আসুন ভারত ত্যাগ করি, ৬০’র চিনি ৬০০টাকায় কিনি

রাজু আহমেদ || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:০৬ পিএম, ৪ মার্চ ২০১৯ সোমবার

আসুন ভারত ত্যাগ করি, ৬০’র চিনি ৬০০টাকায় কিনি

যুদ্ধ লাগলে কারো পৌষ মাস, আবার কারো সর্বনাশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কেউ কেউ ‘সকালে উঠিয়া মনে মনে বলি, পৃথিবীর কোথাও যেন যুদ্ধ লেগেছে শুনি’ এমন ছড়া পড়েন।

সম্প্রতি পাক-ভারত উত্তেজনা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, বিমান চালককে ফেরত দেয়াসহ নানা ইস্যুতে দেশভর কত আলোচনা, গণমাধ্যমে কত লেখা আর সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে কত স্ট্যাটাস! তবে এসবের মধ্যে পাকিস্তান প্রেমীর সংখ্যা যে ভারত প্রেমীর সংখ্যাকে কয়েকগুন ছাড়িয়েছে তার দেখা মিলেছে।

‘পেত্থম আলু’র মত একটি গণমাধ্যমেও ইনিয়ে বিনিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে আর ভারত বিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টিতে যে কোন চেষ্টা বাকি রাখেনি সেটি দেখে অবাকই হয়েছি। সুশীল আর দেশপ্রেমের শ্লোগানে বলিয়ান এই গণমাধ্যমটি কি করে ঐদেশটি সম্পর্কে পজিটিভ রিভিও দিল, যে দেশটির সাথে আমরা যুদ্ধ করে জিতেছি।

যে জয়ের জন্য ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছেন, দুই লাখ মা বোন সম্ভ্রম দিয়েছেন। শুধু তারাই নয়, সিংহভাগ গণমাধ্যমই এমনটি করেছে। এর নেপথ্যের কারণ হতে পারে, ভারত সরকারের নেপথ্য সমর্থন ছিল বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের উপর। তার আগে বলতে চাই,কেন আমরা পাক-ভারত যুদ্ধ নিয়ে এতটা মাতোয়ারা।

প্রথমত, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার দেশে আটক ভারতের বৈমানিককে ফিরিয়ে দিয়ে অলরেডি যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন (!) এমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে।

তিনি মহান, উদার, ফেরেস্তা টাইপ মানুষ, এমনটা বলতে চেয়েছেন হাজার হাজার পাক্তিান প্রেমী। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁিসর পর এই মহান (!) ইমরান খান (তৎকালীন বিরোধীদলের নেতা থাকাকালীন) শুধু দুখ: প্রকাশই করেননি, রীতিমত প্রতিবাদ করেছিলেন।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান মুসলিম দেশ, তাই কোনভাবেই হিন্দু রাষ্ট্র ভারতের পক্ষে যাওয়া যাবে না। গেলে সেটি হবে গুনাহে আজিম(!)। ধর্মীয় ইস্যু টেনে অনেকেই পাকিস্তানের পক্ষে থাকারও আহবান জানিয়েছেন।

এইসব পাকিস্তান প্রেমীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাচ্ছি, কেন একজন সাচ্চা মুসলমান ও রক্তে-মাংসে বাঙালী হিসেবে কোন ভাবেই পাকিস্তানকে সমর্থন দেওয়ার প্রশ্নই আসেনা।

মূল কারণ যারা ধর্মকে ব্যবহার করে একাত্তরে ৩০ লাখ বাঙ্গালীদের হত্যা করেছিল দুই লাখ মা বোনকে ধর্ষণ করেছিল। তাদের সমর্থন করা ৩০ লাখ শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানী করার সামিল!

ঐারা ধর্মের লেভেল লাগান, তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একাত্তরে ১৬ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় যৌথবাহিনীর কাছে ৯৩০০০ হাজার সৈন্য আত্মসর্মপন করেছিল এবং নিরাপদে পাকিস্তান পাঠানো হয়েছিল।

ধর্মের নামে নিরস্ত্র বাঙালী হত্যা ও ধর্ষণকারী পাকিস্তানী সৈন্যদের ফেরত পাঠানো তাহলে তো ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মহৎ কাজের মধ্যে পড়ে? যারা ধর্মের অজুহাতে পাকিস্তান প্রেমি হয়েছেন তারা কি জানেন পাকিস্তানের জনসংখ্যার চেয়ে ভারতের মুসলিমদের সংখ্যা দেড় গুন বেশি।

আপনাদের যদি এতই ধর্মের প্রতি টান থাকে তাহলে ভারতীয় মুসলমানরা কি দোষ করল? বার্মায় যখন মুসলিমদের গনহত্যা করা হচ্ছিল তখন আপনার পাকিস্তান কোথায় ছিল? যখন মাদার অব হিউম্যানিটি খ্যাত জননেত্রী শেখ হাসিনা বার্মার নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বকে আরেকটি গণহত্যার মিছিল থেকে বাচাঁলেন আপনারাই তখন কই ছিলেন? আপনার পাকিস্তান কই ছিল?

আমাদের জানা উচিত, জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, তাদের দিয়ে কৌশলগত স্বার্থ উদ্ধার এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বহাল রাখার জন্য পাকিস্তান অবশ্যই দায়ী।

এ জন্য পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সঙ্গী চীন বা যুক্তরাষ্ট্র এখন তার পাশে এসে দাঁড়াতে সংশয়ী। সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত হুসেন হাক্কানি বলেছেন, পাকিস্তানের প্রতি পুরো বিশ্বের সহনশীলতা ক্রমশ কমে যাচ্ছে।

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যকার এই নতুন সংঘাতের আশু প্রেক্ষাপট হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় এক আত্মঘাতী হামলায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪০ জন সৈন্যের নিহত হওয়ার ঘটনা।

পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে এবং এই ধরনের আরও হামলার হুমকি দিয়েছে। জইশ-ই-মুহাম্মদ ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর, বিশেষত গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে।

এই সংগঠনের নেতা মাসুদ আজহার পাকিস্তানে বসবাস করেন এবং অভিযোগ সত্ত্বেও তাঁকে কখনোই পাকিস্তানের সরকার বিচারের মুখোমুখি করেনি। ২০০১ সাল থেকে ভারতে একাধিক জঙ্গি হামলার জন্য জইশ-ই-মুহাম্মদ ও পাকিস্তান ভিত্তিক আরেকটি জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবাকে ভারত দায়ী করে।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ১৯৯০-এর দশক থেকেই পাকিস্তান এসব জঙ্গিগোষ্ঠীকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করে ভারত ও আফগানিস্তানে কাজ করতে দিয়েছে এবং তা থেকে সুবিধা লাভ করেছে। ফলে এই ধরনের জঙ্গি সংগঠন যখন ভারতে হামলা চালায়, তখন তার দায়িত্ব ভারত সংগত কারণেই পাকিস্তানের ওপরে চাপায়।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দরকার তাদের গুরুত্ব রক্ষার জন্য এবং দেশের ভেতরে যে ধরনের কার্যকলাপ চালাচ্ছে, বিশেষত পশতুন তাহফুজ মুভমেন্টের উত্থান তাদের যেভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে, তা মোকাবিলার জন্য দেশের বাইরে একটা আক্রমণোদ্যত শত্রু তৈরি করা। তারাও চায়, ভারতের আসন্ন নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদিই বিজয়ী হোক। কেননা তিনি ক্ষমতায় থাকলে ভারতকে পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে দেখানো সহজ। এতে করে দেশের রাজনীতির ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা সম্ভব। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার অজ্ঞাতেই জইশ-ই-মুহাম্মদ পুলওয়ামায় হামলা চালিয়েছে, তা বিশ্বাস করা দুরূহ।

আমি কোনভাবেই ভারতের পক্ষে বলছি না। শুধু বাস্তবটা তুলে ধরেছি। যারা ভারত বিদ্বেষী কথা বলেন আর ভারতকে দূরে ঠেলে দিতে চাচ্ছেন, তাদেরকে বলি, ভারত যদি কালকে চিনি থেকে শুরু করে পেয়াজ বিক্রি করাও বন্ধ করে দেয়, তবে কি হবে। তাহলে আসুন ভারত পরিহার করি, ৪০টাকার পেয়াজ ৪০০টাকায় কিনি, ৬০এর চিনি ৬০০টাকায় কিনি।

বি:দ্র: লেখাটি লেখকের নিজস্ব মতামত। এর সঙ্গে সম্পাদকীয় নীতিমালার কোন সম্পর্ক নাই।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও