৯ ফাল্গুন ১৪২৪, বুধবার ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ , ৯:০৩ অপরাহ্ণ

primer_vocational_sm

একজন চুনকা ভাইয়ের খোঁজে...


ইমামুল হাসান স্বপন || বার্তা সম্পাদক - দৈনিক খবরের পাতা।

প্রকাশিত : ০৮:৫৭ পিএম, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০৯:০২ পিএম, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শুক্রবার


একজন চুনকা ভাইয়ের খোঁজে...

সকলেই চিনেন তাঁকে। নাম তাঁর আলী আহমেদ চুনকা। যাঁরা তাঁকে দেখেছেন তাদের রয়েছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। আর যারা তাকে দেখেননি কিন্তু কর্মময় জীবন সম্পর্কে শুনেছেন সেই নতুন প্রজন্ম চুনকা ভাইকে সম্মানের সাথে স্মরণ করেন।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আরেকজন আলী আহমেদ চুনকার জন্ম হয়নি। তাঁর জীবনী পাঠ করে কিংবা হেঁটে যাওয়া পথে চলে এই প্রজন্মের কেউ যদি উঠে আসতে পারেন তবে নারায়ণগঞ্জের মানুষ শতাব্দীর মধ্যে আরেকজন চুনকার দেখা পাবেন। নয়তো শতাব্দীর পর আবার অপেক্ষায় থাকতে হবে। আমাদের অনুরোধ থাকলো চুনকা ফাউন্ডেশনের প্রতি ‘‘আমাদের চুনকা ভাই” বইটি যেনো আরো বেশী বেশী ছাপিয়ে নতুন প্রজন্মকে পড়তে সুযোগ করে দেয়া হয়। তাতে এই জনপদের হয়তো বা কেউ না কেউ বের হয়ে আসতে পারেন অথবা চুনকা ভাইয়ের অনেক গুনের অনুসরণ বাড়তে পারে। যা হবে সকলের জন্য কল্যাণকর।

বর্তমান প্রজন্ম যদি আরো বিশদ জানতে চায় কিভাবে তিনি চুনকা ভাই হয়ে উঠেছিলেন আর কিভাবে মাটি ও মানুষের লোক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় তাহলে নতুন প্রজন্মকে আমাদের চুনকা ভাই গ্রন্থটি পড়তে হবে। কিশোর চুনকা কিভাবে নারায়ণগঞ্জের সকলের কাছের মানুষ হলেন তার বিবরণ পাওয়া যাবে এই বইতে। আমাদের বিশ্বাস বইটি পাঠ করলে সকলেই বলবেন ‘ধন্য ধন্য বলি তারে (লালন সাই রচিত বিখ্যাত গান)’।

কারণ হচ্ছে মানুষের জন্য কাজ করে প্রয়াত আলী আহমেদ চুনকা জীবনের অর্থকে পূর্ণ করে গেছেন। ড. করুণাময় গোস্বামীর কলমে বের হয়ে এসেছে চুনকা ভাইয়ের জীবন সফল নয় সার্থক ছিল। লিখেছেন তিনি, শিক্ষায় সফল করে স্বার্থক করে না। কিন্তু মানব জীবনের পরম বস্তুটি হচ্ছে স্বার্থক হওয়া। স্বার্থক মানুষ দেখতে পাই খুব কম। নিতান্তই কম। আলী আহম্মদ চুনকা একজন স্বার্থক মানুষ ছিলেন।

প্রবাদ প্রতীম সাংবাদিক এবিএম মুসা কিশোর চুনকা কিভাবে আলী আহমেদ চুনকা নামে জননেতা হলেন তার ধারণা দেয়া চেষ্টা করেছেন। তিনি লিখেছেন, আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে যে চুনকা ভাই দলের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন সে বিষয়টা বুঝতে ভুল করেননি বঙ্গবন্ধু। আওয়ামীলীগের খারাপ সময়ে ঠিকই চুনকা দলের জন্য কাজ করে জাতির জনকের বিশ্বাসের মূল্য দিয়েছে। এবিএম মুসা ১৪ বছর বয়সের চুনকাকে খুঁজে পান খান সাহেব ওসমান আলীর সাথে। ১৯৪৮সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী যখন কলকাতা থেকে নারায়ণগঞ্জ আসেন নদী পথে।

আমাদের চুনকা ভাই আরো কিছু বিবরণ
কাবাডি খেলোয়াড় আলী আহাম্মদ চুনকা মানুষের বিপদে আপদে ছুটে গিয়ে কখন যে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন তা তিনি জানতেই পারেননি। আর জানতে চানওনি। এ জন্যই সহজ সরলভাবে চলাফেরা করতেন। সকলের সাথে মিশতেন। তার সহকর্মী প্রয়াত জেলা আওয়ামীলীগ যুগ্ম আহবায়ক মফিজুল ইসলামের ভাষায়, জীবনে জীবন যোগ না হলে কৃত্রিম পণ্যেও পসরায় ব্যর্থ হয় জীবনের উদ্দেশ্য। আর ফুলজুড়িময় শব্দচয়ন হুবহু মিলে যায় নারায়ণগঞ্জের কিংবদন্তি পুরুষ আলী আহমেদ চুনকার মন ও মননে।

তিনি আরো বলেছেন, আইয়ুব খানের আমলে পিডিএম গঠন করা হয়। তখন নারায়ণগঞ্জের অনেকে আওয়ামীলীগ ছেড়ে আইয়ুবখানের দলে যোগ দেন। (এসকল নেতাদের নাম প্রকাশ না করার জন্য অনুলিখককে অনুরোধ জানান মফিজুল ইসলাম)। কিন্তু চুনকা ভাই বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে যাননি।

আরো বলেন, ৬৬ সালের ছয় দফা আর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে দলের জন্য ব্যাপক তৎপরতা চালান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিয়োগান্ত ঘটনা জাতিকে কলুষিত করে। স্বপরিবারে শাহাদৎ বরণ করেন জাতির পিতা। আমরা অনেকে গ্রেফতার হই। চুনকা ভাইকে নজরবন্দি করা হয়। পরের বছর ১৯৭৬ সালে বঙ্গবন্ধুর নামে কেউ মিলাদ পড়ানোর সাহস পায়নি প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু চুনকা ভাই প্রকাশ্যে নানান কর্মসূচি পালন করেন। ১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারি হয়, অনেকে আত্মগোপন করেন। এবারো চুনকা ভাই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট বজায় রেখে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আগলে রাখেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে চুনকা ভাই সম্পর্কে সত্য কথা বলতে পেরে হালকা বোধ করছি।

কবি ওয়াহিদ রেজা বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ হয়েছেন বাংলা সাহিত্যের প্রধান পুরুষ। তেমনি নারায়ণগঞ্জবাসীর দ্ব্যার্থহীন নেতা হতে আলী আহাম্মদ চুনকাকে বিদ্যায় একাডেমিক্যাল পন্ডিত হওয়া লাগেনি। তার মৌলিক প্রতিভার বিকাশই তাঁকে অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বিকশিত করেছে। .....আমি জীবনে একজন নেতাই দেখেছি যাঁকে রিকশাওয়ালা, মুচি, ফেরিওয়ালা, হকার, মেথর যেই চুনকা ভাই বলে ডাক দিয়েছে; তার ডাকেই তিনি কেবল হাত তুলেই ভালোবাসা বা দায়িত্ব প্রকাশ করেনি; থেমে, দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে কুশল বিনিময় করেছেন, এমনকি মুচির কাঠের বাক্সের ওপর অথবা মেথরের টুলে বসে পড়ে কথা বলেছেন।

তারাপদ আচার্য্য বলেছেন, ১৯৬৪ সালে উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। এ সম্পর্কে  তিনি বিবরণ দেন, সামপ্রদায়িক শক্তির দানবীয় তান্ডব ঠেকাতে চুনকা ভাই সেদিন সিংহপরাক্রমে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সর্বত্র। বহু হিন্দু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করেছিলেন। চুনকা ভাইয়ের নিরলস চেষ্টায় সেদিন বহু হিন্দু পরিবারের জানমাল আর ইজ্জত রক্ষা পেয়েছিল। আমি একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে চুনকা ভাইয়ের এই মানবিক অবদান আজীবন মনে রাখব।

আব্দুর রাশেদ রাশু বলেছেন, ছাত্র ছাত্রীদের সৎ পথে চলার উপদেশ দিতেন। মুক্তিযুদ্ধে যুবকদের অংশ গ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা ২৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ কোর্টের মালখানা (অস্ত্রাগার) লুট করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি চুনকা ভাইয়ের নেতৃত্বে।

বর্তমান এমপি সেলিম ওসমান তার লেখায় চুনকা চাচাকে যেমন দেখেছি শিরোনামে একাংশে বলেন, আমার বাবা একটু রাশভারী প্রকৃতির লোক ছিলেন, তাই নেতাকর্মীদের সাথে কথাও একটু কম বলতেন। অল্প কথায় সব কিছু বুঝিয়ে দিতেন। আর চুনকা চাচা ছিলেন প্রাণ খোলা প্রকৃতির লোক। শহরের বিভিন্ন চা স্টলে নেতাকর্মীদের সাথে খোশগল্প করতে দেখেছি। কর্মীদের সুখে-দুঃখে আপনজনের মত ছুটে যেতে দেখেছি। ১৯৭৫ সালের পর অনেক কষ্টে চলছিল আমাদের সংসার। তখন চুনকা চাচা নিজে এবং লোক মারফত আমাদের পরিবারের খোঁজ খবর নিয়েছেন এবং সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এমনকি ব্যাংকের দেনার দায়ে যখন আমাদের বাড়ি হীরা মহল নিলাম ওঠে তখন শফি হোসেন খান (শফি চাচা) ও চুনকা চাচা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের অগ্রণী ভূমিকা আমাদের বাড়ি নিলাম হওয়া থেকে রক্ষা পায়।

আলী আহমেদ চুনকার ৩২ তম ওরশ মোবারক কর্মসুচিতে তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান আহম্মদ আলী রেজা উজ্জল বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, আমরা ভাই বোনেরা আব্বার কাছ থেকে খুব বেশী সময় পাই নি। তাকে তেমন কাছে পাইনি। তিনি সব সময় ব্যস্ত থাকতেন মানুষ নিয়ে। আমাদের বাড়িতে ছোট বেলা থেকেই দেখেছি মানুষের ভিড়। আমরাও চাই আব্বার মতো মানুষের গোলামী করে যেতে।

দেখা যাচ্ছে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় না দিতে পারলেও তার প্রবল ব্যক্তিত্ব সন্তানদের আকর্ষন করেছে। মনে ভাষাটাও বুঝতে পেরেছে সন্তানরা। এটা সম্ভব হয়েছে পারিবারিক সংস্কৃতির কারণে। প্রয়াত স্কাউট লিডার গফুর চৌধুরী তার লেখায় আলী আহমেদ চুনকার পারিবারিক বিষয় সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করেন। ছোটবেলায় তাদের বাড়িতে গেলে চুনকা ভাইয়ের মায়ের ব্যবহারের বিষয়টা তুলে ধরেন গফুর চৌধুরী। আরো বলেছেন চুনকা একজন কাজ পাগল লোক ছিলেন। তবে সেটা ভালো কাজে হতে হবে।

আমাদের চুনকা ভাই বইতে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমাদের রাজনীতির বাতিঘর ও অনুপ্রেরণা শিরোনামে। ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক সহ আরো অনেকে লিখেছেন চুনকা ভাই সম্পর্কে। অন্যদিকে শাহেদ আলী মজনু তিন পাতার বর্ণনায় অনেক কিছু তুলে ধরেছেন। জালাল উদ্দিন রুমীর আলোচনাও প্রাণবন্ত। তৈমূর আলম খন্দকার, আব্দুর রহমান, অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, মোহাম্মদ ইসহাক, বুলবুল চৌধুরী, হালিম আজাদ, রফিউর রাব্বি, জাফর আহমদ, হাবিবুর রহমান বাদল- এভাবে কার লেখা বাদ দেয়া যায়। সবাই যার যার মতো করে চুনকা ভাইকে যে ভাবে দেখেছেন তার চুম্বুক অংশ বলতে চেষ্টা করেছেন। যার মধ্যে থেকে প্রতিবেদনে সামান্য উদ্ধৃতি তুলে ধরে একটা ধারনা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলো।

সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ও চলচ্চিত্র পরিচালক তমিজউদ্দিন রিজভীর ভাষায় আলী আহমেদ চুনকা ছিলেন ক্ষণজন্মা এক মানুষ। অধ্যাপক বুলবুল চৌধুরী তার লেখায় কবি নজরুলের কবিতার একটি চরন তুলে আনেন। আলী আহম্মদ চুনকার মূল্যায়নে। ‘‘তারে স্বর্গেও আছে প্রয়োজন যারে ভালোবেসে মাটি।’’

১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে জীবনের শেষ নির্বাচনী জনসভা করেন ডায়মন্ড চত্বরে। বক্তব্য দিতে দাড়িয়ে এক অভূতপূর্ব আচরণ করেন। বলেন, আমি যদি কখনো কোন ভুল করে থাকি তাহলে আপনারা আমাকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দেবেন। এই কথা বলে দুইহাত দুই দিকে প্রসারিত করে দেহটা সামনের নুইয়ে দেন। যারা সে দিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন কেউ নিশ্চয় দৃশ্যটি ভুলে যাননি। অনেকে এখনো সে বিবরণ দেন স্তৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করা দৃশ্যের।

চুনকা ভাই জীবনের অর্থ বুঝতে মানুষের কাজ করতে সারি সারি প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে গেছেন। মানব সেবার মাঝেই মহান আল্লাহকে খুজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। লালন ফকির রচনা করেছেন ‘‘ওপর নীচে সারি সারি সাড়ে নয় দরজা তারি লালন কয় যেতে পারি কোন দরজা খুলে ঘরে। ধন্য ধন্য বলি তারে।’’

এখন আলী আহমেদ চুনকা যে কোন দরজায় পেরোয়াদেগারের কাছে কবুল হয়েছেন এবং চলে গেছেন তার পরম করুণাময়ই ভালো জানেন। কারণ চুনকাভাই সব দরজাতেই নাড়তে সক্ষম হন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ