৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শনিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৭ , ২:৫০ পূর্বাহ্ণ

বিদ্যুৎ চুরি, চৌকি ভাড়ার কোটি টাকা কার পকেটে?


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৪২ পিএম, ১৮ জুন ২০১৭ রবিবার


বিদ্যুৎ চুরি, চৌকি ভাড়ার কোটি টাকা কার পকেটে?

নারায়ণগঞ্জ শহরে গত বছর রোজার মধ্যে ফুটপাত দখল করে হকার বসানো নিয়ে বেশ তুলকালাম কাণ্ড ঘটলেও এবার চিত্র একেবারেই ব্যতিক্রম। এবার বরং কোন ধরনের হুংকার কিংবা প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকায় হকাররা নির্বিঘ্নে দখল করে আছে ফুটপাত। শহরে লোকজন হাটাচলা করতে পারছে না। লোকজনকে রাস্তায় নেমে আসতে হয়েছে। এতে বাড়ছে যানজট। তবে এবার হকারদের খরচ করতে হয়েছে হাজার হাজার টাকা। প্রতিদিন অন্তত ৩ থেকে ৪লাখ টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে এসব ফুটপাতের দোকান থেকে। দৈনিক চাঁদা তো বটেই সঙ্গে আবার জায়গা দখল নিয়েও গুণতে হয়েছে মোটা অংকের টাকা। পুলিশ, রাজনীতিক সহ বিভিন্ন মহলের নামে ওই চাঁদাবাজী রোজার পুরো মাস জুড়ে আদায়ের ফলে ছাড়িয়ে যাবে কোটি টাকা।

খোঁজ নিয়ে গেছে, গত বছর শহরে ফুটপাতে হকার নিয়ে এমপি শামীম ওসমানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মধ্যে অঘোষিত যুদ্ধ ছিল। সিটি করপোরেশনের তাগিদের কারণে প্রতিনিয়ত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও জেলা প্রশাসন এসব ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ফলে হকারেরা সংঘবদ্ধ হয়ে এমপি শামীম ওসমানের কাছে ধর্না দেয়। পরে শামীম ওসমান ওইসব হকারদের মানবিক দিক চিন্তা করে ফুটপাতে বসতে দেয়। তবে গত এক বছরেও এ নিয়ে স্থায়ী কোন সুরহা হয়নি। কিন্তু এবার এ নিয়ে শামীম ওসমান জেলা প্রশাসনের এক সভায় হকার ইস্যু নিয়ে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন। তবে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসন তেমন মাথা ঘামায়নি। সে কারণে রোজার আগে থেকেই শহরের হকার বসে যায় ফুটপাত দখল করে।

শহরের চাষাঢ়া হতে দুই নং রেল গেট হয়ে ডিআইটি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের দুই পাশ, শহরের গ্রীন্ডলেজ ব্যাংক মোড় হতে ফ্রেন্ডস মার্কেট পর্যন্ত শায়েস্তা খান সড়ক, কালীরবাজার হতে এক নং রেল গেট পর্যন্ত সিরাজউদ্দৌলা সড়কের দুই পাশ এখন হকারে ভরপুর। নিয়মিত হকারদের সঙ্গে ঈদ ও রোজা উপলক্ষ্যে জুড়েছে আরো হকার। যদিও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে শহরের চাষাঢ়ায় হকার্স মার্কেটে ৬শ দোকান হকারদের মধ্যে বরাদ্দ থাকলেও এসব দোকান মালিকেরাই নতুন করে শহরে ফুটপাত দখল করে রেখেছে।

নাম প্রকাশে হকারদের একটি সূত্র জানায়, এখন শহরে অন্তত ১ হাজার থেকে ১২ শ হকার রয়েছে। সব সময়ে শহরে ৪ থেকে ৫শ হকার থাকলেও রোজা উপলক্ষ্যে বেড়েছে। এজন্য লাইনম্যানও আছে। ৫ ব্যক্তি মূলত হকারদের এ লাইন ঠিক করে। একেকজনের দায়িত্বে একেক ধরনের ফুটপাত। রোজা উপলক্ষ্যে এসব ফুটপাতে চৌকি তথা পসরা নিয়ে বসানোর জন্য ২ হাত বাই ৩ হাত চৌকি বসাতে এককালীন দিতে হয়েছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর ৪ হাত বাই ৫ হাত চৌকি বসাতে দিতে হয়েছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। আবার প্রতিদিন ৪ভাগে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। দোকান হতে প্রতিদিন চারভাবে নেওয়া হচ্ছে ১শ টাকা করে ৪শ টাকা।

বিভিন্ন হকারদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মচারী, পুলিশ ফাঁড়ি, থানা পুলিশের নামে কয়েকজন কনস্টেবল, রাজনৈতিক নেতাদের নামে প্রতিদিন সকাল ১০টা হতে দুপুর ২টার মধ্যে একবার ও বিকেল ৩টা হতে রাত ১০টার মধ্যে আরো একবার তথা দুই দফা টাকা আদায় করা হয়। সে হিসেবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজী হচ্ছে। সে হিসেবে রোজার পুরো মাস জুড়ে চাঁদার সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় কোটি টাকার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হকার জানান, এবার রোজার আগেই জানানো হয় উচ্ছেদ হবে না। সে কারণেই অনেক হকার এককালীন চৌকির জায়গা দখল করে নেয়। সকালে ৪জনকে ৪শ ও বিকেলে একই জনকে ৪শ টাকা দিতে হয়। মানে প্রতিদিন গুণতে হয় ৮শ টাকা। আর এককালীন তো আছেই। ওই হকার আরো জানান, আগে থেকে চৌকির জায়গা কিনতে হয়েছে। তবে যাদের নামে এসব টাকা আদায় করা হচ্ছে তারা আদৌ জড়িত কি না জানি না। কিন্তু যেহেতু এবার উচ্ছেদ নাই সেহেতু টাকা দিতে সমস্যা নাই। গতবার এর চেয়ে বেশী টাকা দিতে হয়েছে। তাছাড়া বিদ্যুতের লাইনের জন্যও প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছে আরো ৫০ টাকা করে। শর্ত একটি বাতির বেশী জ্বালানো যাবে না।

এদিকে গত ১১ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় এমপি সেলিম ওসমান বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জের হকার ব্যবসায়ীদের ৫ ভাগও স্থানীয় না। এখন পুলিশ যদি দোকান ভেঙে দেয় তাহলেও দোষ, আবার বসতে দিলেও দোষ। আমাদের কিছু দালাল প্রকৃতির লোক আছে তারা এই লোকদেরকে বসিয়ে মহা আনন্দে গাড়ি দিয়ে ঘুরছে। রাস্তায় গেলে দেখা যায় রাস্তর দুপাশে ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে। এরপর আবার ভ্যানগাড়ি করে রাস্তার মাঝখানে দোকান বসানো হয়েছে। এর জন্য জনপ্রতিনিধিরা অনেকাংশে দায়ী। জনপ্রতিনিধিরা মনে করছেন নির্বাচন এলে তারা ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে। কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি তাদের মধ্যে ৫ ভাগও নারায়ণগঞ্জের ভোটার না। আমার কিছু দালাল প্রকৃতির লোক আছে যারা তাদেরকে কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের দোকান বসানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজেরা পাজারো গাড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার কিছু কিছু কাজ করতে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব সমস্যাগুলো যার যার এলাকায় নিজেদেরই করতে হবে। সিটি করপোরেশনে এলাকায় হলে দায় সিটি করপোরেশনের আর ইউনিয়ন এলাকায় হলে দায় ওই ইউনিয়ন পরিষদের। তবে আজকে যদি পুলিশ সুপার তাদের সবাইকে উঠিয়ে দেন তাতেও দোষ হবে। আবার তাদের উঠিয়ে দিলে তারা নানা অপকর্মে লিপ্ত হবে। তাই তাদের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করে দিয়ে তখন নির্দেশনা দিতে হবে নতুন করে রাস্তার পাশে আর কোন দোকান বসতে পারবে না।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ