বেশ্যালয়ের পিয়ানো বাদক (!)

অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার || লেখক : কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)। ০৭:১৮ পিএম, ২৮ মার্চ ২০১৯ বৃহস্পতিবার

বেশ্যালয়ের পিয়ানো বাদক (!)

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের টিকেটে মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেছেন, “আমি আগেও আওয়ামী লীগে ছিলাম, এখনও আছি। আমি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করলেও আওয়ামী লীগ আমাকে বহিষ্কার করেনি বা আমি আওয়ামী লীগও ছেড়ে যাইনি। তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত হয়েও আমি শপথ নিয়েছি।”

২২ মার্চ সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। নচিকেতা নামক একজন প্রতিবাদী কন্ঠশিল্পী গানে গানে “মন্ত্রীরা সব হারামজাদা” বলে রাজনীতিকে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলার সাথে তুলনা করে বলেছেন যে, রাজনীতিতে ডান বামের কোন পার্থক্য নাই, আজকে যে ডানে কালকে সে বামে, সুবিধামত এক জায়গায় বসতে পারলেই হলো, নীতির কোন বালাই নাই।

প্রকৃত পক্ষে রাজনীতি হলো একটি আর্দশিক বিষয় যা খুবই একটি আকর্ষনীয়, কিন্তু বর্তমানে রাজনীতিকদের কর্মকান্ডে প্রমাণিত হচ্ছে যে, রাজনীতি একটি লোভনীয় বিষয়। লোভের বশবর্তী হয়ে জনতার চোখে প্রখ্যাত গায়ক নচিকেতার ভাষায় “হারামজাদা” হতেও কোন আপত্তি বা বিপত্তি নাই। লোভনীয় পদে অধিষ্ঠিত হতে এক শ্রেণীর রাজনীতিকদের চক্ষু লজ্জা তো উঠেই গেছে বরং তাদের মানসিক ভারসাম্য এমন জায়গায় ঠেকেছে যে, তারা জনগণকে “ছদগার ছাগল” মনে করে, কারণ জনগণকে যে ভাবেই হউক জবাই করতে পারলেই হলো (!), তাতেই জনগণ সন্তোষ্ট এটাই তারা মনে করেন।

জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ঐক্য ফ্রন্ট আয়োজিত সিলেট জনসভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের সবচেয়ে বেশী সমালোচনা করেছেন সুলতান মুনসুর। তিনি ছিলেন ১/১১ সরকারের অন্যতম দোসর।

তিনি বিএনপি’র নির্বাচনী মার্কা “ধানের শীষ” নিয়ে আওয়ামী ঐক্য জোটের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন। তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কর্মকান্ডের, সরকার পরিবর্তনের জন্য জনগণকে আশার আলো দেখিয়েছেন। তিনিই ২২ মার্চ বলেছেন যে, “আমি জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট থেকে নির্বাচন করলেও আওয়ামী লীগ আমাকে বহিষ্কার করেনি বা আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাইনি। তাই জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত হয়েও আমি শপথ নিয়েছি।”

জনগণ বিবেচনা করবেন সুলতান মনসুর আদর্শিক কথা বলছেন, না লোভের বশবর্তী হয়ে ঐক্য ফ্রন্ট ও গণফোরামের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করলেন? তবে সুলতান মনসুর জনগণের সাথে যে প্রতারণা করছেন তা কি তিনি খন্ডাতে পারবেন? তার বক্তব্য মতে তিনি যদি আওয়ামী লীগেই থেকে থাকেন তবে গণ ফোরামে যোগ দিয়ে আওয়ামী বিপরীত মার্কা “ধানের শীষে” প্রার্থী হয়ে জনগণের ভোট প্রার্থনা করলেন কেন?

একই সাথে দু’টি সামাজিক সংগঠন করা যায়, কিন্তু একই সাথে কি দুইটি তথা সরকারী এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল কি করা যায়? সুলতান মনসুর যদি আওয়ামী লীগেই থেকে থাকেন তবে কি শুধু মাত্র নমিনেশনের আশায় গণফোরামে যোগ দিয়েছিলেন?

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূণ্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।”

সংসদ থেকে তার সদস্য পদ যাতে বাতিল না হয় শুধুমাত্র একারণেই নিলর্জ্জের মত সুলতান মনসুর বলেছেন যে, তিনি আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেন নাই? জাতীয় সংসদই এ মর্মে কি সিদ্ধান্ত নিবে তা এখন দেখার বিষয়। জাতীয় সংসদ যেহেতু এখন আওয়ামী লীগের দখলে (সংসদ বিরোধী দলসহ) সেহেতু স্পীকারও বিষয়টিতে চুপ থাকতে পারেন।

তবে বিষয়টি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল খুশীর উপর। বাংলাদেশের রাজনীতি কি এতোই সস্তা হয়ে গেলো যে, মুখভরা ফাঁকা বুলি দিয়ে জনগণকে পটানো যায় (!) অনেক জেলা পর্যায়ে দেখা যায় যে, বিএনপি’র বড় বড় পদে থেকে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মঞ্চে বক্তৃতা করছে। অথচ বিএনপি থেকে এ মর্মে কোন প্রকার সাংগঠনিক ব্যবস্থা নাই। সাংগঠনিক নিয়ম শৃঙ্খলা যেখানে মানা হয় না সেখানেই ঘুনে ধরে যা সহজে উপলব্দি করা যায়, তবে যখন ঘুনে ধরা “আবাসে” ধস নামে তখন প্রতিকারের আর সুযোগ থাকে না। দলীয় নেতাদের প্রতি উচ্চ পর্যায়ের নেতারা সাংগঠনিক এ্যাকশন থেকে বিরত থাকার কারণ উচ্চ পর্যায়ের নেতারাও দলীয় গ্রুপিং এ জড়িত, নতুবা লোভ তাদের পিছু ছাড়ছে না, বিএনপি কেন্দ্রীয় দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতারা এ সম্পর্কে কি জবাব দিবেন? জবাব দিহিতা না থাকার ফলে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের হৃদয়ে যে রক্ত ক্ষরণ হয় তার প্রতিকার না করাটা কি দলের জন্য শুভকর হচ্ছে?

সুলতান মনসুরদের বির্তকিত ভূমিকার জন্য ঐক্য ফ্রন্টতো বটেই গোটা রাজনীতি আজ বির্তকিত। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট (১৯৪৫-৫২) হ্যারি এস ট্রুমান বলেছেন যে, ‘‘ছোট বেলা থেকেই আমার পছন্দ ছিল বেশ্যালয়ের পিয়ানো বাদক বা রাজনীতিবিদ হওয়া, উভয়ের মধ্যে কি জোরদার কোন তারতম্য আছে?”

সুলতান মনসুর কি আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্টের মতবাদে বিশ্বাসী? নেতার মঞ্চের বক্তব্য ও ব্যক্তি চরিত্রে জনগণ যখন সমন্বয় দেখে না তখনই নেতৃত্বের প্রতি গণমানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং দেশে আন্দোলনে গণ-বিমুখতার এটাও অন্যতম কারণ।

গত ২২ ফেব্রুয়ারী সুপ্রীম কোর্ট অডিটরিয়ামে ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থীদের একটি গণ শুনানীতে প্রার্থীগণ নিজ নিজ এলাকার নির্বাচনে পূর্ব রাত্রে সীল মারা সহ সরকারের প্রশাসনিক তান্ডবের কথা তুলে ধরেন। শুনানীর এ পর্যায়ে অন্যতম প্রার্থী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন ফারুক বিগত নির্বাচনে নিজেদের ব্যর্থতার দায় কতটুকু তাও আলোচনায় আনার দাবী জানান। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনায় বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন যে, তৃণমূল নেতাকর্মীদের তিন দিন আলোচনা করার সুযোগ দেয়া হউক যাতে নির্বাচন বিষয়ক সর্ব বিষয় (দলীয় দ্বায় দায়িত্বসহ) তথ্য সরকারী জালিয়াতি ও ভোট ডাকাতির বিস্তারিত চিত্র প্রকাশ পায়। আমি মনে করি সরকারী দলের জালিয়াতি ও ভোট ডাকাতি আজ দিবালোকের মত সত্যে সত্য প্রমাণিত হলেও নির্বাচনী মাঠে কেন বিএনপি তথা ঐক্য ফ্রন্ট কেন্দ্র পাহাড়া দেয়ার ঝুকি নিতে পারলো না তা নিয়েও একটি বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা হওয়া আবশ্যক।

জাতীয় নির্বাচনের আদলে পরবর্তী উপজেলা সহ অন্যান্য নির্বাচনে যা ঘটছে তার দ্বায় বহনে সরকার ব্যর্থ। এখানে সরকারের নিকট শুধু বিএনপি বা ঐক্য ফ্রন্ট পরাজিত না বরং গোটা জাতি আজ পরাজিত এবং জনগণ হারিয়েছে তাদের ন্যায্য সাংবিধানিক ভোটাধিকার যার জন্য এ জাতি একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছিল।

আলোচনা সমালোচনা যাই হউক না কেন প্রতিকারের জন্য রাজনীতিকদের অবশ্যই একটি পন্থা খুজে বের করতে হবে নতুবা এর পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকে নেতৃত্বের প্রতি জনগণ দিন দিন আস্থাহীন হয়ে পড়ছে এবং রাজনীতিতে ঘুরে না দাঁড়ানোর এটাও আর একটি অন্যতম কারণ। তবে জাতীয় নেতৃত্বের বিষয়টি উপলব্দি পারছেন কি? এটাও বিবেচনার বিষয়।

আত্মসমালোচনা একটি দল ও সংগঠনকে মজবুত করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মসমালোচনা করলে অন্যেরা লাভবান হলেও নিদারুন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় আতœসমালোচনাকারী। তবে সস্তা জনপ্রিয়তার দিকে না তাকিয়ে কথা বলার জন্য কাউকে না কাউকে ঝুকি তো নিতেই হবে, যাতে রক্ষা হবে জাতীয় স্বার্থ। আশার কথা এই যে, উপরের স্তরে সংখ্যা কম হলেও নি¤œ পর্যায়ে ব্যতিক্রম তো মাঝে মধ্যে কিছু দেখা যায়। যাতে বুক ভরে উঠে এবং গণ মানুষ আশ্বান্বিত হয় এই ভেবে যে, তোশামোদী ও চাটুকারী না করে জীবনের ঝুকি নিয়ে ক্ষুদ্র হলেও জনগোষ্টির একটি অংশ সত্যের মূখো মূখি দাড়ানোর সৎ সাহস রাখে।

জাতির এ ক্রান্তি লগ্নে যখন সংখ্যাগরিষ্টরা চাটুকারীতায় গা ভাসিয়ে দিয়েছে, অন্যায়কে না দেখার ভান করে সহযোগীতা করে তাদের বিপরীতে শাহ আলম ও তাজুল ইসলামদের প্রতি রইল অসংখ্য মোবারকবাদ। জাতি প্রত্যাশায় রইলো, আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে? যে কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হবে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও