রূপগঞ্জ থানার সেই ওসি ইসমাইল প্রত্যাহার, মিষ্টি বিতরণ

রূপগঞ্জ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৪ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সোমবার



রূপগঞ্জ থানার সেই ওসি ইসমাইল প্রত্যাহার, মিষ্টি বিতরণ

রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ খবরে ২৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্যাতনের শিকার সাধারণ মানুষ একে অপরের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করে আনন্দ উল্লাসও করেছেন।

রূপগঞ্জ থানা থেকে প্রত্যাহার করে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়েছে ওসি ইসমাইল হোসেনকে। তার স্থলে নতুন ওসি হিসেবে যোগদান করেছেন মনিরুজ্জামান। তিনি ময়মনসিংহ জেলা থেকে এসেছেন।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রতিমাসে গড়ে ৪টি মার্ডারসহ প্রতিনিয়ত ছিনতাই, ডাকাতি, অপরহরণ, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, মারামারির ঘটনা ঘটেই চলছে। তারপরও রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন বাদ্যযন্ত্রের তালে আনন্দ উল্লাস করেই দিন পার করছেন। কখনো বাদ্যযন্ত্রের তালে নৃত্য, কখনো উচ্চ স্বরে সাউন্ড বক্স বাজানো নিয়েই থাকেন ব্যস্ত। রূপগঞ্জ এখন ডাম্পিং পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।

খুন খারাবির কথা শুনলেই আনন্দিত হয়ে ওঠেন রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেন। থানার কোথাও লাশ পড়লেই লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করার টার্গেট নিয়ে মাঠে নামেন। তার টার্গেট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত নানাভাবে হয়রানি-হেনস্তা চলতেই থাকে। এখানে হত্যাকা-ের রহস্য উদঘাটন কিংবা প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে চার্জশিট দেওয়ারও বালাই নেই। আছে শুধু ‘খুনের মামলা’ কে পুঁজি করে দুই হাতে টাকা হাতানোর হাজারো ফন্দিফিকির। সবচেয়ে ধনাঢ্য ওসিদের তালিকায় নাম থাকা ইসমাইল হোসেন সবচেয়ে বেশি খুশি হন জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগ পেলে। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কোন্দলে জড়ালে ওসি ইসমাইলের আনন্দ যেন আর ধরে না।

রূপগঞ্জ থানায় ওসি ইসমাইল হোসেন যোগদানের পর অন্তত দুই শতাধিক মিথ্যা ও সাজানো মামলা রুজু করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। মিথ্যা মামলা থেকে রেহায় পায়নি জাতীয় দৈনিকের সিনিয়র সাংবাদিক, উপজেলা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতারাও। তার টার্গেট পূরণ না হলেই ব্যবসায়ীদের কাছে থানার একজন এসআইকে পাঠিয়ে দেন মোটা অংকের টাকার জন্য। টাকা না দিলেই ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে মামলা দেয়া হয়। টাকা না দিলে পুনরায় চাওয়া হয় রিমান্ড। এভাবেই চলছে ওসি ইসমাইল হোসেনের কার্যক্রম।

গত ৭ জানুয়ারি গোলাকান্দাইল দক্ষিণপাড়া এলাকার নবীর ষ্টোর নামে রড-সিমেন্ট ও স্যানেটারী দোকান মালিক সাইফুল ইসলামকে থানার এসআই মনিরুল ইসলামকে দিয়ে ডেকে নিয়ে যায়। ওই এলাকার একটি বাড়িতে নিয়ে সাইফুল ইসলামের কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা, পরে ৫ লাখ টাকা ও একপর্যায়ে ৩ লাখ টাকা দাবি করে। অন্যথায় ৫০০ পিচ ইয়াবাসহ মামলা দেয়ার হুমকি দেয়। দাবিকৃত টাকা না দেয়ায় ২৪ ঘন্টা আটক রেখে নির্যাতনের পর ৪০ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল পুলিশ ছিনিয়ে নেয়। অবশেষে পরদিন ৫০০ পিচ ইয়াবাসহ আটক দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। এমন অভিযোগ ডজন ডজন রয়েছে।

রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুইটি পক্ষের বিরোধকে পুঁজি করে রূপগঞ্জের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীদের আসামি করে শত শত মামলা রুজু করার রেকর্ড গড়েছেন ওসি ইসমাইল হোসেন। ভুক্তভোগী নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করে জানিয়েছেন, ওসি ইসমাইল হোসেন রূপগঞ্জ থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক মামলা দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছেন। থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো নেতা মামলা মুক্ত থাকতে পারছেন না। সামান্য ছুত-ছুতোতেই নেতা-কর্মীদের চার-পাঁচটি করে মামলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব নেতা জমি বিরোধের ঘটনায় গ্রেফতার হলেও ওসি ইসমাইল আক্রোশে নিজ হাতে তাদের নির্মম নির্যাতন করে থাকেন। জায়গা-জমি বিক্রি করে ওসির ঘুষের দাবি পূরণ করেও রেহাই মেলে না।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগের ২ হাজার নেতাকর্মীর নামে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানিসহ গত তিন মাসে ১৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে রূপগঞ্জ জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এম এ হাসান, কাঞ্চন পৌর যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান, তারাব পৌরসভার গর্ন্ধবপুর এলাকার সুমন মিয়া ও ভুলতা ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন হত্যাকা- উলে¬খযোগ্য। এছাড়া এলাকায় বেড়েছে ডাকাতের উপদ্রব। দিনদুপুরে ডাকাতি হলেও নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিল পুলিশ। ওসি ইসমাইলের নির্দেশে ৭ জানুয়ারি রূপগঞ্জ থানার এসআই মনিরুজ্জামান গোলাকান্দাইল দক্ষিণপাড়া এলাকার নবীর ষ্টোরের মালিক ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামকে তুলে নিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। দাবিকৃত টাকা না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে নির্যাতনের পরদিন মাদক মামলায় আদালতে প্রেরণ করে। রূপগঞ্জের দুইজন সিনিয়র সাংবাদিককে একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানি করে ওসি ইসমাইল হোসেন। উপজেলায় জঙ্গি তৎপরতা রোধেও ব্যর্থ রূপগঞ্জ থানা পুলিশ। কার্যত ইসমাইল হোসেনের কর্মে ব্যর্থতা ছাড়া সফলতা কম।

সূত্র জানায়, ইসমাইল হোসেন ১৯৯৩ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন এসআই পদে। তখন চাকরির জন্য সুপারিশ করেছিলেন কাঞ্চন পৌর এলাকার বিএনপি নেতা ও তাঁর ভগ্নিপতি করমউদ্দিন। চাকরির জন্য সুপারিশপত্রে স্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ ছিল ইসমাইল নরসিংদী সরকারি কলেজের শাখা ছাত্রদলের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর মাধ্যমে তিনি চাকরিতে যোগদান করেন। ওসি ইসমাইল একটি বিলাসবহুল গাড়ি নিয়েছেন আবাসন কোম্পানি প্রাইম রিভারভিউ থেকে। তাঁর গ্রামের বাড়ি নরসিংদী সদর উপজেলার শিলমন্দিতে। সেখানে ইতিমধ্যে নামে-বেনামে ৫৬ বিঘা সম্পত্তি কিনেছেন। উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের সুবাস্তু টাওয়ারে রয়েছে তাঁর কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট।

উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ্ব লায়ন হাবিবুর রহমান হারেজ বলেন, ‘ওসি সাহেবের আপন ভাই ওমর আলী। ওমরকে দিয়ে রূপগঞ্জে লাখ লাখ টাকা আদায় করতো। এখানে অনেক আবাসন কোম্পানি ওসি ইসমাইলের ছত্রছায়ায় অন্যের জমি দখলে নিয়েছে।

রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি খন্দকার আবুল বাশার টুকু বলেন, মাদক-হেরোইনে ছেয়ে গেছে রূপগঞ্জ।

রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান ভুঁইয়া বলেন, আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার জন্য দলের ২ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সঠিক নয়।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও