নিমতলী থেকে চকবাজার : ফাগুনের আগুনে ফিরে আসুক চৈতন্য

|| নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:০২ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

নিমতলী থেকে চকবাজার : ফাগুনের আগুনে ফিরে আসুক চৈতন্য

বিষাদ হৃদয়ের পংতিমালারা কাঁদছে নানা সুরে, নানা মূর্ছনায়। ফাগুনের হাওয়ায় এখন পোড়া মাংসের আশঁটে ধোয়াঁটে গন্ধ। সাদা কালো চেতনার একুশ এবার প্রভাত ফেরীর গানে নিয়ে এসেছে সাদা কাফন, হাহাকার আর আর্তনাদ। জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ রাতটি ফুরিয়ে ফুটেছিল দিনের আলো, নিভেছে আগুন। কিন্তু হৃদয়ে জ্বলে উঠা দাবানল যেন নেভার নামই নিচ্ছে না। চোখ জুরে এত কান্না, এত জল, যেন শেষ না হওয়া কোন নদীর বাধ ভেঙে গেছে চিরতরে। হ্যাঁ, বলছি চকবাজারের ভয়াবহ আগুনের কথাই।

আজ থেকে প্রায় ১০বছর আগে নিমতলীর নবাব কাটরা যে পাঁচ তলা বাড়িটিতে আগুন লেগেছিল, সেই বাড়িতে এখন পোড়ার কোনো চিহ্ন নেই। নিচতলা থেকে পাঁচ তলা পর্যন্ত পুরো বাড়িটি এই ছয় বছরে অনেক পাল্টে গেছে। স্বজনহারা মানুষগুলোর পাশাপাশি পুরো দেশের মানুষ মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর প্রত্যাশা করেছিল যে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান-কারখানা সরাতে সরকারি সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু নিমতলীর দুর্ঘটনার পর সরকার পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ এখনও সফল হয়নি। কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন এসব গুদাম ও কারখানা সরানোর আগে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু তাঁদের সুবিধার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় ৯ বছর।

পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকায় বিপজ্জনক কেমিক্যালের শত শত কারখানা ও গুদাম রয়েছে। যার দুর্বিষহ প্রতিফলন ঘটলো চকবাজারে। নিমতলী দুর্ঘটনার জন্য গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ওই ধরনের অগ্নিকান্ড প্রতিরোধের জন্য ১৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছিল।

যার মধ্যে রয়েছে জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেওয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ, বাজারজাতকরণ ও বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরকদ্রব্যের মজুদ বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরেজমিনে পরীক্ষা করাসহ আরো কিছু প্রস্তাবনা। কিন্তু প্রায় ১০ বছর আগের সেই ‘নিমতলী’র ঘটনারই পুনরাবৃত্তি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুন।

পুরান ঢাকাকে নিয়ে একটি প্রবাদ আছে, বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি। সেই আদি প্রবাদ একবিংশ শতাব্দীতেও বহাল রয়েছে। বুধবার রাত ১১টায় পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ছুটে আসে। কিন্তু সরু রাস্তার কারণে তারা গাড়ি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা হতাশার সুরে বলেছেন রাস্তা সরু থাকায় পাইপ নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হননি। দ্রুত কাজ শুরু করতে পারলে আগুন নিয়ন্ত্রণে আরও কম সময় লাগত। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমানো যেত।

আর হয়তো কেউ মা বলে ডাকবে না, কারো মাথার উপর থেকে চলে গেল বাবা ¯েœহ, হয়তো কোন স্বামীর পথের দিকে তাকিয়ে থাকা স্ত্রীর প্রত্যাশার গল্পও শেষ হয়ে গেছে। তাই, একটাই আশা, চকবাজার কিংবা নিমতলীর আগুনে নয়, ফাগুনের আগুনে ফিরে আসুক আমাদের চৈতন্য বোধ।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও