৮ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ , ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ

নূর হোসেনের ১০ কোটি টাকা লোপাট!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০২:৩২ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৮:৫৩ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ বুধবার


নূর হোসেনের ১০ কোটি টাকা লোপাট!

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামী যাকে ইতোমধ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে তাকে রক্ষা করতে কেউ কেউ ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নূর হোসেনের পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ১১ সেপ্টেম্বর সোমবার এ তথ্য জানান। উচ্চ আদালত থেকে নূর হোসেনকে বাঁচিয়ে দেওয়া হবে ফাঁসি থেকে যাবজ্জীবন কিংবা এর চেয়েও কম সাজা হবে বলে ওই টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ওই টাকা নেওয়ার মিশনে একাধিক আইনজীবী ও প্রভাবশালী সাংবাদিকের নামও এসেছে গুঞ্জনের ডালাপালাতে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের বার কাউন্সিল সহ বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

ওই সূত্রটি জানান, গত ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাত খুন মামলায় নূর হোসেন সহ ২৬জনকে ফাঁসি ও ৯জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান করে। পরে ২২ আগস্ট হাইকোর্ট ২৬ জনের মধ্যে ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ-ে নামিয়ে আনলেও নূর হোসেন সহ র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত কর্মকর্তা আরিফ হোসেন, তারেক সাঈদ ও এম এম রানা সহ ১৫ জনের মৃত্যুদ-ের আদেশ ঠিকই বহাল আছে।

এদিকে নূর হোসেনের পরিবারের একটি সূত্র জানান, নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে আনার পরেই একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্ট নূর হোসেনের সাজা দেওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, নূর হোসেন এ হত্যাকা-ে জড়িত এটা প্রমাণিত হয়নি। সুতরাং উচ্চ আদালত থেকে সাজা কমানো সম্ভব। এসব মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে পরিবারের বিভিন্নজনের কাছ থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু পরে উচ্চ আদালতও আইনের যথার্থ শাসন প্রতিষ্ঠার উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সাজা বহাল রেখে। পরে বিষয়টি নূর হোসেন জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হন। তার পরামর্শেই যারা টাকা নিয়েছেন সেটা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কারণ তাদের ধারণা এখন আপিল করলেও কতটুকু কাজ হবে সেটা নিয়েই শংকিত সংশয় আছে।

প্রসঙ্গত কোনকিছুতেই শেষ রক্ষা হলো না নারায়ণগঞ্জের নরপিচাশ খ্যাত নরঘাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নূর হোসেনের। আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনকে সাত খুনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করে হাই কোর্ট বলেছে, তিন র‌্যাব কর্মকর্তাকে টাকা দিয়ে তিনি ওই হত্যাকা- ঘটিয়েছিলেন।

পরে নূর হোসেন দেশে আসার পর তার পক্ষে আইনী লড়াই চালান নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী খোকন সাহা। খোকন সাহাও নারায়ণগঞ্জ আদালতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন নূর হোসেনকে বাঁচাতে। কিন্তু আইনের কাছে ক্ষমতা পরাস্ত হয়।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সাতজনকে অপহরণের পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যায় ভেসে উঠে লাশগুলো। পরে দেশ ছাড়ে নূর হোসেন। পরে ওই বছরের ১৪ জুন রাতে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের অদূরে কৈখালি এলাকার একটি বাড়ি থেকে নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে বাগুইআটি থানার পুলিশ। পরে ওই বছরের ১৮ আগস্ট নূর হোসেন, ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বারাসাত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় বাগুইআটি থানা পুলিশ। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দমদম কারাগার কর্তৃপক্ষ নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। ১৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নূর হোসেনকে।

মাস্টারমাইন্ড নূর হোসেন
এদিকে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাই কোর্ট বলেছে, “আসামিরা যে ধরনের অপরাধ করেছে, যদি তারা ছাড়া পেয়ে যায়, তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণ আস্থাহীনতায় ভুগবে।”

জজ আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের সঙ্গে আসামি নূর হোসেনের দ্বন্দ্বেরর জেরেই সাত খুনের ঘটনা ঘটে। “এটি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর কিছু সংখ্যক দুস্কৃতকারী ও কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনা। এখানে নূর হোসেন একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও গডফাদার। নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। একজন প্যানেল মেয়র নজরুলকে হত্যা করতে গিয়ে নিরীহ ছয়জন মানুষ এই সকল র‌্যাব ও নূর হোসেন বাহিনীর দ্বারা নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন।”

আর হাই কোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, “নূর হোসেনের সঙ্গে সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক মেজর আরিফ হোসেন ও সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানার অবৈধ অর্থিক লেনদেন হয়েছিল। তবে এই নূর হোসনই হল এ হত্যাকা-েরর মাস্টারমাইন্ড। র‌্যাব রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বিশেষ বাহিনী। তাদের দায়িত্ব হল জনগণের জানমাল রক্ষা করা এবং নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু এ বাহিনীর কিছু সদস্য নৃসংশ হত্যাকা-ে জড়িয়ে পরে অপরাধ ঘটিয়েছে। ফলে তাদের বিচার হয়েছে। কিছু উচ্ছৃঙ্খল র‌্যাব সদস্যের কারণে এ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে না। তাদের সন্ত্রাসবিরোধী গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ধূলিস্যাৎ হতে পারে না। কিন্তু এই বাহিনীর কতিপয় সদস্যের অপরাধবৃত্তি মানব সভ্যতায় আতঙ্কজনক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

তারা এতটাই পাশবিকতা দেখিয়েছে, যা ছিল নিষ্ঠুরতার সর্বোচ্চ প্রকাশ।”

র‌্যাব হেফাজতে সাতজনকে হত্যার বিষয়ে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তাদের মৃত্যু যন্ত্রণা ছিল ‘ভয়বহ, অচিন্তনীয়।র‌্যাব সদস্যরা এতটাই নির্দয় ছিল যে, হত্যার পর তাদের তলপেট ছুরি দিয়ে কেটে বস্তাবন্দি করে তার সঙ্গে ১০টি করে ইট বেঁধে দেওয়া হয়, যেন বস্তাবন্দি লাশ নদীর পানিতে তলিয়ে যায়। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে উদ্ধৃত করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ড ছিল সুপরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক।

তাদের নৃসংশতা প্রমাণ করে, মৃতদেহের উপরও তারা কতটা নির্দয় ছিল। নূর হোসেনের পক্ষে আওয়ামী লীগের অনেকেই এই মামলায় নূর হোসেনের পক্ষে খোকন সাহা, তারেক সাঈদের হয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান (যিনি আগে পাবলিক প্রসিকিউটর ছিলেন) আর আরিফ হোসেনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ ভূঁইয়া। মামলা চলার সময় পাবলিক প্রসিকিউটরের (পিপি) ওপর চাপ সৃষ্টি করতে দেখা গেছে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের।

গত বছরের ৩ মার্চ একটি মামলার বাদী ও নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিকে কড়া সুরে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। ওই সময় নূর হোসেন সহ কয়েকজনকে নিঃশব্দে হাসতে দেখা যায়। সেদিন খোকন সাহাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বিউটি বলেন, ‘একজন আইনজীবী মারা গেছেন। তাকে খুন করা হয়েছে। আর আপনি একজন আইনজীবী হয়ে কিভাবে এ মামলা করছেন? আপনি তো আপনার সহকর্মী আর ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি করছেন। সাত খুনের পর আপনি আমার বাসায় গিয়ে বলেছেন, সহায়তা করবেন। অথচ এখন আসামীদের পক্ষে কাজ করছেন।’

জবাবে খোকন সাহা বলেন, ‘আমি এখন একজন আইনজীবী হিসাবে মামলায় সহায়তা করছি। এখন আমি একজন আইনজীবী।’

সেদিন বিউটিকে অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি দেখেছেন, নূর হোসেন আপনার স্বামী সহ ৭ জনকে অপহরণ করেছেন?’

উত্তরে বিউটি বলেন, ‘আমি যদি দেখতাম, তাহলে কি আর আমার স্বামীকে মারতে পারতো। আপনি একজন আইনজীবী। যদি আজ আপনার বোন এভাবে স্বামীহারা হতো, তাহলে আপনার কেমন লাগতো? সাতটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেলো, অথচ আপনারা আসামিদের সহায়তা করছেন।’

১৬ জানুয়ারি রায় ঘোষণার পর নূর হোসেনের বরাত দিয়ে খোকন সাহা বলেন, নূর হোসেন বলেছেন যে আমি ন্যায়বিচার পাইনি। আমি এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট না। রায়ের বিরুদ্ধে অচিরেই উচ্চ আদালতে আপিল করবো। আশা করি, উচ্চ আদালতে আমরা ন্যায়বিচার পাবো।

ওই সময়ে তিনি আরো বলেন, আমি, অ্যাডভোকেট সুলতানুজ্জামান ও আব্দুর রশিদ পেশাদার আইনজীবী। আইনকে নিজস্ব গতিতে চলার জন্য আমরা এই মামলায় আসামিদের পক্ষে ছিলাম। আমরা স্বাধীনতার পর থেকে অর্ধশতাধিক মামলার শুনানি করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, এই ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলায় শুনানি করার মতো যোগ্যতা সম্পন্ন আইনজীবী নারায়ণগঞ্জে রয়েছে। আসামিরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকলে উচ্চ আদালতে আপিল এবং লিভ টু আপিল করতে পারবেন। আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে ন্যায়বিচার পাবেন বলেও মন্তব্য করেন খোকন সাহা।
নূর হোসেনকে নজরুলের অবস্থান নিশ্চিত করেন খোকন সাহা!

সাত খুনের ঘটনায় নূর হোসেনকে সোর্স হিসাবে ব্যবহার করার তথ্য র‌্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। একটি ভিডিওতে নূর হোসেনকে বলতে দেখা যায়, ‘ঘটনার দিন আমি শহর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি খোকন সাহাকে ফোন করে বলেছিলাম, ‘দাদা কেমন আছেন?’ দাদাও আমি কেমন আছি তা জানতে চান। পরে আমি জিজ্ঞেস করি, ‘দাদা, কোর্টে কি নজরুল এসেছে?’ তখন দাদা বলেন, ‘হ্যাঁ, কোর্টে তো নজরুল এসেছে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Loading...
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ