৬ কার্তিক ১৪২৫, সোমবার ২২ অক্টোবর ২০১৮ , ৬:২০ পূর্বাহ্ণ

UMo

‘হুরের রানী’ ‘হিমালয়ের কণ্যা’র হামলার পরিকল্পনা


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:১৮ পিএম, ১৮ মে ২০১৮ শুক্রবার


‘হুরের রানী’ ‘হিমালয়ের কণ্যা’র  হামলার পরিকল্পনা

রাজধানী ঢাকার আরামবাগ এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জেএমবির সক্রিয় ২ জন নারী সদস্য ‘হুরের রানী’ ওরফে রুবাইয়া বিনতে নুর উদ্দিন ওরফে লাবিবা এবং ‘হিমালয়েরর কণ্যা’ ওরফে নাঈমা আক্তারকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১১। এসময় উদ্ধার করা হয়েছে উগ্রবাদী বই ও লিফলেট। গ্রেফতারকৃতরা অনলাইনে অস্ত্র চালনাসহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ নিত। তাদের পরিকল্পনা ছিল নারী সদস্য দ্বারা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা পরিচালনা করা। এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা নারী জঙ্গীদের একটি নেটওয়ার্কও গড়ে তুলেছিল। গ্রেফতারকৃতরা হুরের রানী ও হিমালয়ের কণ্যা নামে সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে আইডি খুলে জঙ্গীবাদের দাওয়াত দিত।

বুধবার রাত ১০টার দিকে ওই অভিযানের পরে বৃহস্পতিবার (১৭ মে) র‌্যাব-১১ এর নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‌্যাব-১১ এর ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর আশিক বিল্লাহ, এসইউপি, পিবিজিএমএস। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহকারি পরিচালক মো: আলেপ উদ্দিন, সিনিয়র সহকারি পরিচালক শেখ বিল্লাল হোসেন প্রমুখ।

গ্রেফতারকৃতরা হলো, ময়মনসিংহের সদর থানাধীন কাচি ঝুলি এলাকার হামিদ উদ্দিন রোডের বাসিন্দা হুরের রানী ওরফে রুবাইয়া বিনতে নুর উদ্দিন ওরফে লাবিবা (২০)। সে স্থানীয় একটি বালিকা মাদরাসায় নাহবেমীতে অধ্যায়ণরত। অপর গ্রেফতারকৃত হলো ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার শ্রীপুর গ্রামের বাসিন্দা হিমালয়ের কণ্যা নাঈমা আক্তার (২৫)। সে ময়মনসিংহের একটি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। গ্রেফতারকৃতরা নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার একটি মামলার এজাহারনামীয় আসামী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নারী সদস্য।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ১৭ এপ্রিল বাবা ও স্বামীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানাধীন সোনাকান্দা কেল্লা এলাকা থেকে  জান্নাতুল নাঈম ওরফে মিতু (১৯) এবং তার দুই সহযোগী মেহেদী হাসান ওরফে মাসুদ (২২) এবং আকবর হোসেন সুমনকে (৩০) গ্রেফতার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে উগ্রবাদী বই, লিফলেট ও মিতু’র ২ বছরের শিশু সন্তান রোজা আক্তারকেও উদ্ধার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে উগ্রবাদী বই, লিফলেট ও মিতু’র ২ বছরের শিশু সন্তান রোজা আক্তারকেও উদ্ধার করে। পরে মিতুর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারী জঙ্গীদের গ্রেফতারে অভিযানে নামে র‌্যাব-১১।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হুরের রানী ওরফে রুবাইয়া বিনতে নুর উদ্দিন ওরফে লাবিবা (২০) গত ২০১১ সালে ময়মনসিংহ এর একটি গার্লস স্কুল থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে। অতঃপর ২০১২ সাল থেকে মাদরাসায় লেখাপড়া শুরু করে। বর্তমানে সে স্থানীয় একটি বালিকা মাদরাসায় নাহবেমীতে অধ্যায়ণরত। সে মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্রবাদীতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। ২০১৬ সালে ইন্টারনেটে সামাদ ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে জাকির নামক এক জেএমবি সদস্যের সঙ্গে তার পরিচয় সূত্রে সে জেএমবির নারী শাখায় অন্তর্ভূক্ত হয়। পরে নারী জঙ্গী সদস্য মিতুসহ (র‌্যাব-১১ এর অভিযানে গ্রেফতার) বেশ কয়েকজন সক্রিয় নারী জঙ্গি সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। হুরের রানী ওরফে রুবাইয়া জেএমবিতে অর্ন্তভুক্তির পর সে জেএমবির নারী শাখার দাওয়াতী ও প্রচার কার্যক্রম চালাত। সে তার মা ফিরোজা বেগম, গ্রেফতারকৃত নাঈমাসহ তার নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী সহপাঠী ও বন্ধুদের জেএমবি এর দাওয়াত দেয়। তন্মধ্যে তার মা, নাঈমাসহ বেশ কয়েকজনকে সে জেএমবিতে অর্ন্তভুক্তি করিয়েছে। তবে রুবাইয়ার বাবা, নানা-নানী ও বেশ কয়েকজন নিকট আত্মীয় জেএমবির দাওয়াত প্রত্যাখান করে আইনশৃঙখলা বাহিনীর ভয় দেখালে সে তাদেরকে এড়িয়ে চলতে থাকে এবং পরে সে ও তার মা কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে নিজেদেরকে জেএমবি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখে।

এরমধ্যে জঙ্গী সামাদ ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে জাকির হুরের রানী ওরফে রুবাইয়াকে হিযরত করার প্রস্তাব দিলে তাকে তার মা স্বাচ্ছন্দে অনুমতি দেয়। ফলশ্রুতিতে তার মায়ের অনুমতিক্রমে উক্ত জঙ্গিকে বিয়ে করে হিযরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। তবে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ওই জঙ্গি জাকির এর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে হিযরতে গমনের বিষয়টি বিলম্বিত হয়। এর কয়েক মাস পরে জঙ্গী শরফুল আওয়াল রুবাইয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। রুবাইয়া ও তার মা শরফুলের পূর্বে গ্রেফতারের রেকর্ড দেখে খাঁটি মুজাহিদ হিসেবে বিবেচনা করে তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়; কিন্তু এর মধ্যে জঙ্গি শরফুল আওয়াল আবারও গ্রেফতার হলে সে পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। কিছু দিন পর পুণরায় জেএমবি সদস্য সামাদ ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে জাকির এর সঙ্গে রুবাইয়ার যোগাযোগ হয়। ফলশ্রুতিতে মা ও মেয়ের পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী রুবাইয়া হিযরতের উদ্দেশ্যে চলতি বছরের ১৬ মার্চ গৃহত্যাগ করে। তবে রুবাইয়া হিযরতের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগের বিষয়টি তার মা অবগত থাকলেও তার বাবা বিষয়টি জানতেন না।

হিযরতের উদ্দেশ্যে বের হবার পর সে, জঙ্গি সামাদ ও বেশ কয়েক জঙ্গি সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত অভিযান ও নজরদারী এড়াতে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করে। ইতোমধ্যে জঙ্গি সামাদ কৌশলে গ্রেফতারকৃত রুবাইয়াকে ভুয়া নাম ঠিকানায় একটি পাসপোর্ট করিয়ে দেয়। দেশ ত্যাগের উদ্দেশ্যে তারা বিদেশে অবস্থানরত জঙ্গি সদস্য নুর ইসলাম ওরফে ভানু প্রতাপ সিং ওরফে সাইফ আল ইসলামের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখত। দেশ ত্যাগের উদ্দেশ্যে তারা বেশ কয়েকদিন খুলনা, যশোর, বেনাপোলে অবস্থান করার পর তারা বুঝতে পারে যশোর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম ঝুঁকিপূর্ন হতে পারে। এ লক্ষ্যে তারা পুণরায় দেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র কয়েকদিন গা ঢাকা দেয়ার পরিকল্পনা করে।

অপরদিকে হিমালয়ের কণ্যা ওরফে নাঈমা আক্তার (২৫) ময়মনসিংহের একটি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। মূলত সে তার এক বান্ধবীর সহচার্যে এসে ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। অত:পর জসীম উদ্দিন রাহমানীর কিছু লেকচার ও অন্যান্য উগ্রবাদ সংক্রান্ত বই পড়ে উগ্রবাদীতায় আকৃষ্ট হয়। অত:পর সে গ্রেফতারকৃত রুবাইয়ার দাওয়াতের মাধ্যমে জেএমবি এর নারী শাখায় অন্তর্ভূক্ত হয়। গ্রেফতারকৃত নাঈমা ইন্টারনেট ও ফেসবুকে প্রচুর ধর্মীয় উগ্রবাদিতা বিষয়ে লেখালেখি ও প্রচুর ষ্ট্যাটাস দিত। সে তাদের কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে অবস্থানরত ছাত্রীদের উগ্রবাদীতায় দাওয়াত দিত এবং উক্ত হোস্টেলে সে ও রুবাইয়াসহ কয়েকজন নারী জঙ্গি মিলে মাঝে মধ্যে গোপন বৈঠক করত। উক্ত গোপন বৈঠকে তারা অনলাইনে অস্ত্র চালনাসহ বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ নিত। তাদের পরিকল্পনা ছিল নারী সদস্য দ্বারা কিভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা পরিচালনা করা যায়। ইতোমধ্যে রুবাইয়া হিযরতে চলে গেলে তার উগ্রবাদীতায় সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানাজানি ও জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে সে আত্মগোপনের পরিকল্পনা করে। পরে সে ও রুবাইয়া রাজধানী ঢাকার আরামবাগে একত্রে অবস্থান করতে থাকে।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

আইন আদালত -এর সর্বশেষ