২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, বুধবার ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৭:১৩ অপরাহ্ণ

মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোট লিখেছিলেন গণবিদ্যার ছাত্রী শ্রাবণী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩৮ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০১৭ সোমবার


মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোট লিখেছিলেন গণবিদ্যার ছাত্রী শ্রাবণী

নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় অবস্থিত গণবিদ্যা নিকেতনে শিক্ষকদের মারধর ও অপমান সহ্য করতে না পেরে নবম শ্রেনীর ছাত্রী উম্মে হাবিবা শ্রাবনী আত্মহত্যার আগে একটি সুইসাইড নোট লিখেছিল। সেখানে কী কারণে কেন আত্মহত্যা করেছিল তার আদ্যোপান্ত ছিল ওই সুইসাইডনোটে।

ইতোমধ্যে আদালতে দায়ের করা শ্রাবনী হত্যার চার্জশিটে আলামত হিসেবে ভিকটিম মৃতা উম্মে হাবিবা শ্রাবনী কর্তৃক মৃত্যুর পূর্বে ডায়েরীর পাতায় লিখে যাওয়া একটি চিরকুট, মৃতার গণবিদ্যা নিকেতন নারায়ণগঞ্জ এর ২০১৫ সালের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র, মৃতার ব্যবহৃত একটি গণিত খাতা দেখানো হয়েছে।

শ্রাবনীর মায়ের উদ্দেশ্যে লেখা সুইসাইড নোটে উল্লেখ ছিল, “প্রিয় মা আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী আমাদের স্কুলের নাছরিন মিস, সে বিনা কারণে আমার পরীক্ষা দেওয়াটা বাতিল করে দিসে। মা আমি তাদেরকে অনেক বলেছি। কেউ আমার কথা শুনে নাই। মা মুন্না স্যার বিনা কারণে আমারে মারছে, সবাই আমারে বিনা কারণে মারছে। মা পুরো স্কুল আমায় নিয়া হাসাহাসি করতাছে। মা আমি এটি সহ্য করতে পারিনাই। তাই আমি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলাম। মা যদি পারেন আমাকে মাপ করে দিয়েন। জুয়েল ভাইকে বইলেন আমারে মাফ করে দিতে। ইতি হাবিবা। মা আমারে কাটাছিরা করতে না কইরেন।”

প্রসঙ্গত ঘটনায় দায়েরকৃত আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলায় ৩ শিক্ষকসহ ৪জন অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেছে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চার্জশীটটি দাখিল করেন পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিদর্শক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন সরকার।

চার্জশীটে অভিযুক্তরা হলেন, গণবিদ্যা নিকেতনের শিক্ষিকা ও শহরের গলাকাটা পুকুরপাড় আল্লামা ইকবাল রোডস্থ শহীদুল হক ওরফে বাবিনের স্ত্রী নাছরিন সুলতানা, গণবিদ্যা নিকেতনের শিক্ষক ও শহরের নয়াপাড়া রোড এলাকার শামসুল হক সিদ্দিকীর পুত্র কামরুল হক সিদ্দিকী ওরফে মুন্না, গণবিদ্যা নিকেতনের সহকারী প্রধান শিক্ষক ও শহরের পশ্চিম দেওভোগ এলাকার মৃত তোফাজ্জল হকের পুত্র মোঃ আব্দুল জব্বার এবং স্কুলটির ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী আড়িয়ল ইউনিয়নের দিঘীর পূর্বপাড় এলাকার মজিবুর রহমানের পুত্র মোঃ জানে আলম। অভিযুক্তদের মধ্যে নাসরিন সুলতানা ও কামরুল হক সিদ্দিকী জামিন রয়েছেন। অপর দুই অভিযুক্ত আব্দুল জব্বার ও জানে আলম পলাতক রয়েছেন। চার্জশীটে সর্বমোট ২৮ জনকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় অবস্থিত গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান পরীক্ষা চলাকালীন সকাল ১১টার দিকে নবম শ্রেনীর ছাত্রী উম্মে হাবিবা শ্রাবনীকে (১৪) কথিত অসদুপায় (নকল) অবলম্বনের অভিযোগে আটক করে শিক্ষক নাছরিন সুলতানা। এসময় শ্রাবনীকে টেনে হিচড়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বারের কক্ষে নিয়ে আসা হলে আব্দুল জব্বার কোন ধরনের যাচাই না করেই শ্রাবনীকে পরীক্ষা থেকে বহিস্কার করেন। এসময় শ্রাবনী নকল করে নাই বলে বার বার আকুতি মিনতে জানালেও তার কথা কেউ শোনে নাই। ওই সময় শিক্ষক কামরুল হক সিদ্দিকী ওরফে মুন্না শিক্ষার্থী শ্রাবনীকে উপর্যুপরি চর থাপ্পড় মারেন। পরে শিক্ষার্থী শ্রাবনীকে স্কুল মাঠে দাড় করিয়ে রেখে চরমভাবে অপমান অপদস্থ করা হয়। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য জানে আলম ওই সময় উপস্থিত থাকলেও তিনি সকল ঘটনা প্রত্যক্ষ করেও কোন ধরনের ব্যবস্থা নেননি বরং অভিযুক্ত শিক্ষকদের উৎসাহিত করেছিলেন। পরে শিক্ষার্থী শ্রাবনী সকল শিক্ষার্থীদের সামনে আসামীগণ কর্তৃক অপমান ও অপদস্ত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি যায়। পরে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে পরনের ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করে। এসময় শব্দ পেয়ে শ্রাবনীর ছোট ভাই সোহান দরজার সামনে এসে দরজা বন্ধ দেখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখতে পায় শ্রাবনী ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। পরে তার ডাক চিৎকারে পার্শ্ববর্তী বাড়ির লাখিসহ আশেপাশের লোকজন অন্য দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে শ্রাবনীতে নিচে নামায়। পরে তারা শ্রাবনীকে দ্রুত নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ওই ঘটনায় নিহতের পিতা হাজী মোঃ হাবিবুল্লাহ বাদি হয়ে প্রথমে ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও পরবর্তীতে নিজেই এজাহার সংশোধন করে শিক্ষক নাছরিন সুলতানা ও কামরুল হক সিদ্দিকী ওরফে মুন্নাকে আসামী দেখিয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন সদর মডেল থানার এসআই হামিদুল ইসলাম। তিনি শিক্ষক নাছরিন সুলতানা ও কামরুল হক সিদ্দিকী ওরফে মুন্নাকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারী ওই চার্জশীটের নারাজি প্রদান করেন বাদি হাবিবুল্লাহ। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলার পরিদর্শক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন সরকার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।

চার্জশীটে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তকালে সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বারকে সিনিয়র শিক্ষক থাকাকালীন দায়িত্বরত ম্যানেজিং কমিটির সঙ্গে ঔদ্বত্যপূর্ণ আচরণ, আদেশ অমান্যকারী ও বিদ্যালয়ের তহবিল তছরুপের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। এছাড়া আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে উক্ত প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক কোচিং বাণিজ্য, বহিরাগত লোকদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, ম্যানেজিং কমিটি সম্পর্কিত আপত্তিকর লেখা সম্বলিত লিফলেট বিতরণ, বহিরাগত ব্যাক্তি ও উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থীদের দ্বারা সকল শিক্ষার্থীদের ক্লাস বর্জনে বাধ্য করে মিছিল ও স্লোগান দিয়ে বিদ্যালয় ত্যাগ করে প্রশাসনিক কর্মকান্ড ভেঙ্গে ফেলার মত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে তাকে দুই দফা কারণ দশার্নোর নোটিশ দিয়েছিল ম্যানেজিং কমিটি। আব্দুল জব্বার এর আগেও সায়মা নামের এক নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থীকে (স্কাউট সদস্য) চুলের মুঠি ধরে মারধর করেছিলেন। এছাড়া ম্যানেজিং কমিটির সদস্য জানে আলম এজাহারনামীয় আসামী ও পলাতক আসামী আব্দুল জব্বারের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক কোচিং বাণিজ্য, বহিরাগত লোকদের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, ম্যানেজিং কমিটি সম্পর্কিত আপত্তিকর লেখা সম্বলিত লিফলেট বিতরণ এবং স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকান্ড ভেঙ্গে ফেলার মত কর্মকান্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

আইন আদালত -এর সর্বশেষ