তাজুলের আত্মত্যাগ রাজনীতিতে এক উজ্জল দৃষ্টান্ত

আবু হাসান টিপুু || লেখক: পলিট ব্যুরোর সদস্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ০৯:২৭ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার



তাজুলের আত্মত্যাগ রাজনীতিতে এক উজ্জল দৃষ্টান্ত

শ্রমিকদের মধ্যে অধিকারবোধ জাগিয়ে তুলে শ্রমিকদের দিন বদলের চেতনায় সংগঠিত করার অঙ্গিকার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর একজন, শিক্ষাগত যোগ্যতা গোপন করে আদমজী জুট মিলে কাজ নিলো বদলী শ্রমিক হিসেবে। সারাদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অপরাপর শ্রমিকদের সাথে কাধেকাধ মিলিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের কাজ, শ্রমিক কলোনীর জীর্ণ কুঠিরেই তার বসবাস। না, এটা কোন আরব্য উপন্যাসের চরিত্র নয়। এই ঐতিহাসিক কিংবদন্তিতুল্য মানুষটি হলেন স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মানবমুক্তির সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম ।

১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এবং শ্রমিক-কর্মচারীদের ৫ দফা দাবিতে ১৫ দল, ৭ দল ও ১১টি শ্রমিক ফেডারেশনের ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের লেলিয়ে দেয়া গুন্ডাবাহিনীর হাতে তাজুল শহীদ হন। তাজুল ছিলেন আদমজী মজদুর ট্রেড ইউনিয়নের নেতা। আজ ১ মার্চ কমরেড তাজুল ইসলামের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী।

কুমিল্লা জেলার মতলব থানার ইছাখালি গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের ছেলে তাজুল শৈশবে মাতৃহারা হয়ে আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলার জন্য ঢাকা শহরে আইসক্রিম বিক্রি এমন কি গৃহকর্মির কাজ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কোন প্রতিকূলতাই তাজুলের শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ কমাতে পারেনি। মামার সহযোগীতায় তিনি শিক্ষা গ্রহণ চালিয়ে যান। তিনি পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কুমিল্লায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ১৯৬৬ সালে মতলব হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ৩টি লেটারসহ প্রথম বিভাগ এবং এইচএসসি পরীক্ষায়ও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৮ সালে তাজুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে বিএ অনার্সে ভর্তি হন।

১৯৭১ সালে তাজুল মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ¯œাতকোত্তর পর্যায়ের অধ্যায়ন শেষে তাজুল সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তির লক্ষ্য নিয়ে ৭৪ সালে শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হন এবং শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেশের বৃহত্তর আদমজী জুট মিল বেছে নেন। এক পর্যায়ে বেসিক ইউনিয়নের কমিটিতে ২৫ শতাংশ বহিরাগত ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের থাকার আইন বাতিল হলে তাজুল আন্দোলন সংগ্রাম ও সংগঠনের সার্থেই আদমজীতে সাধারণ বদলী শ্রমিকের কাজ গ্রহণ করেন। ফলে ব্যাক্তি জীবনে সীমাহীন দারিদ্রতা নিত্য সঙ্গি হয়ে উঠে তাজুলের। স্ত্রী, দুসন্তন নিয়ে একদিকে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট, রাজনীতিতে প্রতিকূল পরিস্থিতি, ভয়ভীতি; অপরদিকে সচ্ছল জীবনের সুযোগ ও হাতছানি তাজুলকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

কমরেড তাজুল চয়েছিলেন নিজেকে `শ্রেণীচ্যুত` করে শ্রমিকের সঙ্গে পরিপূর্ণরূপে মিশে গিয়ে বিপ্লবের জন্য তাদের সচেতন ও সংগঠিত করতে। তিনি একজন আদর্শ কমিউনিস্টের ভূমিকা পালন করেছেন, যা আজকের দিনে সত্যিই বিরল। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন লড়াকু সৈনিক, যিনি আদমজীর শ্রমিকদের এরশাদ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেছিলেন এবং সংগ্রামের ময়দানে নামিয়েছিলেন। এই সংগ্রামে তিনি ছিলেন সামনের কাতারের বীর যোদ্ধা। সে জন্য সেদিনের সামরিক শাসনের ভাড়াটিয়া দালালরা তাঁকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল।

২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ১১টি শ্রমিক সংগঠন (পরবর্তীকালে স্কপ), ১৫ দল ও ৭ দল আহূত ১ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল সফল করার লক্ষ্যে আদমজী মিলের শ্রমিকদের নিয়ে মিছিল করার সময় সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী তাজুলের ওপর হামলা চালায়। কমরেড তাজুলের শাহাদাৎ বরণ করেন।

রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন ও সমাজ জীবনে সন্ত্রাস, কালো টাকা ও সুবিধাবাদের যে বিষায়ন প্রক্রিয়া চলছে তার বিপরীতে শহীদ কমরেড তাজুলের সততা, আদর্শনিষ্ঠ, দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কমরেড তাজুল লাল সালাম।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও