৪ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯:৪৭ অপরাহ্ণ

অসাধারণ রাজনীতিক আলী আহাম্মদ চুনকা


বাহরাম খান || সাংবাদিক

প্রকাশিত : ০৯:৫১ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ শনিবার


অসাধারণ রাজনীতিক আলী আহাম্মদ চুনকা

সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের একজন প্রশ্ন করলেন, আপনি কি আওয়ামী লীগের একজন নেতা? আলী আহাম্মদ চুনকা মাথা নেড়ে বললেন, না, আমি আওয়ামী লীগের নেতা নই। লোকে যে বলে আপনি আওয়ামী লীগের নেতা ...

চুনকা হেসে দিয়ে বললেন, ‘তারা বাড়িয়ে বলে। আমি বঙ্গবন্ধুর একজন সাধারণ কর্মী।’ নিজেকে সাধারণ বলে পরিচয় দিলেও তিনি ছিলেন অসাধারণ একজন মানুষ এবং নেতা। আজ এই মানুষটির মৃত্যুদিনে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই।

পরপর দুই বার নারায়ণগঞ্জের মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়ে পৌরসভা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সবার কাছে ‘চুনকা ভাই’ নামেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। আলী আহাম্মদ চুনকার সুযোগ্য সন্তান ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী উপমন্ত্রীর মর্যাদায় নারায়ণঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। চুনকা ১৯৩৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ইহকাল ত্যাগ করেন ১৯৮৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আলী আহাম্মদ চুনকা নারায়ণগঞ্জে সক্রিয় ভূমিকা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমন সৌভাগ্য খুব কম রাজনৈতিক নেতারই হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ঢাকায় গ্রেফতার ও হয়রানির কারণে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে নারায়ণঞ্জের আন্দোলন সারাদেশের নজর কেড়েছিল। কারণ এখানে অন্যান্যের সঙ্গে ছিলেন চুনকা’র মতো সাংগনিঠক তরুণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিণত যুবক চুনকা’র নেতৃত্বেই নারায়ণগঞ্জের অস্ত্রাগার লুট হয়েছিল। তার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় শত শত তরুণ-যুবক।

‘আলী আহাম্মদ চুনকা ফাউ-েশন’-এর উদ্যোগে ৬৪ জনের লেখা নিয়ে তাকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ হয় ২০১২ সালে। এই বইয়ের কল্যাণেই চুনকার ব্যক্তি জীবনের বর্ণাঢ্য দিক আমরা জানতে পারি। ওই প্রজন্মে আমাদের যাদের জন্ম হয়নি তারা শুধু জাতীয় নেতাদের কথা বিভিন্ন বই-পত্রে জানি। কিন্তু জাতীয় নেতারা তৃণমূলের যাদের উপর ভর করে নেতৃত্ব দিতেন তাদের কথা কমই জানা যায়। চুনকাকে নিয়ে শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বহু কেন্দ্রীয় নেতার লেখা আছে এতে। এর বাইরে সাংবাদিক, চিকিৎসক, ক্রীড়া সংগঠক, লেখক, বুদ্দিজীবিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ চুনকার ছবি একেছেন। যে কোনো প্রকৃত রাজনীতিকের জন্য তা ঈর্ষার বিষয় হবে।

আলী আহাম্মদ চুনকার বন্ধু ও চিকিৎসক হেদায়েত ইসলাম লিখনিতে ১৯৬৭ সালের এক ঘটনা জানা যায়। ৪২ হাজার টাকার একটি কাজ সেরে বাড়িতে এসেছেন। একদিন চুনকা তাকে খবর দিয়ে একশ টাকা দিয়ে ঈদের আগে সন্তানদের কিছু কিনে দিতে বলেন। টাকাটা নিতে ইতস্তত করায় চুনকা তাকে বললেন, একশ টাকা দেখে হয়তো নিতে চাস না। এরপরই নিজের সব টাকা কিভাবে সবাইকে বিলিয়ে দিয়েছেন তার তালিকা হেদায়েতকে দেখান। বন্ধু হেদায়েত আরও লিখেছেন, চুনকা স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখেও মানুষকে সাহায্য করেছে। চুনকা মানবপ্রেমের বিরল দৃষ্টান্ত।

প্রখ্যাত ও প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা চুনকার মতো নেতাকে খুব কাছে থেকে দেখেছেন। তার লেখনিতে নারায়ণগঞ্জের স্বাধীনতা পরবর্তী স্থানীয় রাজনীতির দৃশ্যটা ভাল বোঝা যায়। যা এই সময়েও প্রাসঙ্গিক। আলী আহাম্মদ চুনকা সম্পর্কে মূসা লিখেছেন,  চুনকার প্রতি বঙ্গবন্ধুর স্নেহদৃষ্টি পড়ল। দুরদর্শী নেতা জানতেন, এই তরুণটিই দুঃসময়ে সেখানে দলকে ও দলীয় কর্মীদের ধরে রাখবেন। ... নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী নেতৃত্বের একমাত্র দাবিদারদের প্রতাপের মাঝেও বঙ্গবন্ধু তাঁকে (চুনকাকে) কাছে টেনে নিলেন। তাই ১৯৭৪ সালে তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে অন্যান দাবিদারদের এক পাশে সরিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের পৌরসভার চেয়াম্যান নির্বাচিত হৈেলন এইভাবে নারায়ণগঞ্জে বংশ মর্যদাধারী অসাধারণদের মাঝে সাধারণ চুনকার অভ্যূদয় হয়েছিল।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান চুনকা’র ছোটবেলা থেকেই খেলা-ধুলার প্রতি ঝোক ছিল। সঙ্গী-সাথীদের সংগঠন করে ঘোরফেরা করতে ভালবাসতেন। এলাকার কারও সমস্যা হলে সবাইকে নিয়ে সহযোগিতার চেষ্টা করতেন। এভাবেই জনসেবায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ’৬৬ সালের ছয় দফায় সক্রিয় ছিলেন। এরপর ’৬৯-এর গণ আন্দোলন এবং ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে   অংশ নেন। এভাবেই রাজনীতিতে প্রবেশ। ভোটের রাজনীতিতে অংশ নেন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে জেতার মাধ্যমে। ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক বিদায়ের পর আওয়ামী লীগের নাম মুখে নেওয়াতেও অনেক ভয় পেতেন। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধুর খাটি কর্মী ’৭৭ সালে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সময়ের অসাধারণ নেতা হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম লিখেছেন, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আলী আহাম্মদ চুনকা সারা দেশেই চুনকা ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এর মূল কারণটি ছিল তিনি গণমানুষের খুব কাছাকাছি ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা-উত্তর নারায়ণগঞ্জে প্রথম নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তিনি তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের মূল ভিত্তি করে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে, সামরিক শাসন আমলে বিশেষ কওে মুক্তিযুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার মতো ত্যাগী ও আদর্শিক নেতৃত্ব আমাদের রাজনীতির বাতিঘর ও অনুপ্রেরণা।

এত জনপ্রিয় নেতা মরা পর জানাযায় মানুষ কেমন ছিল। কী দৃশ্য ছিল নারায়ণগঞ্জের? সেদিনে ভাল একটি বিবরণ পাওয়া যায় আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরর লিখনিতে। কাদের লিখেছেন, নারায়ণগঞ্জ শহরে পা দিতেই মনে হয়েছিল, এ যেন এক বিষাদ সমুদ্র। অগুনিত মানুষের বন্যা ছুটে চলেছে রাস্তায়। রাস্তার দুপাশে, ঘরের ছাদে, বারান্দায় কত মানুষ। মহিলা-শিশু, বৃদ্ধ-যুবক সবার চোখে জল। রিকশাওয়াল, ঠেলাওয়ালা, কুলি-মজুর শ্রেণীর কত মানুষকে দেখলাম ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে ভেঙ্গে পরছে রাস্তায়। ... আলী আহাম্মদ চুনকা ‘জনপ্রিয়’ বলে জানতাম। কিন্তু তিনি যে এতটা জনপ্রিয়, এ সত্যি আগে ভাবিনি।

১৯৩৪ সালে নারায়ণঞ্জের দেওভোগ গ্রামে জন্মান আলী আহাম্মদ চুনকা । তার বাবার নাম ওয়াহেদ আলী, মা গুলেনুর বেগম। তার জন্ম ও মৃত্যু দিনের সঙ্গে বাংলাদশের দুইটি বিখ্যাত ইতিহাস জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ জন্মের ৩৭ বছর আগে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন, সেই তারিখটি ছিল ১৬ ডিসেম্বর এই দিনে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের মানচিত্র আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে যে আন্দোলন সূতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে সেটি ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালে ১৮ বছরের তরুণ ঢাকার উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জের রাজপথ কাপিঁয়েছেন রাষ্ট্রভাষার দাবিতে। তিনি মারা গেছেন এই ভাষার মাসেই। মাত্র ৫০ বছর বয়সে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ১৯৮৪ সালে ২৫ ফেব্রুয়ারি।

সেলিনা হায়াৎ আইভীর মেয়র কার্যালয়ের রুমে তার বাবার ছবিটি পাশে নিয়ে কাজ করেন। বিভিন্ন সময়ে তার সেই রুমে গিয়েছি, কথা বলেছি। বাবার প্রসঙ্গ তুললেই তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে আমার কোনো অর্জন নেই। সব আমার বাবার কীর্তি। পরপার থেকে তিনিই সব দেখছেন, আমাকে পথ দেখাচ্ছেন। তবে, একটা দিক দিয়ে বাপ-মেয়ে দুই জনেরই মিল আছে। আলী আহাম্মদ চুনকা যেমন নারায়ণগঞ্জের গন্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতিতে না আসলেও প্রায় সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তার মেয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভী পরপর তিনবার মেয়র হয়েছেন। এখনো স্থানীয় রাজনীতিতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। কিন্তু দেশ্যব্যাপী সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ইতিবাচক ভাবমূর্তির ছায়া ফেলতে পেরেছেন। চুনকার রেখে যাওয়া এই ছায়া আরও দীর্ঘ হোক।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ