৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, শুক্রবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭ , ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে শেরে বাংলা


এস. এম শহিদুল্লাহ, সমাজকর্মী ও কলাম লেখক। || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩৫ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার


নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে শেরে বাংলা

‘বাংলার বাঘ’ হিসেবে খ্যাত শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এই লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে পূর্ব বাংলা। যার পথ বেয়ে ১৯৭১ সালে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলা।

শেরে বাংলা ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বর্তমান বৃহত্তর বরিশালের রাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র ছিলেন। তাঁর পিতার নাম কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ আর মাতার নাম সৈয়দুন্নেছা। শেরে বাংলার পিতা বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ষষ্ঠ গ্র্যাজুয়েট ছিলেন। শেরে বাংলা একজন আইনজীবি ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি কূটনৈতিক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম আবুল কাশেম মোঃ ফজলুল হক।

বাংলার রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের কাছে তিনি শেরে বাংলা (বাংলার বাঘ)  এবং হক সাহেব নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলার মাটি ও মানুষের সন্তান খাঁটি বাঙালি। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ও মন্ত্রী, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৪০সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক ‘লাহোর সম্মেলনে’ নারায়ণগঞ্জ থেকে ডেলিগেট হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিলেন নলুয়াপাড়া মহল্লার সাহেদ বেপারী এবং বাবুরাইল মহল্লার সব্বত আলী ও আলমাছ আলী।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আলমাছ আলীর অবদান ছিল অপরিসীম। এক সময় তিনি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে মুকুটহীন রাজা বলে পরিচিত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জর হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নিকট তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে শহর মুসলিম লীগের সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই কমিটিতে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন খান সাহেব ওসমান আলী।

ত্রিশ দশকের প্র্রথম দিক থেকে পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ওসমান আলী ছিলেন নারায়ণগঞ্জ তথা বাংলার রাজনীতিতে এক বিশিষ্ট নেতা। আলমাছ আলী ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট থেকে এম এল এ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৫৬ সালে আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রীসভার চীফ পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিও মনোনীত হয়েছিলেন।

১৯৩৫ থেকে ১৯৪০সালের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় আসেন। একবার তিনি ঢাকায় যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে এলে, তখন নারায়ণগঞ্জের ছাত্রসমাজ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করে আইইটি স্কুলের (ইসলামী এডুকেশন ট্রাস্ট) হোস্টেল নির্মাণের দাবি জানায়। তখন ফজলুল হক ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এর আগেও তিনি নারায়ণগঞ্জে এসে নিতাইগঞ্জের জিমখানা মাঠে এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন।

১৯৩৭-৩৮ সালে ফজলুল হক সাংগঠনিক সফরে এসে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে এক জনসভায় ভাষণ দেন। উক্ত জনসভায় শেরে বাংলাকে স্বাগত জানিয়ে মানপত্র পাঠ করেছিলেন গলাচিপা মহল্লার বিশিষ্ট নেতা আবদুল আউয়াল। সে সময় আবদুল আউয়াল রাজনৈতিক রিপোর্ট ও মানপত্র লিখতে খুবই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা গঠিত হওয়ায় শেরে বাংলা মুসলিম লীগের তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হন। সুতরাং তাঁর ঢাকা যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ মুসলিম লীগ স্টিমার ঘাট ও রেল স্টেশনে তাঁর বিপক্ষে ব্যাপক বিক্ষোভের আয়োজন করে। এটি ১৯৪১-৪২ সালের ঘটনা। সেদিন মুসলিম লীগ কর্মীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে শেরে বাংলাকে নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশনে ঘন্টা তিনেক আটক অবস্থায় থাকতে হয় । সেদিন ‘ফজলুল হক মুর্দাবাদ’, ‘ফজলুল হক ফিরে যাও’, ‘মীর জাফর ফজলুল হক’ ইত্যাদি শ্লোগান আর কালো পতাকায় যে বিরূপ অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে সংগঠিত বিক্ষোভগুলোর অন্যতম ছিল বলে রাজনৈতিক মহল মত প্রকাশ করেছেন। সেই বিক্ষোভের সময় নিজ নেতার এহেন অবস্থা দেখে আবদুল আউয়াল জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। পুলিশ পরে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে হক সাহেবকে ঢাকার পথে ট্রেনে তুলে দিতে সক্ষম হয়। ১৯৪৮ সালের দিকে শেরে বাংলা কলকাতা থেকে ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থির হয়। যাত্রা পথটি ছিল এরকম কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ তারপর স্টিমারে নারায়ণগঞ্জ অত:পর ট্রেনে ঢাকা। স্বাধীনতার পর তাঁর প্রথম পাকিস্তান পদার্পন উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের পক্ষ থেকে স্টিমার ঘাটে সংবর্ধনা জানানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আলমাছ আলীর নেতৃত্বে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থকগণ তাতে বাধা দেওয়ার পরও শেরে বাংলাকে সেদিন স্টিমার ঘাটেই সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল।

১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে অল বেঙ্গল টিচার্স কনফারেন্স অনুষ্ঠান হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সভাপতিত্ব করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুলে এক বিরাট জনসভায় শেরে বাংলা উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তিনি ছিলেন পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী। সেই সভার প্রধান অতিথি হিসেবে মাওলানা ভাসানী শেরে বাংলাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন ‘যদি বাংলার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আপনি একুশ দফা বাস্তবায়ন না করেন, তবে মজলুম জনগণ আপনাকে পদাঘাতে তাড়াবে।’ যদিও মাওলানা সাহেবের বক্তব্য ছিল কঠোর। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, জনসাধারণ সে বছর যুক্তফ্রন্টকে বহু আশা -আকাঙ্খা নিয়ে নির্বাচিত করেছিল। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল এ কে ফজলুল হক ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্ত্বর এলাকায় `তিন নেতার মাজার` হিসেবে খ্যাত স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন এই মহান নেতার নামে মাসদাইরের একটি রাস্তার নাম ‘শেরে বাংলা রোড’ নামকরণের মধ্যে দিয়ে তাঁকে নারায়ণগঞ্জের স্মৃতিতে ধরে রেখেছেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ