ইয়াবা সহ পাকড়াও, চাকরির নামে টাকা লোপাট : নানা বিতর্কে পুলিশ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১১ পিএম, ৯ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার



ইয়াবা সহ পাকড়াও, চাকরির নামে টাকা লোপাট : নানা বিতর্কে পুলিশ

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের বেশ কিছু কর্মকান্ড ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ হতে চলেছে। চাকরি প্রদানের নামে ডিএসবির একজন এএসআই ৮০ লাখ টাকা লোপাট করেছে। ওই ঘটনায় পুলিশ গ্রেফতারও হয়েছে। সবশেষ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার একজন এএসআইকে ৫০ হাজার পিছ ইয়াবা বড়ি সহ গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ তাদেরই একজন সোর্সের বিরুদ্ধেও সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন করেছে। এর আগেও বন্দরের কামতাল তদন্ত কেন্দ্রে ১৫০০ পিছ ইয়াবাসহ ৯ পুলিশ সদস্যকে আটকের পরে এএসআইসহ ৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

সবশেষ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় কর্মরত একজন এএসআইয়ের কাছ থেকে থানার ভেতর থেকেই ৫ হাজার পিছ ইয়াবা ও ওই এএসআইয়ের ফ্ল্যাট বাসা থেকে আরো ৪৫ হাজার পিছ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তার নাম এএসআই সোহরাওয়ার্দী রুবেল। তিনি এখন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় এএসআই হিসেবে কর্মরত।  মার্চ বুধবার রাতে পৃথকভাবে এসব অভিযান চলে। এর আগে একজন নারীকে আটকে রেখে প্রায় ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেছিলেন তিনি।

সোহরাওয়ার্দী রুবেল বন্দরের রূপালী আবাসিক এলাকাতে সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী কামরুল ইসলামের বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাটে থাকেন। ওই বাড়ির কেয়ারটেকার জিয়াউল জানান, প্রায়শই এএসআই বিভিন্ন ধরনের লোকজনকে হাতকড়া অবস্থায় ধরে এনে ফ্ল্যাটে রাখতো।

সম্প্রতি ব্ল্যাকমেইলার এক পুলিশ সোর্সের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। ওই সোর্স স্ত্রীকে দিয়ে পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ এনে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতো। এভাবে কয়েক বছর যাবত পুলিশ অফিসারদের ব্ল্যাক মেইলিং করে আসছে। গত সপ্তাহের বুধবার রাতে ফতুল্লা মডেল থানায় ওসি কামাল উদ্দিন নিজ অফিস কক্ষে সাংবাদিকদের একথা জানান।

জাকির হোসেন নামে ওই সোর্স ফতুল্লার মাসদাইর এলাকার হানিফ মিয়ার ছেলে। সবশেষ ২১ ফেব্রুয়ারী সোর্স জাকির হোসেন ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে পুলিশ সুপারের কাছে একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তার স্ত্রী সীমা আক্তারের সঙ্গে এসআই সাইফুর রহমান ফোনের মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। এক পর্যায়ে তার স্ত্রী সীমা আক্তারকে নিয়ে ২০ ফেব্রুয়ারী সাইফুর অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়। এঘটনায় সোর্স জাকির হোসেন ফতুল্লা মডেল থানায় এসআই সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি জিডি করে পরের দিন জেলা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেন। এরপর নানা ভাবে এসআই সাইফুর রহমানকে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে জাকির হোসেন। বিষয়টি পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। এরপর বিষয়টি তদন্ত শুরু করলে সোর্সের ব্ল্যাক মেইলিংয়ের বিষয়টি উঠে আসে।

ওসি কামাল উদ্দিন জানান, বিভিন্ন সময় পর্যায় ক্রমে ফতুল্লা মডেল থানার ৩জন ও জেলা ডিবির একজনসহ চারজন পুলিশ অফিসারকে ব্ল্যাক মেইলিং করে হাতিয়ে নেয় মোটা অঙ্কের টাকা। তার ব্ল্যাক মেইলিংয়ের শিকার পুলিশ অফিসাররা মানসম্মানের ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানাতেন না।

গত এক মাসে শামীম ওসমানও এসব নিয়ে বেশ কিছু আক্ষেপের বিষয় তুলে ধরেছেন। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। শামীম ওসমানের মত এমপির ঘটনায় যেখানে পুলিশ নীরবতা দেখাচ্ছে সেখানে সাধারণ মানুষের অবস্থাও যে ভয়াবহ সেটাও প্রমাণিত হচ্ছে।

জানা গেছে, শামীম ওসমানের বাড়ী থেকে গ্রেফতারকৃত প্রবাসী যুবক সুলতান মাহমুদ শুভ ওরফে শুভ খান বিষয়ে তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে পুলিশ জানালেও এখন বলছে অগ্রগতি তেমন নাই। অথচ কয়েকদিন আগেও মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবির পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম জানান, আমরা ইতোমধ্যে মামলার অনেক তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এখন আর তদন্ত খুব একটা আগায়নি।

এর আগে শামীম ওসমান গণমাধ্যমকে জানান, ‘১০ ডিসেম্বর রাতে শহরের নিতাইগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে আমাদের মালিকানাধীন কার্গো জাহাজের কর্মচারীরা রাতের খাবারের পরই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। ভাগ্যক্রমে একজন কর্মচারী তখনো খাবার না খাওয়ায় তিনি বিষয়টি বুঝে ফেলেন এবং আমাদের জানান। মোট ১৪ জন কর্মচারী জ্ঞান হারান এবং পরদিন সন্ধ্যায় জ্ঞান ফিরে পান। জাহাজটির ইঞ্জিনে বেশকিছু লোহার রড পাওয়া গেছে যেগুলো ইঞ্জিন চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। হয়তো যারা কাজটি করেছে তারা কর্মচারীদের সংজ্ঞাহীন করে জাহাজে অবৈধ পণ্য রেখে আমাকে হেয় করার চক্রান্ত করেছিল’

ওই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই শফিকুর জানান, দুইজনকে সন্দেহজনক গ্রেফতার করা হয়েছিল। মামলাটির তেমন কোন অগ্রগতি নাই।

গত ১৭ জানুয়ারী সংবাদ সম্মেলনে ফতুল্লার জোড়া খুনের আসামীরা এখনো ধরা না পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপি শামীম ওসমান সেই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় প্রশাসনেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জোড়া খুনের আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে কিন্তু পুলিশ তাদের ধরছে না।

শামীম ওসমানের মামলা নিয়ে পুলিশ গড়িমসি, শামীম ওসমানের বাড়ি থেকে শিবিরের ক্যাডার গ্রেপ্তার হলেও সদর মডেল থানায় দায়ের করা প্রথম সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় জামায়াত শিবির ও নাশকতাকারীদের পৃষ্ঠপোশক হিসেবে নাম থাকা ব্যবসায়ী আল জয়নালকে দেখা গেছে পুলিশের সঙ্গে।

৩০ জানুয়ারী আল জয়নাল নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে যোগ দেওয়া নতুন ওসি কামরুল ইসলামকে গিয়ে ফুল দেন জয়নাল। কামরুল ইসলাম গত ২৮ জানুয়ারী থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে প্রথমবারের মত মামলা হয়। মামলায় ১১ জনকে আসামী করা হয়। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ২০০৯ এর ৬(২)/১০/১৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘঠন, গোপন ষড়যন্ত্র, অপরাধ সংঘঠেন পরস্পর সহযোগিতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এছাড়া আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধেও আছে অভিযোগ। ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ওসমানী স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের প্রস্তুতিমূলক সভায় শামীম ওসমান পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘যাদের নামে অভিযোগ হয়েছে তাদের ধরা তো দূরের কথা মাথার চুলের আগা ধরলে আগুন ধরিয়ে দিব। আমি প্রশাসনকে বলছি ডাবল গেম করবেন না। নিয়াজুলের অস্ত্র নিয়ে নাটক করবেন না। কারা অস্ত্র লুট করেছে তাদের ধরেন। এসব নাটক করবেন না। আমি এর জবাব দিব। আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে।’

ওই ঘটনার পর আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, শামীম ওসমানের এসব বক্তব্য রাজনৈতিক।

২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর রিমান্ডে ‘স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য’ আসামিকে সিগারেটের ছ্যাঁকা ও বেত দিয়ে মারার অভিযোগে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব করেছে নারায়ণগঞ্জের বিচারিক হাকিম আদালত। এ আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান বুধবার নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান এবং একই থানার এসআই আমীর হামজাকে ১ নভেম্বর আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন বলে কোর্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কাওছার আহমেদ জানান। তিনি বলেন, “মোটর সাইকেল চুরির এক মামলায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার ইমরুল হাসান ইমরানকে (২৫) রিমান্ডে নিয়ে তার পুরুষাঙ্গে সিগারেটের ছ্যাঁকা ও নিতম্বে বেত দিয়ে মারার অভিযোগে আদালত দুজনকে তলব করেছে।” গত ২৭ সেপ্টেম্বর সদর মডেল থানায় দায়ের হওয়া ওই মামলায় শনিবার ইমরানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই দিনই এক দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। রিমান্ড শেষে রোববার আদালতে হাজির করা হলে ইমরান স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি না দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ আনেন। এরপর বিচারক তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এরপর বুধবার আসাদুজ্জামান ও আমীর হামজাকে তলব করে নির্দেশ জারি করা হয়। এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তলব বা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

এর আগে ২০১৬ সালের ২ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ পৌরসভার রাইজদিয়া এলাকায় এক পান দোকানদারকে ধাওয়া দিলে সে পুকুরের পানিতে পড়ে যায়। পরে তাকে পিটুনী দিলে তার মৃত্যু হয়। ওইসময় ক্ষুব্দ জনতার পিটুনীতে কনস্টেবল আরিফুজ্জামান আরিফও নিহত হয়। মতিনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পুলিশের ধাওয়ায় ও পিটুনীতে পান দোকানদার আবদুল মতিনের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন । নিহত মতিনের স্ত্রী নূরতাজ বেগম বাদী হয়ে মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের জুডিশয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আশেক ইমামের আদালতে ওই মামলাটি করেন।

২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর অসামাজিক কার্যকলাপে (যৌনকর্মী নিয়ে ফূর্তি করাকালে) জড়িত থাকার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দরের মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই মফিজুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, মদনগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে অসামাজিক কার্যকলাপের সময়ে বুধবার রাতে গিয়ে হাতেনাতে আটক করা হয় মফিজুর রহমানকে। পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে মফিজুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়।

২০১৪ সালের ২১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের এএসপি আজিমুল আহসানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল কামতাল তদন্ত কেন্দ্রে অভিযান চালায়। অভিযানে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দলও ছিল। এ সময় ওই ফাঁড়িতে ১৫০০ পিস ইয়াবাসহ ৯ পুলিশ সদস্যকে আটক করা হয়। পরে অপেশাদার আচরণের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার কামতাল তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক, এক এএসআইসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা ছিলেন- বন্দর থানার কামতাল তদন্ত কেন্দ্রের উপ-পরিদর্শক মাসুদুল হক, এএসআই নেয়ামত উল্লাহ, পুলিশ কনস্টেবল আমীর ও কনস্টেবল ইউসুফ।

২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পাগলা সড়কের মুন্সিখোলা চেক পোষ্টে এক গৃহবধূর কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের একজন সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই), একজন হাবিলদার ও ২ জন কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এএসআই কামরুল, হাবিলদার উজির আলী, কনস্টেবল শহীদ মিয়া ও গোলাম মোস্তফাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও