৭ শ্রাবণ ১৪২৫, রবিবার ২২ জুলাই ২০১৮ , ৮:১৭ অপরাহ্ণ

‘সুবাদার মানসিং এবং নারায়ণগঞ্জের স্মৃতি’


এস. এম শহিদুল্লাহ, সমাজকর্মী ও কলাম লেখক। || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৩৫ পিএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ০৩:৩৫ পিএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭ বুধবার


‘সুবাদার মানসিং এবং নারায়ণগঞ্জের স্মৃতি’

আজ ২১ ডিসেম্বর বঙ্গদেশের সুবাদার মানসিং-এর জন্মদিন। ১৫৫০ সালের ২১ ডিসেম্বর রবিবার তিনি জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রাজা ভগবন্ত দাস আর মাতা ছিলেন রানী সা ভগবতী জি সাহিবা। তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের বিশ্বস্ত সেনাপতি ও নবরত্ন সভার একজন সদস্য।

সম্রাট আকবর ১৫৯৪ সালের ১৫ মার্চ রাজপুত রাজা মানসিংকে বঙ্গদেশের সুবাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিন মেয়াদে মানসিং বঙ্গদেশের সুবাদারের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি পূর্বাঞ্চলে সামরিক অপারেশন পরিচালনা করার জন্য ঢাকায় তাঁর সদর দপ্তর স্হাপন করেন। যা ছিল ঢাকা রাজধানী হওয়ার প্রথম মাইল ফলক পদক্ষেপ।

আফগান সরদার এবং ঈসা খানের নেতৃত্বে বার ভূঁইয়াদের বশ্যতা স্বীকার করানো ছিল বঙ্গদেশে মানসিংয়ের মূল দায়িত্ব।
১৫৯৫ সালের ৭ নভেম্বর মানসিং বঙ্গদেশের রাজধানী রাজমহল থেকে ঈসা খানের কাছ থেকে ভাটি অঞ্চল দখলে অগ্রসর হন। প্রতিরোধ করা অসম্ভব বলে মনে হওয়ায় ঈসা খান পিছু হটেন। খিজিরপুরকে (নারায়ণগঞ্জের খানপুর) তিনি তার রাজধানী করেন। মোগলদের মোকাবিলা করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ত্রিবেগ, হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দায় দুর্গ নির্মাণ করতে থাকেন। একইসঙ্গে তিনি এগার সিন্ধুর ও একঢালার পুরানো দুর্গ সংস্কার করেন। এসব দুর্গ তৈরি ও মেরামত করে তিনি দিল্লীর মোগল সম্রাটকে রাজস্ব প্রদান বন্ধ করে দেন। সিংহ জেলা এবং পাবনা, বগুড়া ও রংপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে ঈসা খাঁর স্বাধীন রাজ্য ছিল। খিজিরপুর দুর্গ ছিল তাঁর শক্তির প্রধান কেন্দ্র। তাঁর কয়েকটি রাজধানীর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও ও ময়মনসিংহের জঙ্গলবাড়ি ছিল উল্লেখযোগ্য।

বিদ্রোহ করায় ঈসা খানের বিরুদ্ধে  সম্রাট আকবর সৈন্য পাঠান। ১৫৮৫ সালে মোগল সেনাপতি শাহবাজ খান রাজধানী খিজিরপুরে তাঁকে পরাজিত করেন। শাহবাজ খান তাকে সাগর পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যান। ঈসা খান এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে পালিয়ে বেড়াতে থাকেন। নিশ্চিত হয়ে শাহবাজ খান আনন্দ-ফুর্তিতে মজে যান। এসময় ঈসা খান আকস্মিকভাবে তার উপর হামলা চালিয়ে নিজের রাজধানী পূনর্দখল করেন। খিজিরপুর ল-ভ- হয়ে যাওয়ায় তিনি সোনারগাঁয়ে রাজধানী স্হানান্তর করেন। ১৫৮৬ সালে রালফ ফীচ নামক একজন ইউরোপীয় ভ্রমণকারী এখানে এসে বলেছেন-`সোনারগাঁওয়ে তখন মূল্যবান মসলিন কাপড় তৈরি হতো। তাঁর মতে ঈসা খান মসনদ-ই-আলার রাজধানী ছিল এই সোনারগাঁয়ে।`

ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে মোগল বাহিনী ও ঈসা খানের মধ্যে চূড়ান্ত বুঝাপড়া হয়। বিশাল মোগল বাহিনীর সঙ্গে ক্ষুদ্র একটি বাহিনী নিয়ে লড়াই করে বিজয়ী হওয়া অসম্ভব মনে করে ঈসা খান মোগল সেনাপতি মানসিং-এর সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে ফল নির্ধারণের প্রস্তাব দেন। মানসিং তার প্রস্তাব মেনে নেন। শুরু হয় উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব যুদ্ধ। কেউ কাউকে হারাতে পারছিলেন না। রণাঙ্গনের দু`পাশে হাজার হাজার সৈন্য দাঁড়িয়ে দুই বীরের লড়াইয়ের দৃশ্য উপভোগ করছিল। ১৫৯৭ সালের আগস্টের তৃতীয় দিনের যুদ্ধে মানসিংয়ের তরবারি ভেঙ্গে যায়। মানসিংকে নিরস্ত্র দেখে ঈসাখান লড়াই বন্ধ করে দেন। ঈসা খানের মহানুভবতা মানসিংয়ের হৃদয়কে স্পর্শ করে। তিনি তার সঙ্গে সন্ধি করেন। তাকে মোগল দরবারে মসনদ-ই-আলা খেতাবে ভূষিত করা হয় এবং তার কাছে ২২টি পরগনার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে ডাক বাংলোর কাছে ঈসাখান ও মানসিংয়ের যুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত জায়গায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

১৬০১ সালের প্রথমদিকে দ্বিতীয়বার সুবাদার হিসেবে বঙ্গদেশে ফিরে আসেন। সিংহাসনে  আরোহন করে সম্রাট জাহাঙ্গীর মানসিংকে তৃতীয়বার সুবাদার হিসেবে বঙ্গদেশে পাঠান এবং ১৬০৬ সালে তাঁকে প্রত্যাহার করে বিহারে স্হানান্তর করেন।
মানসিং ১৬১৪ সালের ৬ জুলাই ভারতের দাক্ষিণাত্যের ইলিচপুরে স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ