বৃহস্পতিবার বিশ্ব ভালবাসা দিবস

জাহাঙ্গীর ডালিম || ০৮:৪৪ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার

বৃহস্পতিবার বিশ্ব ভালবাসা দিবস

বৃহস্পতিবার বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। প্রতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত হয় বিশ্ব ভালবাসা দিবস ভ্যালেন্টাইন ডে। আমাদের দেশে ১৯৯৩ সালে এ দিবসটি প্রবর্তন করেন বিশিষ্ট লেখক ও সম্পাদক শফিক রেহমান।

বিশ্ব ভালাবাসা দিবসের নেপথ্যে রয়েছে ভিন্ন মত এবং চমকপ্রদ কাহিনী। সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমে তৃতীয় শতাব্দীর সময় ধর্ম যাজক হিসেবে কাজ করছিলেন। সেই সময় সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তরুন্যদের বিয়েকে আইন বহির্ভূত বলে ঘোষনা করলেন। তিনি মনে করতেন অবিবাহিত পুরুষরা, যাদের স্ত্রী এবং সংসার আছে তাদের চেয়ে, অধিকতর উন্নত যোদ্ধা হতে পারে। ভ্যালেন্টাইন এই আইন জাতিকে অনৈতিক বলে বিবেচনা করেন। তিনি ক্লডিয়াসের সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করেন এবং তরুন প্রেমিকদের বিয়ে সম্পন্ন করার কাজটি গোপনে চালিয়ে যেতে থাকেন। ভ্যালেন্টাইনের কার্যকলাপ প্রকাশ পেলে ক্লাডিয়াস তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেন।

আরেভ তথ্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, রোমান বন্দিশালায় নির্যাতিত খ্রিষ্টানদের মুক্তি পাওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। অন্য একটি লোক বাহিনীর মতে, ভ্যালেন্টাইন নিজেই মূলত নিজেকে “ভ্যালেন্টাইন” শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। কারাগারে বন্দি থাকায় সময় ভ্যালেন্টাইন এক তরুনীর প্রেমে পড়ে বলে ধারনা করা হয়- তরুনীটি ছিল কারাধ্যক্ষের মেয়ে। সে কারান্তরেই ভ্যালেন্টাইনের সাথে দেখা করত। মৃত্যুর আগে তিনি তরুণীটির কাছে চিঠি লেখেন, যার শেষে স্বাক্ষর ছিল ‘ফ্রম ইউর ভ্যালেন্টাইন’- এটি এমন এক অভিব্যক্তি যা এখনও ব্যবহৃত হয়।

কিংবদন্তির আড়ালে ভ্যালেন্টাইন অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে তবে তার কাহিনী বা উপকথা নিশ্চিতভাবেই তাকে প্রকাশ করে সহানুভূতি সম্পন্ন, বিরোচিত এবং সর্বোপরি রোমান্টিক ব্যক্তি হিসেবে। এটা সত্য যে, মধ্য যুগে ভালেন্টাইন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে সর্বাদিক জনপ্রিয় সেইন্টদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন ভ্যালেন্টাইন ডে উদ্যাপিত হয় ফেব্রুয়ারিরর মাঝামাঝি সময়ে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুবার্ষিকীর স্মরণে সম্ভবত যেটা সংগঠিত হয়েছিল ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে।

প্রাচীন রোমে বসন্তকালের শুরু ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। পবিত্রতার সময় হিসেবে এটি কে বিবেচনা করা হতো বাড়ি ঘর আনুষ্ঠানিকভাবে ধোয়া মোছা করা হতো, এরপর লবন ও এক জাতীয় মিহি ময়দা ভেতরে ছিটিয়ে দেয়া হতো।

১৫ ফেব্রুয়ারি উর্বরতায় উৎসব ছিল, যা উৎসর্গ করা হতো রোমান শস্য দেবতা ফনাম এবং রোমান জাতির প্রতিষ্ঠাতা রমোলাস ও রোমান্সকে। ৪৯৮ খ্রিঃ দিকে পোপ গেলসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষনা দেন। মানব মানবীর জুটিবদ্ধ হবার রোমান ‘লটারি’ সিষ্টেমকে অখ্রিষ্টীয় এবং আইন বহির্ভূত গন্য করা হলো।

পরে মধ্যযুগের ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে বিশ্বাস জন্মে যে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখিদের প্রেম বন্ধনের ঋতু। আর সেখান থেকেই চালু হলো ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ‘ভ্যালেন্টাইনস্ ডে’ বা রোমান্সের দিবস হিসেবে পালনের রীতি। বহু বছর আগে থেকে চেনা ভ্যালেন্টাইন অস্তিত্বমান হয়ে উঠল চালর্স (ডিউক অব অরলিনস) এর লেখা কবিতায়। কবিতাটি তার স্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল, ব্যাটল অব আজিনকোর্ট এ বন্দি হয় যখন তিনি টাওয়ার অব লন্ডনে। এই উপহারটি লিখিত হয়েছিল ১৪১৫ সালে। এখন সেটা ব্রিটিশ লাইব্রেরি অবলন্ডনের পান্ডুলিপি সংগ্রহশাখায় রক্ষিত আছে।

কথিত আছে, কয়েক বছর পর রাজা পঞ্চম হেনরি নিযুক্ত করেন জন লিজেট নামক একজন লেখককে ভ্যালেন্টাইন নোট কম্পোজ করার জন্য। সম্পদশ শতাব্দীর দিকে গ্রেট ব্রিটেনে ভ্যালেন্টাইনস্ ডেপালন করা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঠি সময়ে সকল শ্রেণীর বন্ধুবান্ধব এবং প্রেমিক প্রেমিকাদের মধ্যে মমতার ছোট স্মৃতি চিহ্ন কিংবা হাতে লিখিত স্মারকলিপি বিনিময় সাধারণ প্রথায় দাঁড়িয়ে যায়। এই শতাব্দীর শেষের দিকে মুদ্রন প্রযুক্তির উন্নয়নের কারনে হস্তলিখিত পত্রের জায়গা, মুদ্রিত কার্ডের আদান প্রদান শুরু হয়।

এক পর্যায়ে ভালবাসার বাণী সহ ছাপানো কার্ড প্রদান আবেগ প্রকাশের জন্য সহজ পন্থারূপে দেখা দেয়। ডাক বিভাগ অল্প খরচের মাধ্যমে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে’র অভিনন্দন প্রকাশে জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখে। হাতে তৈরি ভ্যালেন্টাইনস্ উপহার প্রদান আমেরিকানদের মধ্যে শুরু হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতে।

১৮৪০ সালে ইষ্টার এ হল্যান্ড ভ্যালেন্টাইনস্ উপহার বিক্রয় শুরু করেন আমেরিকাতে। গ্রিটিংস কার্ড এসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, প্রতি বছল এক বিলিয়নের বেশি কার্ড পাঠানো হয় ভালাবাসা দিবসে। ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন ক্রিসমাসের বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড বিনিময়ে উৎসবে পরিনত হয়েছে।

আনুষ্ঠানিকভাবে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে উদযাপিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্যে, ফ্রান্স এবং অষ্ট্রেলিয়ায়, ফিনল্যান্ড, শ্লোভেনিয়া, রুমানিয়া, নরওয়ে, ভারতবর্ষে প্রেমের দিবস হিসেবে ভ্যালেন্টাইনস্ ডে পালিত হয়। ভালবাসা, বন্ধুত্ব এবং সমাজ একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে মানুষের স্বর্গ যার ভিন্ন নাম সভ্যতা। তাই মানুষের সমাজে ভালবাসা অমিয় সম বিবেচিত হয়। সভ্যতার আদিকাল থেকেই ব্যক্তি মানুষ এবং সামাজিক মানুষের মধ্যে ভালবাসা বহমান। প্রেম ভালবাসায় এই প্রবাহ মানুষকে ব্যক্তির গন্ডি ছাপিয়ে সামাজিক করে তুলেছে, নিয়ে গেছে দৈশিক ও কালিক স্তরে। অর্থাৎ ভালবাসার আত্মজ মানব সভ্যতা এক অখন্ডরূপে বিরাজিত। এই অখন্ড রূপ প্রধানত ভালবাসায় সুতোয় গাঁথা। যেখানেই প্রেমে খরা, ভালবাসায় কৃপণতা সেখানেই বাসা বাঁধে হিংসা, দ্বেষ, যুদ্ধ, রক্তপাত।

আজকের পৃথিবী সম্ভবত ভালবাসার অমিয় ধারা থেকে দূরে সরে গেছে। তাই দেশে দেশে অঞ্চলে অঞ্চলে সংঘাত। হানাহানি আমাদের দেশ এবং সমাজ ও এই প্রেমহীনতার যুগ পার করছে বলেই মনে হয়। তাই সমাজে রাষ্ট্রে স্বার্থপরতা, সংঘাত ও হিংসা দাপটে বিরাজ করছে। আজ ভালোবাসা দিবস। সারা দুনিয়া রোমাঞ্চিত হবে প্রেমের আবেশে। শাশ্বত ভালবাসায়। আমাদের বিশ্বাস আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রকরা ভালবাসায় অমিয়ধারায় সিক্ত হবেন। হিংসায় বদলে ভালোবাসার রাখি ডোরে বাধবেন সমগ্র জাতিকে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও