অর্থ আর ভয়ের কাছে হেরে যাবেন না তো অনাথ মাহির বাদি!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:১৮ পিএম, ২৩ জুলাই ২০১৮ সোমবার



অর্থ আর ভয়ের কাছে হেরে যাবেন না তো অনাথ মাহির বাদি!

অভাবের তাড়নায় অনেকটা নিরুপায় হয়ে মানুষ গৃহকর্মের পেশায় আসেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, গৃহকর্মীরা মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে কাজ করেন। এর ফলে অনেক সময় দেখা যায়, তাঁরা নিয়মিত বেতন পান না বা যা বলা হয়েছে তার চেয়ে কম বেতন দেওয়া হচ্ছে। অনেক গৃহকর্মীর কাজ শুরু হয় ভোরে। চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এর মধ্যে কোনো বিরতি নেই। এ ছাড়া তাঁরা সাপ্তাহিক কোনো ছুটি পান না। অনেক বাসায় গৃহকর্মীদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হয় না। কখনো কখনো বাসি খাবার খেতে দেওয়া হয়। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতন তো রয়েছেই। যৌন নির্যাতনেরও অভিযোগ পাওয়া যায়। কাজ করতে এসে খুনও হচ্ছেন গৃহকর্মীরা।

গত ২০ জুলাই শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলা ফতুল্লায় শিশু গৃহকর্মীর উপর নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ৮ বছরের গৃহপরিচারিকা মাহি আক্তারকে অমানবিক নির্যাতনের এ ঘটনায় আটক হয়েছেন গৃহকর্তা আতাউল্লাহ খোকন ও তার স্ত্রী উর্মি আক্তার। অনাথ এ শিশুটির পক্ষ নিয়ে মামলার বাদি হয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রতিবেশী জাকির।

মামলার বাদী জাকির হোসেন অভিযোগ করেন, ফতুল্লার পূর্ব ইসদাইর আনন্দনগর এলাকার শহীদুল্লাহর বাড়ির ভাড়াটিয়া আতাউল্লাহ খোকন ও উর্মি আক্তারের বাসায় ৩ মাস ধরে পিতৃ মাতৃহীন শিশু মাহিকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজে নেয়। এরপর থেকে শিশুটি বাসায় প্রায় সময় কান্নাকাটি করত। শুক্রবার রাতে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে ওই দম্পতির বাসায় গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে থানায় খবর দেওয়া হয। পরে পুলিশ গিয়ে শিশুটির হাতে ও মুখে বর্বর নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পায়। তখন শিশুটিকে জিজ্ঞাস করলে সে জানায়, তাকে অহেতুক খুন্তি গরম করে হাতে ও শরীরে ছ্যাকা দিতো। কথায় কথায় মারধর করতো। ২০ থেকে ২৫দিন আগে তার হাতে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাকা দেয়ায় তার ডান হাতের চামড়া উঠে যায়। শুক্রবারও সেই ক্ষত হাতে ছ্যাকা দেয়া হয়।

এমন ঘটনা অহরহ ঘটে চলছে আমাদের আশপাশে। কাজের ছেলেমেয়েদের ওপর নির্যাতনের সব কাহিনীই যে পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় এমন নয়। একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেলে তবেই না ঘটনা অনেক দূর গড়ায়। হাসপাতাল ও পুলিশের খাতায় নাম ওঠে। পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়। নির্যাতন যখন মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন এই হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হয়।

কাজের ছেলেমেয়েদের প্রতি করুণার বশবর্তী হয়ে আমরা গৃহকর্মে নিয়োজিত করি এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। এরা সারা দিন আমাদের ফায়-ফরমায়েশ খাটে। একটুও অবসর নেই। এরা শ্রম দেয়। শ্রমের বিনিময়ে চায় একটুখানি আশ্রয়, দুবেলা দুমুঠো অন্ন। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এদের যেমন প্রয়োজন আছে আশ্রয়ের, অন্ন-বস্ত্রের, তেমনি আমাদেরও প্রয়োজন আছে তাদের শ্রমের, সেবার।

খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, গৃহকর্মে নিয়োজিত ছেলেমেয়েদের কেউ পিতৃছাড়া, কেউ মাতৃহারা, আবার কেউবা স্বামী পরিত্যক্তা। এদের মধ্যে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যাই বেশি। যে বয়সে বাবা-মার আদর সোহাগে বেড়ে ওঠার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে দল বেঁধে স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলার মাঠে হৈ হুল্লোড় করে কাটানোর কথা, সে বয়সেই এরা নিতান্তই প্রাণে বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ খুঁজে নেয় পরের বাড়িতে। এদের চাওয়া-পাওয়া খুবই সামান্য। এরা চায় একটুখানি স্নেহ, ভালোবাসা। ওই বয়সের দাবি এটা। অথচ এই দাবি উপেক্ষা করে অতি তুচ্ছ কারণে পরের সন্তানের গায়ে হাত তোলা হয় কোন অধিকারে? ছোটখাটো ভুল-চুক যে এরা কখনই করে না এমন কথা কেউ বলেন না। কিন্তু এ ধরনের ভুল-চুকের শাস্তি তো আর নির্যাতন হতে পারে না যা কিনা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কাজের ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে প্রায়শই টাকা পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ আনা হয়। এসব ব্যাপারে একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেই তো হয়। কিন্তু তা না করে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অসহায় শিশু-কিশোরদের ওপর শারীরিক নির্যাতনের পথ বেছে নেওয়া কি সংগত আচরণের পর্যায়ে পড়ে? কারও বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় গ্রহণ করা যেতে পারে। সুষ্ঠু তদন্তের পর দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত তাকে যথাযথ শাস্তি দেবে- এটাই তো নিয়ম। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে গরিবের সন্তানের প্রতি কারণে-অকারণে যে আচরণ করা হয় তা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ন্যায়-অন্যায়ের বিবেচনাবোধও আমাদের মাঝে আর কাজ করছে না।

জানা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলা হয় না। কারণ দরিদ্র পরিবার মামলা করলেও চালাতে পারে না। এ ছাড়া নির্যাতনকারী পরিবারের ভয়ভীতি তো আছেই। অন্যদিকে কোনওভাবে নির্যাতনের  মামলা হলেও পরে মীমাংসা হয়ে যায়। এই মীমাংসার নেপথ্যে থাকে নগদ অর্থ।

তবে শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নির্যাতনের স্বীকার হওয়া ৮ বছরের গৃহপরিচারিকা মাহি আক্তার যে অমানবিক নির্যাতনের স্বাক্ষ বহন করছে তা আমাদের বিবেককে নাড়া দিলেই হবে না হতে হবে এর বিচার। কিন্তু সেটাও এখন নির্ভর করছে মামলার বাদির উপর। অনাথ মাহির পক্ষে বাদি প্রতিবেশী জাকির কী পারবেন শেষ পর্যন্ত লড়ে যেতে? নাকি নগদ টাকা আর ভয়ের কাছে মাথা নত করবেন? তবে শেষ অবধি মেহেনতি মানুষের জয় হউক সেই প্রত্যাশা থাকবে আমাদের।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও