ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হলে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে হবে

কামাল উদ্দিন সুমন || আপ্যায়ন সম্পাদক ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, সিনিয়র সহ সভাপতি ফতুল্লা প্রেসক্লাব। ১১:৪৩ পিএম, ২ অক্টোবর ২০১৮ মঙ্গলবার



ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হলে সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে হবে

৩০ সেপ্টেম্বর তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত সভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগ আতংকের কথা তথ্যমন্ত্রী মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আইসিটি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে জানিয়েছিলাম। ওই সভায় আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। আমি এই আইনের সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ভংঙ্কর ৪৩ ও ৩২ ধারা নিয়ে কথা বলি।

তথ্যমন্ত্রী আইসিটি মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা আমাদের বুঝাতে চেয়েছে এ আইনে পেশাদার সাংবাদিকদের কোন সমস্যা হবে না। তারা সুরক্ষিত থাকবে। আমি আমার বক্তব্যে বলেছি ‘মাননীয় মন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা ছেড়ে দিতে হবে আমাদের মতো পেশাদার সাংবাদিকদের। যারা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেঁচে নিয়ে জীবন ধারন করে চলছে।’

আমি আরো বলেছি ৫৭ ধারা বাস্তবায়নের আগে আপনারাই বলেছিলেন সাংবাদিকদের কোন সমস্য হবে না। অথচ এই ধারা সবচেয়ে বেশী সাংবাদিকদের উপর অপপ্রয়োগ হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সবচেয়ে বেশী উদ্বেগ উৎকন্ঠায় আছে সাংবাদিকরা। কারন আইনের কয়েকটি ধারা এমন ভাবে তৈরী হয়েছে তাতে গনমাধ্যম বেশী ক্ষতির শিকার হবে। সবমহল থেকে  এনিয়ে সমালোচনা ও এসেছে।

আমি এ আইনের কয়েকটি ধারার প্রয়োগ নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখেছি তা সাংবাদিকদের জন্য সত্যিই অশুভ সংকেত। আগে সাংবাদিকরা বিভিন্ন  মহলেরর হুমকি হামলা মামলার শিকার এমনকি খুনের শিকার হয়েছে। এখনে আইনের ধারা শায়েস্তা করা হবে  সাংবাদিকদের।

ধারা: ৮ : কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা: (১) মহাপরিচালকের নিজ অধিক্ষেত্রভুক্ত কোনো বিষয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোন তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করিলে তিনি উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত ব্লক করিবার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে, অতপর বিটিআরসি বলিয়া উল্লিখিত অনুরোধ করিতে পারিবেন।

(২) যদি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর নিকট প্রতীয়মান হয় যে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোন তথ্য-উপাত্ত দেশের বা উহার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃংখলা ক্ষুন্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে তাহা হইলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার জন্য মহাপরিচালকের মাধ্যমে বিটিআরসিকে অনুরোধ করিতে পারিবেন।

(৩) উপধারা (১) ও (২) এর অধীন কোনো অনুরোধ প্রাপ্ত হইলে বিটিআরসি, উক্ত বিষয়াদি সরকারকে অবহিতক্রমে তাৎক্ষনিকভাবে উক্ত তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ক্ষেত্রমত ব্লক করিবে।

(৪) এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়াদি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে।

প্রয়োগে ক্ষতি

১) এই ধারা সংবিধানে প্রদত্ত মতপ্রকাশে স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধা। এখানে কোন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রাখা হয়নি।

২) কোন সত্য তথ্য প্রকাশ করলেও তা প্রকাশকারীকে না জানিয়েই ব্লক করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যা সংবিধান ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।

৩) এই ধারাকে ব্যবহার করে জনস্বার্থে প্রকাশিত ও প্রচারিত যে কোন সংবাদ ( সরকার বা সরকারি কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে গেলে) ব্লক করার সুযোগ রয়েছে।

৪) কোন সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ব্লক করার সুপারিশের ক্ষমতাও আইন শৃংখলা বাহিনীকে দেয়া হচ্ছে।

এতে করে স্বাধীন সাংবাদিকতা হুমকির মুখে পড়বে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অনেক সংবাদ ব্লক হয়ে যাওয়ার আশংকাও রয়েছে।

সমাধানের পথ

প্রথম সমাধান: এই আইনের ধারা: ৮ সংবিধানের পরিপন্থী হওয়ায় বিলুপ্ত করা হোক।

দ্বিতীয় সমাধান: এই ধারা বিলুপ্ত করা না হলে আরেকটি উপধারা সংযুক্ত করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

উপধারাটি হলো-

ধারা: ৮ এর উপধারা:( ৫) : জনস্বার্থে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোন সত্য তথ্য বা সংবাদ আদালতের আদেশ ব্যতীত ব্লক করা যাইবে না এবং ব্লক করার অনুরোধও করা যাইবে না।

ধারা: ৩২: সরকারি গোপনীয়তা ভঙ্গের অপরাধ ও দন্ড- (১) যদি কোনো ব্যক্তি ‘অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট ১৯২৩’ এর আওতাভূক্ত কোনো অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদন্ডে বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুন:পুন সংগঠন করেন, তাহা হইলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদন্ডে, বা অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।

প্রয়োগে ক্ষতি

এই ধারা সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। এ ছাড়াও তথ্য অধিকার আইনেরও পরিপন্থী। সরকারি অফিসের বিভিন্ন তথ্য জনগনকে জানানোই সাংবাদিকদের কাজ। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে নিউজ প্রকাশিত হলেও এই আইনের ধারায় অপরাধ বলে গণ্য হবে। কোন বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের আগাম তথ্য নিয়ে নিউজ করা হলে তা এই ধারার  অধীনে অপরাধ বলে গণ্য হবে। আর জনস্বার্থে নিউজ করে সাংবাদিককে ১৪ বছরের জেল খাটতে হবে।

সমাধানের পথ

প্রথম সমাধান: এই আইনের ধারা: ৩২ বিলুপ্ত করা হোক।

দ্বিতীয় সমাধান: এই ধারা বিলুপ্ত করা না হলে আরেকটি উপধারা সংযুক্ত করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

উপধারাটি হলো-

ধারা: ৩২ এর উপধারা:( ৩) : এই আইনে যাহা কিছ্ইু থাকুক না কেন জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোন সংবাদকর্মী বা সংবাদ সূত্রের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে উপধারা-(১) ও উপধারা (২) প্রযোজ্য হইবে না।

ধারা: ৪৩: পরোয়ানা ব্যতিরেকে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার- (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, কোনো স্থানে এই আইনের অধীনে কোন অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরির্বতন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্পাপ্র হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি, অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া নিন্মবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন-

(ক) উক্তস্থানে প্রবেশ করিয়া তল্লাশি এবং প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হইলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ

(খ) উক্ত স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিষ্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনো দলিল জব্দকরণ

(গ) উক্তস্থানে উপস্থিত যে কোনো ব্যক্তির দেহ তল্লাশি

(ঘ) উক্তস্থানে উপস্থিত কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোন অপরাধ করিয়াছেন বা করিতেছেন বলিয়া সন্দেহ হইলে উক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার।

প্রয়োগে ক্ষতি

এই ধারাটি সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের। সাব ইন্সপেক্টর লেবেলের একজন পুলিশ কর্মকর্তার মনে হইলেই যে কোন পত্রিকা অফিসে প্রবেশ করে যে কোন কম্পিউটার ও সার্ভার জব্দ করতে পারবে। ফলে পত্রিকা প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হবে। এমন কী তাকে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী আইনে মামলা দায়েরসহ ব্যবস্থা নিতে পারবে পুলিশ।

সমাধানের পথ

প্রথম সমাধান: এই আইনের ধারা: ৪৩ বিলুপ্ত করা হোক।

দ্বিতীয় সমাধান: এই ধারা বিলুপ্ত করা না হলে আরেকটি উপধারা সংযুক্ত করে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। উপধারাটি হলো- ধারা: ৪৩ এর উপধারা: (১) এর (ঙ) : জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কোন কম্পিউটার, কম্পিউটার সিষ্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি আদালতের আদেশ ব্যতীত জব্দ বা তল্লাসী করা যাইবে না এবং সংবাদকর্মী বা সংবাদ সূত্রকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেফতার করা যাইবে না।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও