বার বার বিতর্কে বিঁধছে সদর মডেল থানা পুলিশ

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ৪ এপ্রিল ২০১৮ বুধবার



সদর ওসিকে ফুল দিচ্ছেন আল জয়নাল (ফাইল ফটো)
সদর ওসিকে ফুল দিচ্ছেন আল জয়নাল (ফাইল ফটো)

বার বার বিতর্কে বিঁধতে শুরু করেছে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছে এ থানার একাধিক কর্মকর্তা। আর এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা ধরনের সমালোচনা।

সবশেষ একটি মামলার দুই ধরনের এজাহার রুজুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর আগে জামায়াতের পৃষ্ঠপোশকের অভিযোগে একই থানার একটি মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তির ফুলের শুভেচ্ছা গ্রহণ করতে দেখা গেছে থানার ওসিকে। এছাড়াও অপরাধীদের প্রশ্রয় থেকে শুরু করে ১৬ জানুয়ারী আলোচিত হকার ইস্যুর ঘটনার পরেও অস্ত্র উদ্ধার নিয়ে নাটকীয়তা হয়েছে খোদ প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমান অভিযোগ তুলেন।

জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জ সদর থানার আওতাধীন চর সৈয়দপুর এলাকাতে একটি সিমেন্ট কারখানার বালু ভরাটকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সেখানকার গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওশেদ আলী সহ অন্তত ১০জন আহত হয়। ওই ঘটনায় মো. বাবু নামের একজন সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বাবু মামলায় ১২ জনের নাম উল্লেখ করেন। অভিযোগের এক অংশে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবী ও হত্যার উদ্দেশ্যে চেষ্টার অভিযোগ তোলা হয়। সদর মডেল থানার ডিউটি অফিসার ওই অভিযোগ গ্রহণ করে মামলার নাম্বার সহ ৩২৬ ও ৩৮৫ সহ আরো কয়েকটি ধারা সংযুক্ত করে। পরে বাদী বাবু ওই এজাহার কপি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের কাছে দেওয়া হয়। ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানীর সময়ে বাদী পক্ষের আইনজীবী জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল ৩২৬ ও ৩৮৫ ধারায় অভিযোগের বিষয়টি সামনে এনে আসামীদের জামিন না প্রদানের জন্য শুনানীতে অংশ নেন। কিন্তু তখন আসামী পক্ষের আইনজীবী বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন ও ৩২৬ ও ৩৮৫ ধারা এজাহারে নাই উল্লেখ করেন। পরে বিচারক আসামীদের জামিন প্রদান করেন।

হাসান ফেরদৌস জুয়েল জানান, বাদী আমাকে যে এজাহার কপি দিয়েছে সেখানে পুলিশের সাক্ষর, মামলার নাম্বার ও মামলায় অভিযোগের ধারা উল্লেখ ছিল। আমি সে আলোকে শুনানীতে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে দেখি আদালতে পাঠানো মামলার কপিতে অভিযোগের কিছু অংশও নাই ও ধারাও দুটি নাই।

মামলার বাদী মো. বাবু জানান, আমার কাছে ডিউটি অফিসার (নাম জানাতে পারেনি) কয়েকটি সাদা কাগজে সাক্ষর নিয়েছেন। পরে আমাকে একটি এজাহার কপি দেন। সেটাই আমি আইনজীবীকে দিয়েছি। কিন্তু মঙ্গলবার আদালতে গিয়ে জানতে পারি আমাকে যে এজাহার কপি দিয়েছে তার সঙ্গে কোর্টে পাঠানো এজাহারের মিল নাই। এর পেছনে আসামীদের বাঁচাতেই পুলিশ এ কাজটি করেছে।

জামায়াতের পৃষ্ঠপোশককে অব্যাহতি, ওসি নিল ফুল
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দায়ের করা প্রথম সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় জামায়াত শিবির ও নাশকতাকারীদের পৃষ্ঠপোশক হিসেবে নাম ছিল ব্যবসায়ী আল জয়নালের। বছরখানেক আগে অনেকটা চুপিসারেই জয়নালকে সেখান থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিবেদন আদালতে জমা করা হয়। কিন্তু এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে বিষয়টি আলোচনা করে নতুন করে তদন্ত শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক। অভিযোগ উঠেছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জয়নালকে বাদ দেওয়া আর সে সুবাধে রাজ্জাকের জ্ঞাতসারেই ৩০ জানুয়ারী আল জয়নাল নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে যোগ দেওয়া নতুন ওসি কামরুল ইসলামকে গিয়ে ফুল দেন জয়নাল। কামরুল ইসলাম গত ২৮ জানুয়ারী থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে প্রথমবারের মত মামলা হয়। মামলায় ১১ জনকে আসামী করা হয়। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ২০০৯ এর ৬(২)/১০/১৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘঠন, গোপন ষড়যন্ত্র, অপরাধ সংঘঠেন পরস্পর সহযোগিতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, আসামীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আসামীরা নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে অস্থিতিশীল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। আসামীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিরুদ্ধে গোপন সন্ত্রাসের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করে আসছিল। আসামীদের বিভিন্ন সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ডে পৃষ্ঠপোশকতা ও আর্থিক সহায়তাকরী হিসেবে খবিরউদ্দিন, জয়নাল, আলমাস ও ইব্রাহিম সহ অনেকেই সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।

পুলিশের সমালোচনা এমপি শামীম ওসমানের
জানা গেছে, গত ১৬ জানুয়ারী হকার ইস্যুতে শহরে সংঘর্ষের দিন নিয়াজুল ইসলাম নামের একজনের অস্ত্র খোয়া যায়। ঘটনার পর থেকে নিয়াজুল পলাতক থাকলেও ওই সময়ের থাকা ওসি আবদুর রাজ্জাক কখনোই নিয়াজুলকে ধরতে চেষ্টা করেনি। বরং পুলিশের নীরবতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনার পরেও নিয়াজুল সহজে ভারতে গেলেও পুলিশ ছিল দর্শক। ঘটনার পরদিন ১৭জানুয়ারী নিয়াজুল ইসলামের তার ছোট ভাই রিপন খানের মাধ্যমে সদর মডেল থানায় ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে অস্ত্র লুটের ঘটনায় অভিযোগ দেন। পুলিশ সেটাকে জিডি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। পরে গত ২৫ জানুয়ারী রাতে শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কে সাধু পৌলের গির্জার সামনে একটি ফুলের টব থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন অস্ত্র প্রদর্শনকারী নিয়াজুল ইসলাম খান ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শাহ নিজামসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত প্রায় এক হাজার জনকে আসামি করে লিখিত অভিযোগ করেন জিএমএ সাত্তার। তবে এ অভিযোগ এখনও মামলা হিসেবে গ্রহণ করেনি পুলিশ।

২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ওসমানী স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের প্রস্তুতিমূলক সভায় শামীম ওসমান পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘যাদের নামে অভিযোগ হয়েছে তাদের ধরা তো দূরের কথা মাথার চুলের আগা ধরলে আগুন ধরিয়ে দিব।’

প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি প্রশাসনকে বলছি ডাবল গেম করবেন না। নিয়াজুলের অস্ত্র নিয়ে নাটক করবেন না। কারা অস্ত্র লুট করেছে তাদের ধরেন। এসব নাটক করবেন না। আমি এর জবাব দিব। আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে।’

পুলিশের বক্তব্য
এসব ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, আল জয়নালকে আমি চিনতাম না। আমি থানায় জয়েন করার ২দিন পরেই তিনি ফুল দিয়েছেন।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও