শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশে ইউনিয়ন ভিত্তিক খেলার মাঠ প্রয়োজন

রনজিৎ মোদক || শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ০৯:২৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার

শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশে ইউনিয়ন ভিত্তিক খেলার মাঠ প্রয়োজন

“যারা হাসতে জানে তারা ভালবাসতেও জানে। শিশু-কিশোর হাসলে দেশও হাসবে।” ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শিশু-কিশোর ও যুবসমাজকে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা করার উপযুক্ত মাঠ নির্মাণে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসা জরুরি। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ নির্মিত হলে গ্রামে ও শহরে শিশু-কিশোর ও ছাত্র-ছাত্রী খেলাধুলার পাশাপাশি লেখাপড়া ও কাজকর্মে মনযোগী হতে পারবে। দেশে শিশু-কিশোরদের আনন্দ দেওয়ার জন্য বিনোদনকেন্দ্র যেসব ‘শিশু পার্ক’ রয়েছে সেসব পার্কে ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস বল খেলাও নাই। উন্মুক্ত পার্র্কে নিয়ম বাধা, আনন্দ উপভোগ করতে সব শ্রেণির শিশু-কিশোর প্রবেশ করতে পারে না।

এসব বিষয় সরকারের পাশাপাশি ক্রীড়ামোদী ধর্নাঢ্য ব্যক্তিগণের নজরে নেওয়া প্রয়োজন। দেশে শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায় প্রায়ই স্কুলে নতুন নতুন বিল্ডিং রূপান্তরিত হচ্ছে। স্কুলের সীমানায় নতুন বিল্ডিং নির্মাণে স্কুলের মাঠ দিন দিন ছোট হচ্ছে আর ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলা করতে অসুবিধা হচ্ছে। কোন কোন স্কুলের মাঠও নেই। স্কুলের মাঠ না থাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সময়ে শিক্ষকগণ স্কুলের পাশে খালি জায়গা খুঁজতে দেখা যায়। দেশের স্কুলে উপযুক্ত মাঠ ও প্রতিটি ইউনিয়নে ১টি করে খেলার মাঠ এখন খুবই প্রয়োজন।

পূূর্বেকার দিনে দেশের মানুষের তুলনায় স্কুল ছিল কম। ছাত্র-ছাত্রীরা দূর-দুরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে স্কুলে এসে লেখাপড়া করেছে। যার ফলে হাঁটা-চলা করায় শরীর চর্চা ও ব্যায়াম হয়েছে। এখন ঘুম থেকে উঠে ছাত্ররা প্রায়ই স্কুলের ক্লাস ধরতে হয়। কোন কোন স্কুল দূরবর্তী থাকায় শিশুরা গাড়ীযোগে স্কুলে যাতায়াত করতে দেখা যায়। যায় ফলে শিশুকিশোরদের শরীর চর্চা, ব্যায়াম ও মাঠের অভাবে শারীরিকভাবে কতটুকু সুস্থ হয়ে বেড়ে উঠবে বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন। আগে অধিকাংশ বসতবাড়ী ছিল বড়, এখন মানুষ বাড়ছে আর বাড়ী ভাগ বাটোয়ারা হয়ে ছোট হচ্ছে। আগে বাড়ীঘর বড় থাকায় বাড়ীর উঠানে ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলা করতে দেখেছি, আমি নিজেও উঠানে খেলাধুলা করেছি। এখন দিন বদলের পালায় উঠানগুলো ঘর আর দালান কোঠায় পরিণত হতে যাচ্ছে। শিশু-কিশোর বাড়ীর উঠানে খালি জায়গা না পেয়ে কেউবা বালুর মাঠে, কেউবা ভয়ভীতির উর্ধ্বে রাস্তার উপরে ফুটবল খেলতে দেখা যায়। এর কিছু দিন পূর্বে সাংবাদিকের নজরে পড়া টিভির চ্যানেলে দেখেছি শিশুরা রেল লাইনের উপর ও নিকটবর্তী হয়ে ফুটবল নিয়ে খেলাধুলা করছে। এসব ভয়ংকর জায়গা থেকে শিশু-কিশোরকে সরিয়ে মাঠ তৈরি করতে হবে।

দেশের শহরের বাসা-বাড়ি এর কোন কমতি নেই। মাঠ নেই, প্রায় বাসার সামনে উঠান বা খালি জায়গাও নেই বললে চলে। কোন কোন বাসার গলির রোড পর্যন্ত দালান। বাসার সামনে খালি জায়গা না থাকায় গাড়ী বাসার বাহিরে (গলির রাস্তায়) রেখে বাসায় প্রবেশ করতে দেখা যায়। এটা খুবই লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, ছোট ছোট শিশু-কিশোর ও মা-বাবার আদরের সোনামনিরা বাসার বারান্দায় অথবা ঘরে বন্দী হয়ে খেলাধুলা করলে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠা কঠিন হতে পারে। বন্দিদশায় থাকা শিশু-কিশোর বসে বসে পিএসপি খেলা, রেসলিং দেখা, ভিডিও গেইম খেলা, টিভিতে কার্টুন দেখা ও বয়সউর্ধ্ব (১৪-১৬) বছরের যুবক-যুবতীরা মোবাইলে ও কম্পিউটারে ফেসবুক চালানো ও মোবাইলে স্বল্প টাকায় মিনিট ক্রয় করে দীর্ঘমেয়াদী ফোনালাপে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কিছু কিছু যুবক-যুবতী চলার পথে হাত দিয়ে মোবাইল টিপায় আর মুখ দিয়ে অন্যের সাথে কথা বলে ‘খুবই ভিজি ব্যস্ত’।

বিজ্ঞানের আবিস্কারকৃত মোবাইল মানুষের ভাল-মন্দ সংযুক্ত করেছে। পূর্বেকার দিনে এসব খেলাতো ছিলনা বিধায় আমাদের ছেলে মেয়েরা সবল, সুস্থ, মনোবল ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে বেড়ে উঠেছিল। যার ফলে ছোট খাটো দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর হার ছিল কম। এখন ভেজাল খাদ্যে গড়ে উঠা চক চক সুন্দর চেহারা আমাদের সোনামণিরা দুর্ঘটনায় পড়লে কেঁড়ে নিয়ে যায় প্রাণ। আমাদের ছেলে মেয়েরা শরীর চর্চা ও খেলাধুলা না করে বেড়ে উঠলে পিতা মাতার জন্য অমঙ্গলও হতে পারে।

দেশে খেলাধুলার মৌসুম শীতকালীন সময়ে দেখা যায় বেশি। কারণ হলো দেশে মাঠ না থাকায় শীত মৌসুমে গ্রামে ধান কাঠা শেষ হলে বা চাষের জমিন শুকানো থাকলে খেলাধুলার জায়গা বাহির হয়। আবার জমির মালিক বাধা দিলে খেলাধুলা বন্ধ রাখতেও হয়। বিগত শীত মৌসুমে আমার জানা গ্রামে শিশুকিশোর জমিতে ফুটবল খেলতে গেলে জমির মালিক বাধা প্রদান করে। শিশু-কিশোররা অন্য স্থানে খেলতে অর্থাৎ শুকানো জায়গা খুঁজতে পাশের গ্রামের নিকটবর্তী স্থানে গিয়ে খেলা শুরু করে, সেখানে ফুটবল খেলা শেষ হওয়ার পর পর কিছু লোকজন বলে উঠেন ‘ঐগ্রাম থেকে এখানে কেন খেলতে এলে’ এসব বাধার জবাব দিতে হচ্ছে তাদের। এ গেলো গ্রামের অবস্থার কথা শহরে তো আরও ভয়াভহ অবস্থা। ঘিঞ্জি পরিবেশে শিশুরা বড় হচ্ছে চিড়িয়াখানার বন্দি পাখির মতো। এ ডানা ভাঙ্গা পাখিগুলো রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের শিশু নায়কের মতো। এসব শিশু-কিশোর আমার ও আপনার সন্তান। তাদেরকে পড়ালেখা করার পাশাপাশি খেলাধুলা করার সুযোগ করে দিতে হবে আমাদের। কিছু কিছু এলাকায় শীত মৌসুমে জমিতে সবজি চাষ, ধান চাষসহ অন্যান্য চাষ করতে নদী বা খাল-বিল হতে পানি উত্তোলনের ফলে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ খুঁজতে কঠিন হয়।

‘ভাত বাংলাদেশীদের প্রধান খাদ্য’ ক্ষেত-খামার করে আমাদের বাঁচতে হবে এদেশে। ছেলে-মেয়ের শারীরিক ভাবে বেড়ে উঠতে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলা করার সুুযোগও করে দিতে হবে এদেশের মাটিতে। না হয় বন্দী অবস্থায় পিএসপি, রেসলিং, ভিডিও গেইম খেলাধুলা করলে সুস্থ মন ও সু-স্বাস্থ্যের অধীকারী নাও হতে পারে। তাই শিশু-কিশোর সাধারণভাবে বেড়ে উঠতে ও আগামী দিনে দেশের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় ইউনিয়ন ভিত্তিক খেলার মাঠ নির্মাণে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও