জেলখানা আমায় ডাকছে, আমি গুপ্তচর, আমি ভীত-উদ্বিগ্ন

৩ ভাদ্র ১৪২৫, রবিবার ১৯ আগস্ট ২০১৮ , ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

জেলখানা আমায় ডাকছে, আমি গুপ্তচর, আমি ভীত-উদ্বিগ্ন


কামাল উদ্দিন সুমন, আপ্যায়ন সম্পাদক, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:১৪ পিএম, ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০৪:১৪ পিএম, ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ বুধবার


জেলখানা আমায় ডাকছে, আমি গুপ্তচর, আমি ভীত-উদ্বিগ্ন

দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। বলতে পারেন বোনাস লাইফ নিয়ে বেঁচে আছি। ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দ্বারা অপহৃত হয়ে প্রাণে বেঁচে এসেছি। আমাকে যখন ওরা (সন্ত্রাসীরা) চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে যায় তখন মনে হচ্ছিল হয়তো আজই শেষ দিন। কিন্তু ওরা আমাকে মেরে ফেলেনি। মনের ভেতরে এক অদম্য সাহস সে দিন আমাকে একটুও দমাতে পারেনি। ওরা ঠিকই আমাকে ছেড়ে দিয়েছে। কারণ তারা জানতো ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকতাকে দমানো যাবেনা। কিন্তু আজ আমি সত্যিই ভীত, আতংকিত, উদ্বিগ্ন। রাষ্ট্র আমাকে দমিয়ে রাখতে ১৪ বছর জেল হওয়ার ভয় দেখিয়ে আমাকে আতংকে রাখতে চায়। কারণ আমি সাংবাদিক। জেলখানা আমাকে এখন ডাকছে। আমাদের বলা হচ্ছে সুস্থ, সঠিক সাংবাদিকতা করবা গুপ্তচরবৃ‌ত্তির দায়ে জেল খাটবা।

সরকার নুতন আইন করেছে `ডি‌জিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮। মন্ত্রীসভা অনুমোদান ও দিয়েছে। যে কোন দিন হয়তো সংসদে তোলা হলে টেবিল ছাপড়িয়ে সাংসদরা এ আইন পাসের পক্ষে রায় দিবেন। ইতোমধ্যে শ্রদ্ধেয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ তো বলেই দিয়েছেন, ‘আপনারা (সাংবাদিকরা) গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুন্ন হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই এগুলো ঠেকাতেই এ আইন করা হয়েছে।’

তাই কি আর করা-গুণর্কীতন ছাড়া। চোখের সামনে দুর্নীতির প্রমাণ থাকলেও তা ধারণ করা যাবে না।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ৩২ ধারায় বলা হয়েছে: যদি কোনও ব্যক্তি বে-আইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনও সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার কোনও ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত, কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক্স মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহা হলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।

সদ্য বিলুপ্ত তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের জন্য সরাসরি হুমকি না হলেও ধারাটির অপব্যবহারের কারণে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ৫৭ ধারাকে ব্যবহার করেছিল সংবাদকর্মী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ওপরে, কয়েকজনকে কারাবরণ পর্যন্ত করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে কালো আইনটির বিরুদ্ধে জনমত দানা বেঁধে উঠতে থাকায় এই ধারা বিলুপ্ত করতে দাঁড় করানো হয় ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। তবে ৫৭ ধারার ভুক্তভোগী ও সরকারি পর্যায়ের অনিয়ম দুর্নীতি জনগণের নজরে আনা সাংবাদিকদের মতে নতুন আইনের ৩২ ধারা গুপ্তচরবৃত্তি রোধে করা হলেও ৫৭ ধারার মতো এই ধারাটি সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে বাধার দেয়াল হবে বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা।

আইনটি নিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। কারণ নতুন ডিজিটাল আইনের অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ বেশি। যে কেউ চাইলেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ করতে পারেন। স্বভাবতই সাংবাদিকরা প্রধান টার্গেট হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে দুদক নিজেরা তদন্ত শুরু করে সত্যতা পায়। এমন কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। সাংবাদিকতায় নতুন সংকট তৈরি হবে। সরকার যখন নবম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করে সাংবাদিকদের কাছে বাহবা কুড়ালো ঠিক তখনই নতুন করে বিতর্ক শুরু হলো এই ধারার জন্য। নতুন আইনে গুপ্তচরবৃত্তির রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও আর্থিক ক্ষতি দমনে ৩২ ধারা যুক্ত করার সরকারি ভাবনা আপাতত মহৎ মনে হলেও ৫৭ ধারার মতো এই ধারাটিও সরাসরি সাংবাদিকদের টার্গেট করবে।

আমরা সাংবাদিকরা মনে করি সারা পৃথিবীতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, দেশে তথ্য অধিকার আইন আছে। এই অবস্থায় উচিত ছিলো সাংবাদিক ও দুর্নীতির ভুক্তভোগী জনগণকে সামাজিক মাধ্যমে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিবাজদের মুখোশ উন্মোচনের পথ সুগম করা। অথচ ৩২ ধারা দিয়ে হচ্ছে তার উল্টো। সাধারণ মানুষ কোন অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি দেখলে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ করতে পারতো, পুলিশ থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যদি ঘুষ নিতো সেটা রেকর্ড করতে পারতো, ছবি তুলতে পারতো। এখন ৩২ ধারা দিয়ে সেটা রুখে দেয়া যাবে।

‘৩২ ধারায় বেআইনি প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। কেউ যদি আগে থেকেই বলে দেয় আমি ওমুক দিন যেয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরবো। তাহলে কোন দিনও অনিয়ম-দুর্নীতির খবর প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। সাংবাদিকরা সামাজিক মাধ্যমে ‘আমি গুপ্তচর’ প্ল্যাকার্ড হাতে ৩২ ধারার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। আমার কাছে মনে হয় এই কালো ধারা দিয়ে দেশকে ৪০-৫০ বছর নয় বরং পিছিয়ে আদিযুগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই আইন সংসদে পাস হলে আমি মনে করি কারাগার আমায় ডাকছে। আমি ও কারাবন্দি হতে পারি যেকোনো সময়। অন্যের অপরাধ খুঁজবো, লিখবো। আমার লেখার কারণে কোনো একজনের মুখোশ উন্মোচন হয়ে যাবে। কিন্তু কারাগারে যাবো না! তাতো হতে পারে না। এখন সাংবাদিকতা মানে তো গুপ্তচরবৃত্তি! তাই সাংবাদিকতা করতে হলে কারাবন্দি হতেই হবে।

অবশ্য আরেকটা রাস্তা খোলা আছে অনিয়ম বা দুর্নীতি না খুঁজে বাহবা দেয়া। শুধু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ভালো গুণ প্রকাশ করা। এতে সারা বিশ্ব জানবে আমরা অনেক সভ্য, ভদ্র, দুর্নীতিমুক্ত। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে! পত্রিকায় পাতায় কোনো এমপি বা কর্মকর্তার উৎকোচের সংবাদ আসবে না। ছবি ছাপা হবে না। টিভিতে কোনো অনুসন্ধানী থাকবে না। আর যদি এরকম দুর্নীতির চিত্র ধারণ করে সংবাদ প্রকাশ করার সাহস দেখান তো কি আর করা আইনানুগ ব্যবস্থা। ১৪ বছরের জেল হতেই পারে। এছাড়া বেড়ে যাবে তোষামদি নিউজ। অনুমান নির্ভর সাংবাদিকতা আর অপসাংবাদিকতা।

আসুন কালো আইন বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ করি। যদি পেশাদারা সাংবাদিকতা করে সমাজ ও দেশের উপকার করতে চান। কোন কালো আইনই আমাদেরকে দমাতে পারবে না।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ