পুলিশ নিয়োগে ৮০ লাখ বাণিজ্য : ‘জামাই আদরে’ কর্মকর্তা, অধরা বাদশা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৫ পিএম, ১০ মার্চ ২০১৮ শনিবার



পুলিশ নিয়োগে ৮০ লাখ বাণিজ্য : ‘জামাই আদরে’ কর্মকর্তা, অধরা বাদশা

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের জন্য কোচিং সেন্টার খুলে ২০ জন চাকরি প্রার্থীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা করে সর্বমোট ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় আসামী না হলেও গ্রেফতারকৃত পুলিশ কর্মকর্তা দুই সপ্তাহ ধরে রয়েছে জামাই আদরে। গ্রেফতারের পর থেকে অদ্যাবধি রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে জামাই আদরে রয়েছে ওই পুলিশ কর্মকর্তা। অপরদিকে এজাহারনামীয় অপর আসামী দালাল বাদশা এখনো রয়েছে অধরা। মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ বাণিজ্যের নাটের গুরুরা এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।

জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারী সকাল থেকে বিকেল অবধি ফতুল্লার পুলিশ লাইনসের মাঠে প্রথম ধাপে শারিরীক ফিটনেসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় পুরুষ কনস্টেবল পদে হাজারো যুবক ও নারী কনস্টেবল পদে শতাধিক যুবতী অংশ নেয়। শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় সর্বমোট ৬ শতাধিক উত্তীর্ন হন। তবে ওইদিন অর্থাৎ গত ২৪ ফেব্রুয়ারী শারিরীক পরীক্ষায় প্রতারণার শিকার হওয়া যুবকদের অনেকেই বাদ পড়লে ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ২৫ ফেব্রুয়ারী সকালে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৪ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যায়। যদিও ওই সময় পুলিশ ১০ জনকে আটকের কথা স্বীকার করেছিল। আটককৃতদের মধ্যে কলাগাছিয়া ইউনিয়নের হাজরাদি চানপুর এলাকার মোতাহার হোসেন ভূইয়ার পুত্র স্বদেশ ভূইয়া বাদি হয়ে বন্দর থানায় একটি প্রতারণা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামিরা হলেন ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ও বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের নিশং এলাকার সাহাবুদ্দিন ও একই এলাকার মোশারফের পুত্র বাদশা। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরো কয়েকজনকে আসামী করা হয়েছে।

মামলায় স্বদেশ ভূইয়া উল্লেখ করেন, বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বাইতুল্লাহ মসজিদের পূর্বপাশে গালাক্সি স্কুলের ভেতরে প্রতাশা নামে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে একটি কোচিং সেন্টার খুলেন পুলিশের ঢাকার বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) শাহাবুদ্দিন ও বাদশা। বাংলাদেশ পুলিশ কনস্টবল চাকুরী দেয়া কথা বলে স্বদেশ, সিয়াম, মোস্তাকিম, রায়হান, তৌহিদ, মারুফা আক্তার মলি, রুবেলসহ ২০ জন সদস্যদের কাছ থেকে ৪ লাখ করে টাকা হাতিয়ে নেয় বাদশা ও ঢাকা এসবির সহকারী উপ-পরিদর্শক সাহাবুদ্দিন।

এদিকে ওই মামলা দায়েরের পর গত ২৭ ফেব্রুয়ারী রাত সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) শাহাবুদ্দিন ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে আসার পথে ফতুল্লার শিবুমার্কেট এলাকা থেকে গ্রেফতার করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারক।
তিনি সত্যতা করে বৃহস্পতিবার জানান, গত ২৮ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অবগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে গ্রেফতারের পরপরই এএসআই শাহাবুদ্দিন বুকের বাম পাশে ব্যথা অনুভব করে ও বমি করলে প্রথমে তাকে শহরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রথমে নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুরের ৩০০ শয্যা হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে উক্ত আসামী ঢাকা পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরুষ হাইকেয়ার ইউনিটের ৩য় তলার ১১নং বেডে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এদিকে গ্রেফতারের পর থেকেই ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে হাসপাতালে জামাই আদরে রাখা হয়েছে বলে গুরুত্বর অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, এএসআই শাহাবুদ্দিনকে অসুস্থতার ভান করে পপুলার হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। সে ওই হাসপাতালের বেডে সময় পার করলেও তার গুরুত্বর কোন অসুখ হয়নি। শুধুমাত্র উচ্চ আদালত থেকে জামিনের ব্যবস্থা করানোর জন্যই তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কোন সরকারী হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে একটি বেসরকারী হাসপাতালে রেখে অসুস্থ প্রচার করে জামিনের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছে তার আইনজীবীরা। সে প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। এছাড়া আসামীকে রিমান্ডে না নিয়ে এবং তাকে পুলিশ হাসপাতাল কিংবা সরকারী কোন হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে আসামীকে বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করানোর কারণে মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও তার নেপথ্যের গডফাদারদের যেন বাঁচানোর মিশনে নেমেছে ডিবি পুলিশ এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে। যদিও এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারক।

এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারক জানান, গ্রেফতারকৃত এএসআই সাহাবুদ্দিন এখন অনেকটা সুস্থ। তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরলে গ্রেফতারকৃতকে রিমান্ডে নেয়ার জন্য আবেদন করবেন। এছাড়া অপর আসামী বাদশাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে এলাকাবাসী জানান, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের কথা বলে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় আসামী এএসআই সাহাবুদ্দিনকে রিমান্ডে নিয়ে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসবে নাটের গুরু কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধানসহ জড়িত অন্যদের নাম। কারণ ঘটনার শুরুতে ওই কোচিং সেন্টার এবং অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে বিতর্কিত ওই ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার অভিযোগ শোনা গিয়েছিল। কারণ যে ২০ জন প্রতারণার শিকার হয়েছে তাদেরকে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার দিন ফতুল্লার মাসদাইরে অবস্থিত পুলিশ লাইনসে শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষার দিন নিয়ে গিয়েছিল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধানের লোকজন। আর তার লোকজন কর্তৃক পুলিশ লাইনসে নেয়ার বিষয়টি ওইদিন গণমাধ্যমের কাছে স্বীকারও করেছিলেন দেলোয়ার হোসেন প্রধান। কারণ ওই ২০ জন চাকুরী প্রার্থী যুবকদের গত ২৪ ফেব্রুয়ারী এএসআই শাহাবুদ্দিন দালাল বাদশার মাধ্যমে এবং চেয়ারম্যান দেলোয়ার প্রধান তার দফাদার (চৌকিদার) আসাদ, আনাছ মিয়া, আবু নাইম, শিপন, অনিকসহ কয়েকজনের পুলিশ লাইনসে পাঠান শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য।

২৪ ফেব্রুয়ারী রাতে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার প্রধানের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি বলেছিলেন, দফাদার আসাদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার হিসেবে কর্মরত। তার ছেলে এবং মেয়ে দুজনই পুলিশের চাকুরী করে। আমার ইউনিয়নের অনেক ছেলেপেলে পুলিশের চাকুরীতে আবেদন করেছে। তাদের বলেছি আসাদুল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সে তাদের অনেক বিষয়ে বুঝিয়ে দিবে। এখন টাকা পয়সার কথা আসবে কেন। তার দুই ছেলে মেয়ে চাকুরীতে ঢুকতে ১০০ টাকাও লাগে নাই।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও