৩ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ১২:১৮ পূর্বাহ্ণ

স্কুলছাত্র সিয়াম হত্যায় ৩ জনের যাবজ্জীবন


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৩:৫৮ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার


স্কুলছাত্র সিয়াম হত্যায় ৩ জনের যাবজ্জীবন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মাসদাইরের স্কুল ছাত্র আরাফাত রহমান সিয়াম আহমেদ (১০) হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে ৬আসামীর মধ্যে তিনজনের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড ও অপর ৩ জনকে খালাস প্রদান করেছে।

মঙ্গলবার ৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আনিছুর রহমান আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।

যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্তরা হলো মাসদাইর এলাকার ফারুক মন্ডলের ছেলে মেহেদী মন্ডল, মাসদাইরের আরমান মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া আব্দুল মতিনের ছেলে ভ্যানচালক আসলাম ও শ্রমিক হালিম। সিয়ামকে হত্যার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয়। আর অপহরণের পর গুমের অভিযোগে প্রত্যেককে আরো ৭ বছর ধরে কারাদন্ড, ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড ও অনাদায়ে আরো ৬ মাস করে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

খালাসপ্রাপ্তরা হলো মাসদাইর এলাকার ফারুক মন্ডল, স্ত্রী মেরিনা মন্ডল, বিপ্লব। রায় ঘোষণার সময়ে আসলাম ছাড়া বাকি সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

নারায়ণগঞ্জ আদালতের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন সত্যতা স্বীকার করেছেন।

জানা গেছে, কবুতর কেনার টাকা না দেয়ায় ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর মাসদাইরে আদর্শ স্কুলের ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র আরাফাত হোসেন সিয়ামকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে মেহেদী মন্ডল। হত্যাকান্ডের পর লাশ গুমে সহযোগিতা করে ঘাতক মেহেদী মন্ডলের বাবা ফারুক মন্ডল ও তার মা মেরিনা মন্ডল। এরপর ২৩ নভেম্বর সিয়ামের বস্তাবন্দী লাশ মুন্সিগঞ্জের শান্তিনগর এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। সিয়াম মাসদাইর এলাকার মোস্তফা মাতবরের ছেলে। ওই হত্যা মামলার আসামীরা হলো মাসদাইর পাকাপুল এলাকার মেহেদী মন্ডল, তার বাবা ফারুক মন্ডল, মা মেরিনা মন্ডল, মাসদাইরের আরমান মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া আব্দুল মতিনের পুত্র ভ্যানচালক আসলাম, শ্রমিক হালিম ও বিপ্লবকে আসামী করা হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সোহেল আলম। তিনি বদলীর পরে তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন এসআই মোঃ আবুল বাশার। পরবর্তীতে তদন্তের পর ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ তদন্তকারী কর্মকর্তা ৬ জনকে অভিযুক্ত করে এসআই গোলাম মোস্তফা আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। তিনি চার্জশীটে ২৯ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেন। যার মধ্যে ২২ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে।

মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জশীটে উল্লেখ করেছেন, নারায়ণগঞ্জের মাসদাইরে আদর্শ স্কুলের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র আরাফাত রহমান সিয়াম আহমেদ (১০) শখ করে কবুতর পালতো। ফারুক মন্ডলের পুত্র মেহেদী হাসান মন্ডল তাকে কবুতর দেয়ার কথা বলে ফুসলিয়ে টাকা নিতো কিন্তু কবুতর দিতনা। এতে করে সিয়াম মেহেদীর সঙ্গে চলাফেরা বন্ধ করে দেয়ায় মেহেদী তাকে একাধিকবার মারধরসহ প্রাণনাশের হুমকী দেয়। সিয়ামের বাবা ও স্বজনরা মেহেদীর বাবা ফারুক মন্ডল ও মা মেরিনা মন্ডলের কাছে অভিযোগ দিলে তারা মেহেদীর বিচার না করে উল্টো ছেলে মেহেদী মন্ডলকে প্রশ্রয় দেয়। তারা মেহেদীকে বলে সিয়াম তোর সঙ্গে না মিশলে তাকে যেখানেই পাবি সেখানেই মারবি। বিষয়টি সিয়ামের বাবা ও তার পরিবার জানতে পেরে সিয়ামকে মেহেদীর সঙ্গে মিশতে মানা করে। ওই ঘটনার ৩-৪ মাস পরে ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর সিয়াম ব্যাডমিন্টন খেলা দেখা শেষে মাসদাইর পাকাপুল আমেনা টাওয়ারস্থ বাদির ভাই (সিয়ামের চাচা) হাজী বজলুর রহমানের দোকানের দক্ষিণপার্শ্বে রাস্তায় দাঁড়ানো থাকাবস্থায় খুনী মেহেদী মন্ডল তাকে ডেকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। এসময় অপর আসামী হালিম ও বিপ্লবও তাদের পিছু পিছু যেতে থাকে। সিয়ামের আরেক চাচা সেকান্দর আলী তাদেরকে একসঙ্গে যেতে দেখেন। রাত ৯টায় বেজে গেলেও সিয়াম বাড়ি না ফেরায় তার পরিবার তাকে সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে রাত ১১টার দিকে ফারুক মন্ডলের বাড়ি যায়। এসময় তারা সিয়াম সম্পর্কে জানতে চাইলে ফারুক মন্ডল, স্ত্রী মেরিনা মন্ডল ও পুত্র মেহেদী মন্ডল তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে এবং তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আসামী ফারুক মন্ডল আরো হুমকী দিয়ে বলে যে, সিয়ামতো ভাল না, দেখো না কেউ মারিয়া ফেলিয়াছে কিনা? তখন বাদি ও তার লোকজনের সন্দেহ হইলে তাদের ঘর ঢোকার চেষ্টা করলে ফারুক মন্ডল বলে ফ্রিডম ফাইটারের বাড়িতে প্রবেশ করতে হলে অনুমতি নিতে হয়। পরদিন ২৩ নভেম্বর মাইকিং করাকালে সিয়ামের চাচা আনোয়ার পুনরায় ফারুক মন্ডলের কাছে সিয়াম সম্পর্কে জানতে চাইলে ফারুক মন্ডল বলে দেখ সিয়ামকে খালে বিলে পড়িয়া মারা গেছে কিনা। বার বার ফারুক মন্ডলকে সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় সে তার স্ত্রী মেরিনা মন্ডল ও ছেলে মেহেদী মন্ডলকে ঘরে তালাবদ্ধ করে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়। ওইসময় আসলাম, হালিম ও বিপ্লব এলাকা থেকে উধাও হয়ে যায়। মাইকিং চলাকালে নিহত সিয়ামের স্বজনরা জানতে পারে মুন্সিগঞ্জে একটি ১০-১২ বছর বয়সী শিশুর লাশ পড়ে আছে। এরপর তারা মুন্সিগঞ্জের হাসপাতাল মর্গে গিয়ে সিয়ামের লাশ শনাক্ত করে এবং লাশের সঙ্গে ফারুক মন্ডলের লুঙ্গিটি ছিল।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২২ নভেম্বর সিয়ামকে নিজ বাড়িতে ডেকে নেয়ার পরে মেহেদী তার হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে সিয়ামের বুকে আঘাত করলে সিয়াম চিৎকার করার চেষ্টা করলে মেহেদীর মা মেরিনা মন্ডল সিয়ামের মুখ এক হাতে চাপা দিয়ে রেখে অপর হাতে মোবাইলে তার স্বামী ফারুক মন্ডলকে ফোন করে ঘটনাটি জানায়। তখন ফারুক মন্ডল মাসদাইর কবরস্থান সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বের ক্লাবে আড্ডা দিচ্ছিল। স্ত্রী মেরিনা মন্ডলের ফোন পেয়েই ফারুক মন্ডল তৎক্ষনাৎ বাড়িতে ফিরলে তার সামনেই আবার সিয়ামের বুকে চাকু দিয়ে আঘাত করে মেহেদী। তখন ফারুক মন্ডল ও মেরিনা মন্ডল ছেলে মেহেদীকে বাধা না দিয়ে এবং ছুরিকাহত সিয়ামকে হাসপাতালে না নিয়ে ফারুক মন্ডল সিয়ামের মৃত্যু নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গলা চেপে ধরে এবং তার পরিহিত লুঙ্গি দ্বারা সিয়ামের ক্ষতস্থানে চেপে ধরে রক্ত থামানোর চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সিয়াম মৃত্যুবরণ করে। পরে মেরিনা বেগমের পরামর্শে মেহেদীর বাবা ফারুক মন্ডলের লুঙ্গী দিয়ে পেচিয়ে আমের ঝুড়িতে ভরে বস্তাবন্দী করে লাশ আসলামের ভ্যান গাড়িতে করে মুন্সীগঞ্জের মোক্তারপুরে শান্তিনগর এলাকাতে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়। মেহেদী মন্ডলের পরিকল্পনায় এ কিলিং মিশনে থাকা হালিম বিপ্লব ও আসলামকে ভাড়া করা হয় ১২ হাজার টাকায়।

পরে গ্রেফতারকৃত ভ্যানচালক আসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে হত্যাকান্ড ও লাশ গুমের বর্ণনা দেন। এরপর গ্রেফতারকৃত মেহেদী মন্ডলও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। তবে মেহেদী মন্ডল তার পিতা মাতাকে বাচাঁতে নাদিম, অপু ও রাসেল নামের আরো ৩ জনের নাম উল্লেখ করে। এরমধ্যে নাদিম নামের এক মুদি দোকানদারকে তদন্তকারী কর্মকর্তা আটক করলেও তার কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এছাড়া অপু ও রাসেল নামের কোন যুবকেরও কোন সুনির্দিষ্ট নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি। যে কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা মেহেদী মন্ডল, তারা বাবা ফারুক মন্ডল, মা ফারুক মন্ডল, ভ্যানচালক আসলাম, হালিম ও বিপ্লবকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

আইন আদালত -এর সর্বশেষ