২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, শুক্রবার ১৬ নভেম্বর ২০১৮ , ১২:২১ অপরাহ্ণ

rabbhaban

বন্দর গণহত্যা ও একটি সিরাজদ্দৌলা ক্লাব


রফিউর রাব্বি || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:২৩ পিএম, ৩ এপ্রিল ২০১৮ মঙ্গলবার


বন্দর গণহত্যা ও একটি সিরাজদ্দৌলা ক্লাব

শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিমে নারায়ণগঞ্জ শহর, পূর্ব পাড়ে বন্দর। একসময় বন্দর পাটের কল, জাহাজ নির্মাণের ডকইয়ার্ড ও খাদ্য গুদামের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। বৃটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে ইংরেজ ও আর্মেনিয়দের মাঝেমধ্যে বিচরণ করতে দেখা গেলেও অবাঙালি বিহারিদের পদচারণা কখনোই ছিল না। কিন্তু সাতচল্লিশে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে রেডক্রসের উদ্যোগে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালি বিহারিদের রিফিউজি ক্যাম্প স্থাপিত হয়। পরে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পেতে এমন দাঁড়ায় যে কিছু কিছু পাড়া-মহল্লা ও এলাকা তারা দখলে নিয়ে নেয়। একাত্তরের ৪ এপ্রিল ভোরে বিহারিদের সহায়তায় পাকবাহিনী নবীগঞ্জঘাট ও কেরাসিনঘাট দিয়ে একসঙ্গে বন্দরে প্রবেশ করে। নবীগঞ্জ দিয়ে পাড় হওয়া গ্রুপটি ইস্পাহানী ও জেলেপাড়ার বহু বাড়ি-ঘর গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং এ এলাকা থেকে বহু লোককে ধরে বন্দর সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে আসে। ক্লাব মাঠে আসতে আরো বহু বাড়িঘর তারা জ্বালিয়ে দেয়। কেরাসিন ঘাট দিয়ে পাড় হওয়া গ্রুপটি ডকইয়ার্ডে উঠে সামনে অগ্রসর হয়ে হিন্দু অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকাই জ্বালিয়ে দেয়। লালজির আখড়া ও বৃন্দাবন আখড়া গানপাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে বহু লোককে ধরে সিরাজদ্দৌলা ক্লাব মাঠে নিয়ে আসে। উভয় গ্রুপই সকাল ন’টার মধ্যে ক্লাব মাঠে এসে পৌঁছে। সেসময় মাঠের ক্লাব ঘরে আশ্রয় নেয়া সাধারণ মানুষ ও ধরে আনা বন্দিদের মোট ৫৮ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে প্রথমে গুলি করে হত্যা করে। পরে আশপাশের বাড়িঘর থেকে কাপড়-চোপড় ও মূলিবাঁশের বেড়া এনে লাশের উপরে ফেলে গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বিকেলে হানাদার বাহিনী শীতলক্ষ্যা পাড় হয়ে শহরে চলে আসে। বন্দর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। বাড়ি-ঘর ফেলে অধিকাংশ মানুষ দিগবিদিক পালিয়ে যেতে থাকে। লাশের স্তূপ থেকে জীবিতাবস্থায় বেরিয়ে আসে মুজিবুর রহমান কচি। পোড়া বাড়ি-ঘর ও মৃত মানুষের গন্ধে বন্দরের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। রাতে ক্লাব মাঠের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এলাকাবাসী ৫৪ জন হিন্দু-মুসলমান শহীদদের একসাথে কবর দেয়।

’৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি আইয়ূব খানের পতন হলে সেই একুশে ফেব্রুয়ারির দিন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের সদস্যরা বন্দরে বিভিন্ন বাড়িঘর ও দোকানপাটে কালো পতাকা উড়িয়ে ছিল। বন্দরে বসবাসরত বিহারিদের নেতা আইয়ূব মাষ্টারের আইয়ূব রেস্টুরেন্টেও ক্লাব সদস্যরা কালো পতাকা উত্তোলন করে। কিছুক্ষণ পর আইয়ূব মাষ্টার কালো পতাকা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলে ক্লাব সদস্যদের নেতৃত্বে বিক্ষুব্ধ জনতা আইয়ূব রেস্টুরেন্ট ও কনভেনশন মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আলীর বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আইয়ূব মাষ্টার ও মোহাম্মদ আলীর বাড়ি বন্দরে কনসালট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে গড়ে ওঠে।) ’৭১-এ অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে মার্চের ১৭-১৮ তারিখ সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের নেতৃত্বে প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়। এ প্রতিরোধ কমিটি বিহারিদের কাছ থেকে প্রায় চল্লিশটি রাইফেল-বন্দুক ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একটি অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলে। ২৫ তারিখ যখন ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইট চলে বন্দরে তখন সিরাজদ্দৌলা ক্লাবের মাঠে মঞ্চস্থ হয় সাত্তার ভূইয়া রচিত ও এস এম ফারুক পরিচালিত ‘অমর বাঙালি’ নাটক। এসব কারণে একাত্তরে বিহারিদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল সিরাজদ্দৌলা ক্লাব।

১৭৫৭ সালে সিরাজদ্দৌলাকে হত্যা করা হলেও বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে যিশুর মতো তাঁর পুনরুত্থান ঘটেছে। বন্দরে পুনরুত্থান ঘটেছে ’৬৯ ও ’৭১-এ। হয়তো আবারো পুনরুত্থান ঘটবে এদেশের কোথাও। আর তখন দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত হবে- ‘পূর্ণ স্বাধীনতা মিললো কই? কই মিললো ক্ষুধা থেকে মুক্তি, দারিদ্র থেকে মুক্তি মুক্তি রূঢ় শোষণ থেকে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

মন্তব্য প্রতিবেদন -এর সর্বশেষ