পাটকল শ্রমিক ও পাট নিয়ে রাজনীতি!

রণজিৎ মোদক || লেখক - শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সভাপতি, ফতুল্লা রিপোর্টার্স ক্লাব ০৮:০৬ পিএম, ৮ এপ্রিল ২০১৯ সোমবার

পাটকল শ্রমিক ও পাট নিয়ে রাজনীতি!

বর্তমান সরকার পাটকে বিশেষ কৃষিপণ্যের মর্যাদা দিয়ে এর গুরুত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে চলেছে। সেজন্য পাট তার হারানো গৌরব আবার ফিরে পাচ্ছে। যদিও পাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে আমাদের প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশ থেকে পাট আমদানির ক্ষেত্রে অ্যান্টি ড্যাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করেছে। তাছাড়া বিভিন্ন সিনথেটিক পণ্যেও আধিক্যের কারণে তা কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। তারপরও ভালোই চলছিল এ পাট খাত। এর সঙ্গে জড়িত শিল্প, কল-কারখানা, শ্রমিক-মালিক, সরকারি-বেসরকারি সকল পক্ষ।

কিন্তু হঠাৎ করেই এর একটি ছন্দপতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প, চামড়া শিল্পের পাশাপাশি পাট শিল্পও একটি গুরুত্ব বহন করেছে। পাটশিল্পে শুরু হয়ে গেছে শ্রমিক অসন্তোষ। যশোর-খুলনাসহ সারাদেশের কিছু কিছু জায়গায় ৯ দফা দাবিতে তারা আন্দোলন করছে। অথচ নব্বইয়ের দশকে পাটকলগুলো আস্তে আস্তে সীমিত আকারে যখন চালু হলো তখন বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে সামনে রেখে তা করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা জানি, পাটের বিভিন্ন চড়াই-উতরাইয়ের কারণে এ শিল্প আর তারপর থেকে লাভের মুখ দেখতে পারেনি। তাই বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) এ কলকারখানাগুলো চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা এ শিল্পের ক্রমাগত লোকসানের কারণে বছরে মাত্র পাঁচ থেকে সাত মাসের শ্রমিক মজুরি পরিশোধ করতে পারে। তাছাড়া সরকার কর্তৃক ২০১৫ সালে ঘোষিত পে-স্কেলও বাস্তবায়ন করতে পারছে না বিজেএমসি। সেজন্যই এ শ্রমিক আন্দোলন।

ইদানিং পাটকল শ্রমিকদের দুঃখ দেখে কষ্ট পাচ্ছি। কাজ করে বেতন না পাওয়া। পেটে যদি ভাত না থাকে ক্ষুধার পেটে মাথা ঠিক থাকার কথা নয় সত্য! কিন্তু তাই বলে উন্নয়নশীল দেশের গতিরোধ করে সরাসরি সড়কপথ অবরোধ করে বহ্নি উৎসব।

এমনিতেই আগুন দেখে আমরা সবাই ভয় পাচ্ছি। নিমতলা থেকে ঢাকার বনানী-গুলশান কতগুলো অসহায় প্রাণ ভস্মীত হলো। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিদের রক্তচক্ষু দেখে জাতি ভয় পায়নি। গ্রাম-কে গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, তাতেও আমরা ভয় পাইনি। বিজ্ঞদের ভাষায় ঢাকাবাসী আগুনের কুন্ডের ওপর বাস করছে।

একদিকে খোড়াখুড়ি অন্যদিকে ঢাকার শাখারী বাজারসহ ভূমিকম্প আতংক। এর মধ্যে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনের হুমকি। এ আন্দোলনের আগে-পিছে কারা রয়েছে? এ নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন ও সংশয়। আন্দোলনে আন্দোলনে দেশের বহু মিল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বিগত দিনে আদমজী শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে সরকারকে লোকসান গুনতে গুনতে শেষে পাট শিল্পের ধ্বংসের লক্ষ্যে বিশ্ব রাজনীতির খপ্পরে পড়ে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকার মাত্র ৩ দিনের নোটিশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ২০০২ সালের ৩০ জুন ঐতিহ্যবাহী আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দিয়েছিল। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের কতটা আগ্রহ ছিল সেটা বোঝা যায় মিল বন্ধের পরে তাদের এক প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিক্রিয়ায়। কারখানাটি বন্ধের ১৫ দিনের মাথায় ২০০২ সালের ১৬ জুলাই বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের তখনকার ভাইস প্রেসিডেন্ট মিকো নিশিমিজু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন, `যখন আমি আদমজী পাটকল বন্ধের ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্তের কথা জানলাম, তখন আমি সাধারণ মানুষের সেবা করার জন্য আপনার সাহস ও দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ হয়েছি।’

অর্থাৎ এশিয়ার সব থেকে বড় পাটকলকে বন্ধ করে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের চোখে ছিল সে সময়ের সরকারের বিরাট জনসেবা!

একটা সময় ছিল বাংলাদেশে পাটের জয়জয়কার অবস্থা ছিল। কিন্তু আশির দশকের পর থেকে পাটের বাজার আস্তে আস্তে কমতে থাকে। আর কমতে কমতে একসময় এমন অবস্থার মধ্যে এসে ঠেকেছিল যে, শুধু গরু বাঁধার দড়ি কিংবা পাটখড়ি ব্যবহারের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু পাট আবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের তৎপরতায় সেই পাটের সুদিন আবার ফিরতে শুরু করেছে।

সেসময় পাট ছিল বাংলাদেশের একমাত্র রপ্তানি পণ্য। তাছাড়া দেশে বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত পাটের প্রক্রিয়া জাতকরণের জন্য প্রায় ৮৭টি পাটকল ছিল। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সেসব পাটকল জাতীয় স্বার্থে জাতীয়করণ করে দিয়েছিলেন। সেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারায়ণগঞ্জের আদমজী এবং সিরাজগঞ্জের কওমি পাটকল ছিল। কারণ নারায়ণগঞ্জ ছিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদীবন্দর যাকে ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ বলা হতো।

অপরদিকে বাংলাদেশের সব জেলাতেই কমবেশি পাট উৎপাদন হলেও ময়মনসিংহ, রংপুর, সিরাজগঞ্জ ইত্যাদি জেলাতে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদিত হতো। সেসময়টিতে পাট ব্যবসায়ীদের অনেক কদর ও নাম-ডাক ছিল। বাজারে বাজারে ঘাটে ঘাটে পাটের হাট-বাজার, মহাল, আড়ৎ, গুদাম ইত্যাদিতে ভরপুর ছিল। পাট মৌসুমে কাঁচা পাটের গন্ধে প্রকৃতিতে এক অন্যরকম পরিবেশ বিরাজিত ছিল। সেসময় হাট-বাজার করার জন্য পাটের ব্যাগ ছিল ঐতিহ্য। প্রত্যেকের বাড়ির কর্তা হাট-বাজার করার জন্য সেই পাটের ব্যাগ নিয়ে বের হতেন। একটি পাটের তৈরি ব্যাগ দীর্ঘদিন যাবৎ সেই পরিবারের বাজার সওদা করার কাজে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। আর এ দিন পাল্টানো পাটের জন্য খারাপ সময় ডেকে এনেছে। একদিকে দিনে দিনে বিশ্ববাজারে পাটের বিকল্প তন্তু আবিষ্কৃত হয়েছে।

অপরদিকে সেসকল কৃত্রিম তন্তু দামে পাটের তুলনায় অনেক সস্তা হওয়ায় অনায়াসে সেগুলোর ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। সেজন্য কমতে থাকে পাটের গুরুত্ব ও দাম। অপরদিকে আমরা জানি, পাট ভেজানোর জন্য এবং পচানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে পানির প্রয়োজন পড়ে। সঙ্গত কারণেই পাটের আবাদ করতে কৃষকরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলতে থাকে। সেই সুযোগে কৃষি পরিক্রমায় ফসল চক্রে পাটের স্থান দখল করে নেয় অন্যান্য ফসল।

আমরা আরো জানি, বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে পাটের গুরুত্ব বিবেচনায় পাটকলগুলোকে জাতীয়করণ করে পাটের বহুমুখী ব্যবহারের ওপর সবিশেষ অগ্রগতি অর্জনে ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সরকারের আমলে আস্তে আস্তে সেসকল পাটকল প্রথমে বেসরকারিকরণ ও পরে বন্ধ করে দিতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের আদমজী পাটকল, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ পাটকলসহ অনেক পাটকল বন্ধ করে দেয় সেসব সরকার। সর্বশেষ ২০০৬ সালের পরে এসে সিরাজগঞ্জে কওমি পাটকলটি বন্ধ করে দেওয়ায় হাজারো শ্রমিক চাকরি হারায় এবং তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখনো মানবেতর জীবন যাপন করছে।

পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে শিল্প ও কলকারখানা চালু করার ক্ষেত্রে কিছু বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় আস্তে আস্তে আর্থিক প্রণোদনা, কর অবকাশসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আবারো সহজ শর্তে সেসব পাটকল খুলে দিতে থাকে। সেইসঙ্গে সরকার পাটের বহুমুখীকরণে উৎসাহ প্রদান শুরু করে।

পাট একটি পরিবেশবান্ধব দ্রব্য। আমরা যদি পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে শুধু একটি দিকে তাকাই তাহলে অনেক চিত্র পাওয়া যেতে পারে। সেটি হলো পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহারের পরিবর্তে ক্ষতিকর পলিথিন ব্যবহার করা। কারণ, দেখা গেছে পলিথিন এমন একটি জিনিস, যাকে যেভাবেই ব্যবহার করি না কেন তার ক্ষতি থেকে কোনোভাবেই বাঁচা সম্ভব নয়। এর কোনো বিনাশ নেই। এমনকি এটি পোড়ালেও দুর্গন্ধ হয়ে ধোঁয়া দিয়ে পরিবেশ নষ্ট করে দেয়। এটি যেখানে পড়ে থাকে সেখান থেকে কৃষি ফসলের জমিতে মাটির রস চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে। বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা, ড্রেন, নর্দমা সব জায়গায় পরিত্যক্ত পলিথিন জমে জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে থাকে।

সেজন্যই পলিথিনের বিকল্প হিসেবে শুধু বাংলাদেশে নয়, আমাদের প্রতিবেশী ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে ক্যারিং ব্যাগ হিসেবে পাটের তৈরি ব্যাগ অনায়াসে ব্যবহার করছে। আর যেহেতু দীর্ঘদিন যাবৎ পাটের বিকল্প হিসেবে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হয়ে আসছিল, সেজন্য সময়ের দাবি ছিল পাট দিয়ে পলিথিন তৈরি করতে পারা। ইতোমধ্যে সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এখন বাংলাদেশেই পাট দিয়ে পলিথিন তৈরি হচ্ছে। আস্তে আস্তে তা ব্যাপকতা লাভ করলে কৃত্রিম পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। কারণ পাটের তৈরি পলিথিন সহজেই মাটির সঙ্গে পচে গিয়ে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না।

ঢাকাই মসলিন, সিল্কের শাড়ি কিংবা কাপড় যেমন নামে-ডাকে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক পাটের তৈরি অনেক জিনিসপত্রও এখন দেশে বিদেশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাট দিয়ে এখন শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার, কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতোয়া, বাহারি ধরনের ব্যাগ, খেলনা, শো-পিস, ওয়াল মেট, আল্পনা, দৃশ্যাবলী, নকশী কাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, শিকা, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার পর্দার কাপড়, গহনার বক্সসহ এমন কিছু নেই যা পাট দিয়ে হয় না। প্রায় ১৩৭ ধরনের জিনিস পাট দিয়ে তৈরি হচ্ছে। এমনকি পাট দিয়ে এখন নানারকম গহনাও তৈরি করা যায়। সা¤প্রতিক সময়ে পাটের গুরুত্ব বেড়ে এর বাজারমূল্য বাড়ার কারণে পণ্যটির সুদিন ফিরছে।

কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি এখন উৎপাদন, চাহিদা, রপ্তানি, প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদির জন্য এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এক হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে বেসরকারি পাটকলগুলো মোট চাহিদার ৬০ ভাগ পূরণ করে থাকে এবং সরকারি কলগুলো থেকে চাহিদা মেটে ৪০ ভাগ। আমাদের দেশের একটি সমস্যা সবসময়ই রহস্যময় হয়ে দেখা দেয়, যা কোনো কোনো অবস্থাতেই কাম্য হতে পারে না।

এবারে পাট শিল্পে এ শ্রমিক অসন্তোষ যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়েই আন্দোলন করছে। অবশ্য সরকারের তরফ থেকেও আন্তরিকতার কোনো অভাব দেখা যাচ্ছে না। তারাও ফান্ডপ্রাপ্তি সাপেক্ষে শ্রমিকদের ৯ দফা আন্দোলনের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল। তবে এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামতে দেখা যায় যে, যেখানে বেসরকারি পাটকলে তেমন কোনো সমস্যা নেই সেখানে সরকারি কারখানাগুলোতে লোকসানের কারণেই এমনটি ঘটছে। আর সেজন্য প্রয়োজনে আস্তে আস্তে এ খাতের শ্রমিকদের বিশেষ সুবিধার আওতায় গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রদান করে সে কলগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া। সেক্ষেত্রে বিজেএমসি শুধু রেগুলেটরি বডি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে শ্রমিক অন্দোলনকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে যাওয়ার পূর্বেই তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।



নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও