়। হানাদারবাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে মোশারফ হোসেন মাশা বুক চেপে ছুটে যান তার বাবা-মায়ের কাছে। বলেন, ‘ডাক্তারও ডাকো - আমি বাঁচবো। আমাকে বাঁচাতে হবে আমার সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ভাইবোনের জন্য।’ কিন্তু কোথাও ডাক্তার পাওয়া যায়নি। চিকিৎসাহীন অবস্থায় রাত একটার দিকে মারা যান মাশা। ছাত্রলীগের কার্য্যালয়ে সেদিন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক চিত্তও ছিলেন। তাঁর ওপর হানাদারদের অস্ত্র গর্জে ওঠে। হানাদারবাহিনী একটি গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি। তাকে লক্ষ্য করে পরপর চারটি গুলি করে। এরপর ছাত্রলীগ কার্য্যালয়ে আগুন ধরিয়ে চিত্তের মৃতদেহ তার মধ্যে ছুঁড়ে দেয়।

পাকসেনাদের ভয়ে বাবুরাইল এলাকার জলিল খলিফা প্রাণভয়ে মসজিদের ভেতর লুকিয়েছিলেন। শেষরক্ষা হয়নি তার। জোয়ানরা মসজিদে ঢুকে খানাতল¬াশি চালায়। জলিল খলিফা মসজিদ থেকে বের হয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় দেয়। জোয়ানরা তাকে লক্ষ্য করে পেছন থেকে  গুলি চালায়। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সেখানেই তিনি শহিদ হন।

২৮ মার্চ মধ্যরাতে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জের ১১ আর.কে.দাস রোডের এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকসেনারা প্রবেশ করে। তারা ওই বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের মালিক সন্তোষ রায় চৌধুরীর কাছে তার পরিচয় জানতে চায়। সেখানে অবস্থানরত সকলের পরিচয় জানার পর পাকসেনারা চলে যায়।

এ প্রসঙ্গে শহিদ গোবিন্দ চন্দ্র পোদ্দারের নাতি অধ্যাপক জীবন পোদ্দার বলেন, কিছুক্ষণ পরই পাকসেনারা ওই প্রতিষ্ঠানে ফিরে আসে। জানালা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও জয়গোবিন্দ হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সন্তোষ রায় চৌধুরী, তার ছোট ভাই লোটন রায় চৌধুরী এবং কর্মকর্তা কুমিল্ল¬ার নবীনগর থানার কাইতলা গ্রামের গোবিন্দ চন্দ্র পোদ্দারকে ঘুমন্ত অবস্থায় জানালা দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে।

নিতাইগঞ্জ পুলের ওপরও পাকসেনারা রাজাকারদের সহায়তায় এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাস বিজয়ের আগ পর্যন্ত অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। তারা প্রতিদিন তিন থেকে চারজন মানুষকে হত্যা করত।

এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকসেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ সদরের বঙ্গবন্ধু সড়কের বা দিকে আর. কে. দাস রোডের প্রথম বাড়ি আনন্দ পোদ্দার ভবনে আক্রমণ চালায়। এই বাড়িটি ছিল পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান  নারায়ণ চন্দ্র পোদ্দারের। তারা পুরুষাণুক্রমে  সোনারগাঁর পানামের জমিদার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের কয়েকবছর আগে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর তিন ছেলে সপরিবারে এই বাড়িতে বসবাস করতেন।

মুক্তিযোদ্ধা শংকর রায়ের মতে, রাত দশটার দিকে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ২৫ থেকে ৩০ জন পাকসেনা আনন্দ পোদ্দার ভবনে প্রবেশ করে। পাকসেনারা ওই ভবনে ঢুকে নারায়ণ চন্দ্র পোদ্দারের তিন ছেলে সতীশ চন্দ্র পোদ্দার, জ্যোতি লাল পোদ্দার ও তাদের স্ত্রী, নিকটাÍীয় যারা তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং পাঁচ থেকে ছয় জন কর্মচারিসহ ১৬ জন ব্যক্তিকে ব্রাশ ফায়ার করে। তারা যখন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল সেসময় পাকসেনারা পুরো বাড়িতে গান পাউডার ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখায় মৃতদেহগুলো পুড়ে যায়।

ভারত থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম দেওভোগের আমবাগানের খোকন বিশ্বাস জুলাই মাসে স্থানীয় দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে বাবুরাইলের শেষ মাথায় হাকিম কন্ট্রাক্টরের মাঠে গেরিলা প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সফিউদ্দিন আহম্মেদ জানান, বাবুরাইলের গোলাপ খান নামে একজন রাজাকারের তা চোখে পড়ে যায়। রাজাকার এই দৃশ্য দেখামাত্র তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রশিক্ষণরত দু’জন মুক্তিযোদ্ধা দৌড়ে পালাতে সক্ষম হলেও খোকন বিশ্বাস বাঁচার তাগিদে পার্শ্ববর্তী পুকুরে ঝাঁপ দেয়। রাজাকার গোলাপ খান তাকে লক্ষ্য করে পুকুরে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। রাজাকারের ছোঁড়া গুলি লেগে পুকুরেই তিনি শহিদ হন।

নারায়ণগঞ্জ টার্মিনাল বধ্যভূমি ছিল পাকসেনাদের আরেকটি হত্যাযজ্ঞ কেন্দ্র। মুক্তিযোদ্ধা নাজিরউদ্দিন আহম্মেদ এর মতে, পাকসেনারা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। হানাদাররা নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালকে নিরীহ মানুষের হত্যাযজ্ঞ স্থানে পরিণত করে। দিনের বেলায় বিভিন্ন স্থান থেকে নিরীহ মানুষদের নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালে ধরে নিয়ে আসত। এসব মানুষের ওপর চালাত অমানবিক নির্যাতন। রাতের অন্ধকারে বন্দি নিরীহ মানুষদের গুলি করে হত্যা করত। এরপর শহিদদের মৃতদেহগুলো শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিত। (বি:দ্র: লেখাটি লেখকের নিজস্ব অনুসন্ধানে লেখা এর সঙ্গে নিউজ নারায়ণগঞ্জ এর কোন তথ্যের সম্পৃক্ততা নেই। ফলে এ লেখার কোন ধরনের দায় লেখকের উপর বর্তাবে)।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Loading...
Shirt Piece

সাহিত্য-সংস্কৃতি -এর সর্বশেষ