৫ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ২:১৪ পূর্বাহ্ণ

‘নরঘাতকদের ফাঁসির দড়িতে দেখতে চাই’


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০১:২৩ পিএম, ২২ আগস্ট ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৪:৪৬ পিএম, ২২ আগস্ট ২০১৭ মঙ্গলবার


‘নরঘাতকদের ফাঁসির দড়িতে দেখতে চাই’

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত ৭ খুন মামলায় আসামিদের নিম্ন আদালতের দেয়া দ- বহাল থাকবে, নাকি পরিবর্তিত হবে সে সিদ্ধান্ত জানা যাবে ২২ আগস্ট মঙ্গলবার। এর আগে ৭ খুনের মামলায় নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রধান আসামী নূর হোসেন, র‌্যাবের ৩জন কর্মকর্তা সহ ২৬ জনকে মৃত্যুদ- ও বাকি ৯জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। পরে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষে ২২ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য্য করা হয়।

তবে এর আগে গত ১৬ জানুয়ারী দেওয়া নি¤œ আদালত বহাল রাখবে এমন প্রত্যাশা নিহত পরিবার ও স্বজনদের। তাঁরা বলছেন, তাদের প্রতাশ্যা শুধু হাইকোর্ট রায় বহাল না সঙ্গে সঙ্গে নূর হোসেন সহ সকলের দ- যেন দ্রুত কার্যকর করা।

সাত খুনে নিহতেরা হলো, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, সহযোগী সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও গাড়ি চালক জাহাঙ্গীর এবং জৈষ্ঠ্য আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক ইব্রাহিম।

নিহত ইব্রাহিমের ছেলে ইসমাইল হাসান রনি বলেন, ‘বাবা আমাকে খুব আদর করতো। কখনো ধমক দিতো না। প্রায় সময় আমাকে বাবা গাড়ি চলাতে দিতো। বলতে আমি পাশে আছি তুমি চালাও। বাবার সঙ্গে ঘুরতে যেতাম, খেলা করেছি, এক সঙ্গে খেয়েছি সব কিছুই আজ স্মৃতি। আমি আমার বাবার খুনীদের ফাঁসির কাষ্ঠে দেখতে চাই।’

ইব্রাহিমের স্ত্রী হুনফা বেগম বলেন, ‘স্বামীরে মারা সঙ্গে সঙ্গে আমার তিনটা সন্তানের ভবিষ্যতকেও মেরে ফেলছে। এতো ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কি করবো। কোন কাজ করতে পারি না। বাবা টাকা দেয় সেই টাকা দিয়ে সংসার চলে। ওদের বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করবো। পড়ালেখা করাবে। কিন্তু সব স্বপ্ন শেষ।’

অপর স্ত্রী মাহমুদা ও হুনফা বেগম দুইজনেই বলেন, ‘যারা আমাদের সংসার শেষ করছে। আমাদের সন্তানদের এতিম করছে। তাদের যেন ফাঁসি হয়।’

ইব্রাহিমের মা নূর জাহান বেগম বলেন,‘আমার ছেলেরে যারা মারছে তাদের জন্য ফাঁসি হয়। আর কিছু চাই না।’

সাত খুনে নিহত নজরুল ইসলামের গাড়ী চালক জাহাঙ্গীরের স্ত্রী সামছুন্নাহার নুপুর বলেন, ‘মাত্র ১০ মাস আগে আমাদের বিয়ে হয়। তার ২ মাস চারদিন পর একমাত্র মেয়ে রোজা জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে নির্মম ভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করে। আমি তাদের ফাঁসি চাই।’

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘ছেলেকে আর ফিরে পাবো না। কিন্তু যারা আমার ছেলে সহ সাতজনকে মেরেছে তাদের যেন ফাঁসি দেখে যেতে পারি। উচ্চ আদালতেও যেন তাদের ফাঁসি বহাল থাকে। এটাই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি।’

নিহত কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, যারা মেরেছে তাদের সঠিক বিচার দাবি করছি। এখন আমার প্রত্যাশা যে রায় হয়েছে সেটিই যেন বহাল থাকে। প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে বলেছেন যারা হত্যার সাথে জড়িত সবারই বিচার হবে। আগে কিছুটা প্রেসার ছিলো এখন সবকিছু সঠিক।

নিহত মনিরুজ্জামান স্বপনের ভাই মিজানুর রহমান রিপন বলেন, আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। আমরা চাই উচ্চ আদালতেও যাতে রায়টি বহাল থাকে এবং রায়টি দ্রুত কার্যকর হয়।

প্রসঙ্গত নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেন, র‌্যাবের তিন কর্মকর্তা লেফটেন‌্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, লেফটেন‌্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেনসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। বাকি ৯ জনকে সাত থেকে ১০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছে। ১৬জানুয়ারী সোমবার সকাল ১০টা ৪মিনিট হতে ১০টা ৯ মিনিট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ওই রায় ঘোষণা করেন। আসামীদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দিয়েছেন আদালত।

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস তো বটেই দেশের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনার একটি। কলংক এটে দেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জবাসীর ললাটে। প্রমাণ সহ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব। ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল অপহরণের সেই ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি রাজধানী লগোয়া শীতলক্ষ্যার তীরের মানুষ। ঘটনার পর র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা সহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে পৌনে তিন বছর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৬ জন

মৃত্যুদণ্ড আসামীরা হলো গ্রেপ্তার থাকা প্রধান আসামী নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এমএম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দ বালা, র‌্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল। পলাতক মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হলো নূর হোসেনের সহযোগি সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান, জামালউদ্দিন, সৈনিক আবদুল আলীম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, আলামিন শরিফ, তাজুল ইসলাম, এনামুল কবীর। এসব আসামীদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

কারাদণ্ড ৯ জনের

অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে করপোরাল রুহুল আমিনের ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানের ৭ বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনের ৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদের ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামানের ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে। পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। একই সময়ে একই স্থানে আরেকটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালককে অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাত জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন; প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মহানগর -এর সর্বশেষ