৯ শ্রাবণ ১৪২৪, সোমবার ২৪ জুলাই ২০১৭ , ২:৪১ অপরাহ্ণ

diamond world

নারায়ণগঞ্জে বছরে সড়ক মেরামতের কোটি টাকা গচ্চা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪৫ পিএম, ৮ জুলাই ২০১৭ শনিবার | আপডেট: ০৯:২৮ পিএম, ৯ জুলাই ২০১৭ রবিবার


নারায়ণগঞ্জে বছরে সড়ক মেরামতের কোটি টাকা গচ্চা

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়ক এই দু’টি সড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সড়ক। এই দু’টি সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে থাকে। নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ারও অন্যতম রুট দু’টি। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল মোড় রুটটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই সড়ক তিনটি মেরামতে একবছর আগে কয়েক কোটি টাকা খরচ করেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। তবে বছর না ঘুরতেই সড়ক মেরামতের কয়েক কোটি টাকাই যেন গচ্চায় পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে সড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে পরিণত হয়েছে খানা খন্দকে। যাতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে যানবাহন চালক ও যাত্রীদের। রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।    

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের অন্যতম রুট হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা রুট থাকলেও উড়াল সেতুর (যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার) কারণে লিংক রোড দিয়েই মূলত লোকজন বেশী চলাচল করে। প্রাইভেট কার ছাড়াও গণপরিবহনে এ রুটে যাত্রী সংখ্যাও বেশী। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবুমার্কেট এলাকাতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পাগলাতেও রয়েছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া লিংক রোডের দুই পাশেই রয়েছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এদিকে দুই দশক পূর্বেও রাজধানী ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জে আসার প্রধান রুট ছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়ক। এছাড়া ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকা থেকে মুক্তারপুর হয়ে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার একটি রুটও রয়েছে। তবে নব্বই’র দশকের দিকে পোস্তগোলা এলাকায় চীনের অর্থায়নে ব্রীজ নির্মাণের পর মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি সেতুবন্ধন রচিত হয়। ১৯৯৫ সালের দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে দ্রুত যাতায়াতে ওই রুটটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মূলত এরপর থেকেই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়কটিতে আর প্রশস্থতার ছোঁয়া লাগেনি। ঢাকা সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্যমতে, শহরের চাষাঢ়া থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়কের পোস্তগোলা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার। সড়কটির প্রশস্ততা মাত্র ২৪ ফুট। কিছু কিছু স্থানে সামান্য বেশী রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিতে গত ২ যুগেও লাগেনি প্রশস্ততার ছোঁয়া।   

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটি সংলগ্ন শাসনগাওয়ের বিসিক শিল্পনগরী এলাকাতে রয়েছে অন্তত সহ¯্রাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যাতে অন্তত ৩ লাখ শ্রমিক কাজ করছে। শুধুমাত্র বিসিক শিল্পনগরী থেকেই প্রতি বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। ফতুল্লার মুন্সিখোলা এলাকায় রড সিমেন্টের পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্র, আলীগঞ্জ ও দাপায় পাথর ও বালু ব্যবসা, ফতুল্লার পঞ্চবটি, নরসিংপুর, বক্তাবলী এলাকায় শতাধিক ইটভাটা, বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক রি-রোলিং মিল, পঞ্চবটিতে মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়াম তেলের ডিপো অবস্থিত। এসকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্যবাহী কাভার্ডভ্যান, ট্রাক, তেলের ডিপোর ট্যাংকলরীসহ কয়েক হাজার যানবাহন প্রতিনিয়ত চলাচল করছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়ক দিয়ে। মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর এলাকায় গড়ে ওঠা শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্টসহ বেশ কিছু কারখানার কয়েকশত বৃহদাকার কাভার্ডভ্যানও প্রতিনিয়ত সড়কটি দিয়ে যাতায়াত করছে। এছাড়া গণপরিবহনতো রয়েছেই।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল মোড় (চিটাগাং রোড) সড়কের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। এই সড়কটিরও দুই পাশে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আদমজী ইপিজেড যেখানে অর্ধশতাধিক রপ্তানীমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এদিকে সড়ক তিনটির সংস্কারের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। যার মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড ও নারায়ণগঞ্জ-শিমরাইল মোড় (চিটাগাং রোড) এই সড়ক দু’টির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ নারায়ণগঞ্জ বিভাগের। অপরদিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়কের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ ঢাকা বিভাগের। আর নারায়ণগঞ্জ শহর এলাকার রাস্তাগুলোর মেরামতের দায়িত্ব নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের। এদিকে ওই তিনটি সড়কসহ নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন স্থানেই পরিণত হয়েছে খানা খন্দকে।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৫ এপ্রিল ১২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যায়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটির সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। সড়কটিতে যাতে পানি না জমে সেজন্য দীর্ঘ ৩ কিলোমিটার ব্যাপী ড্রেনও নির্মাণ করে সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ। তবে সেই ড্রেন সড়কটির পানি নিস্কাশনের কোন কাজেই আসেনি। কারণ সেই ড্রেনটি পরিপূর্ণ ছিল মাটি ও ময়লার স্তুপে। অপরিকল্পিতভাবে ও সমন্বয়হীনতায় সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ করার কারণে রাস্তাটি পরের বছরই পরিণত হয় খানাখন্দকে। এরপর আবারো কোটি টাকা ব্যায়ে সড়কটির সংস্কার কাজ করে সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ। তবে প্রতি বছর বর্ষা মওসুম এলেই সড়কটিতে পানি জমে পরিণত হচ্ছে খানা খন্দকে। এতে করে সড়কটি সংস্কারের টাকার পুরোটাই গচ্চা গেছে বলে মনে করছেন সকলে।

অপরদিকে ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কটির ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যায়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পাগলা) পুরাতন সড়ক সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা- ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমান। তবে সংস্কার কাজ শুরু হয় কয়েক মাস পরে গেল বছরের শুরুর দিকে। সড়কটি সংস্কারে সড়ক ও জনপথ ঢাকা বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের উদাসীনতার কারণে বছর না পেরুতেই সড়কটির বিভিন্ন স্থানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক এবড়োথেবড়ো অবস্থায় রয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে পরিণত হচ্ছে খানা খন্দকে।

এ বিষয়ে জানতে সড়ক ও জনপথ নারায়ণগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আলিউল হোসেনের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি কিছুই জানেন না বলে তার সহকারী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলতে বলেন। উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি মাত্র কয়েক মাস হয়েছে নারায়ণগঞ্জে যোগদান করেছেন। সড়কটি এর আগে কত টাকা ব্যায়ে মেরামত করা হয়েছিল সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না। তবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটি যে টিকছে না এর সত্যতা তিনি স্বীকার করেছেন। সড়কটি সংস্কারে তারা উর্ধ্বতনদের কাছে চিঠি প্রেরণ করেছেন।

এদিকে গেল বছরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে আধুনিক মেশিনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক সংস্কার করেছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। যাতে প্রায় কোটি টাকার কাছাকাছি খরচ হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে বছর না পেরুতেই নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া, মিশনপাড়া, খানপুর ও কালিরবাজার এলাকাতে সৃষ্টি হয়েছে খানা খন্দকের। এজন্য অবশ্যই ওয়াসার পানি সরবরাহের লাইনে লিকেজ ও পিডিবির খোড়াখুড়িকেই দায়ী করেছেন সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানান, চাষাঢ়া এলাকার সড়কটি সংস্কারে ওয়ার্ক অর্ডার হয়ে গেছে। কালিরবাজারে তারা রাবিশ ফেলে আপাতত চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা করছেন। তবে শহরের সড়কগুলো খানা খন্দকে পরিণত হওয়ার জন্য ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের লাইনে লিকেজ ও পিডিবির খোড়াখুড়িকেই দায়ী করেছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি চাষাঢ়া, মিশনপাড়া ও খানপুর মোড়ে ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের লাইনের লিকেজগুলোর কারণে পানি যতদিকে ছড়িয়েছে সেদিকেই পিচ উঠে খানা খন্দকে পরিণত হয়েছে। লিকেজ মেরামতে আমরা ওয়াসাকে অন্তত ২০টি চিঠি দিয়েছি।

ঢাকা ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের লাইনে কিছু লিকেজ ছিল সেগুলো তারা ইতিমধ্যে মেরামত করেছেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ