১৫ জনের ফাঁসি : আলোচিত ৭ খুনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:৪৭ পিএম, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার



১৫ জনের ফাঁসি : আলোচিত ৭ খুনের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এর অনুলিপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে দন্ডপ্রাপ্তদের আপিল করতে হবে। ১৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ওই রায় প্রকাশ করেন।

আলোচিত সাত খুন নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস তো বটেই দেশের ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনার একটি। কলংক এটে দেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জবাসীর ললাটে। প্রমাণ সহ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এলিট ফোর্স র‌্যাব। ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল অপহরণের সেই ঘটনা এখনো ভুলতে পারেনি রাজধানী লগোয়া শীতলক্ষ্যার তীরের মানুষ। ঘটনার পর র‌্যাবের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার, প্রধান আসামী নূর হোসেনকে ভারত থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা সহ টান টান উত্তেজনায় পার হয়ে গেছে পৌনে তিন বছর।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলায় সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব.) আরিফ হোসেনসহ ১৫ জনের মৃত্যুদন্ডেরর রায় বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। বাকি ১১ জনের মৃত্যুদন্ড পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।

রায়ে যে ২৬ জনের মধ্যে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল নারায়ণগঞ্জের নিম্ন আদালত তাদের মধ্যে প্রধান চার আসামী সহ ১৫জনের মৃত্যুদন্ড তথা ফাঁসির আদেশ বহাল রাখে হাইকোর্ট। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বাকি ১১জনকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দন্ড দেওয়া হয়েছে।

গত বছরের ২২ আগস্ট আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।

এর আগে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন ২৬ জনের মৃত্যুদন্ড ও বাকি ৯জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে।

ফাঁসি ১৫ জন
হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদন্ড আসামীরা হলো প্রধান আসামী নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকুরীচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এমএম রানা), হাবিলদার এমদাদুল হক, ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দ বালা, সৈনিক আবদুল আলীম, ল্যান্সনায়েক হীরা মিয়া, আরওজি-১ আরিফ হোসেন, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী (পলাতক), সৈনিক আলামিন শরিফ (পলাতক) ও সৈনিক তাজুল ইসলাম (পলাতক)।

যাবজ্জীবন ১১ জন
এ ১১ জনকে ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জের নিম্নœ আদালত মৃত্যুদন্ড দিলেও হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করে। তারা হলো র‌্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, নূর হোসেনের সহযোগি সেলিম, জামালউদ্দিন, এনামুল কবীর, সানাউল্লাহ সানা (পলাতক), শাহজাহান (পলাতক)।

কারাদন্ড ৯ জনের

এর আগে ১৬ জানুয়ারী ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান করে যাদের রায় মঙ্গলবার হাইকোর্ট বহাল রেখেছে। অপহরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে করপোরাল রুহুল আমিনের ১০ বছর, এএসআই বজলুর রহমানের ৭ বছর, হাবিলদার নাসির উদ্দিনের ৭ বছর, এএসআই আবুল কালাম আজাদের ১০ বছর, সৈনিক নুরুজ্জামানের ১০ বছর, কনস্টেবল বাবুল হাসানের ১০ বছর কারাদ- হয়েছে। পলাতক আসামিদের মধ্যে হাবিবুর রহমানের ১৭ বছর, কামাল হোসেনের ১০ বছর ও মোখলেসুর রহমানের ১০ বছর কারাদ- হয়েছে। হাইকোর্ট তাদের নিম্নœ আদালতের রায় বহাল রেখেছে।

পলাতক, গ্রেপ্তার ও আত্মসমর্পণ
কারাদন্ড প্রাপ্তদের মধ্যে ৩ জন ও মৃত্যুদন্ড প্রাপ্তদের মধ্যে ৯জন ছিলেন পলাতক। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্তদের মধ্যে একজন সার্জেন্ট এনামুলক কবিরকে গত ৫ ফেব্রুয়ারী মাগুরা থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এছাড়া গত ১২ ফেব্রুয়ারী সৈনিক আবদুল আলীম ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম আদালতে আত্মসমর্পন করেন। ১৭ বছরের কারাদন্ড প্রাপ্ত কনস্টেবল হাবিবুর রহমান হাবিবকে গত ৩১ মার্চ বরিশাল পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ১৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নূর হোসেনের ঘনিষ্ট সহযোগী মত্যৃদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জামাল উদ্দিন।


পেছনের ঘটনা
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সাত খুন মামলার রায় দেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। মামলার প্রধান আসামি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের (নাসিক) সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র‌্যাবের বরখাস্তকৃত তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দেন আদালত। মোট ৩৫ আসামির মধ্যে বাকি নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেয়া হয়।


গত ২২ মে এ মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর হাইকোর্টের শুনানি শুরু হয়। প্রথমে বেশ কয়েকদিন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।

শুনানি শেষে গত ২৬ জুলাই রায় ঘোষণার জন্য ১৩ আগস্ট দিন ধার্য করে আদেশ দেন আদালত। এরপর ১৩ আগস্ট আদালত রায় না দিয়ে তারিখ পিছিয়ে ২২ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।

সেই ঘটনা
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। একই সময়ে একই স্থানে আরেকটি গাড়িতে থাকা নারায়ণগঞ্জ আদালতের প্রবীণ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালককে অপহরণ করা হয়। ঘটনার তিন দিন পর বন্দর উপজেলা শান্তির চর এলাকায় শীতলক্ষ্যা থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সাত জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রত্যেকের পেটে ছিল আঘাতের চিহ্ন; প্রতিটি লাশ ইটভর্তি দুটি করে বস্তায় বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ওই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। তিন জন তদন্তকারী কর্মকর্তার ১১ মাসের দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার নূর হোসেন, র‌্যাবের চাকরিচ্যুত তিন কর্মকর্তাসহ ৩৫জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এজাহারভুক্ত ৫ আসামি অব্যাহতির আবেদন করা হয়।  মামলায় ১২৭ জনকে সাক্ষী করা হয়। ১৬২ ধরনের আলামত উদ্ধার দেখানো হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৪ জুন রাতে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের অদূরে কৈখালি এলাকার একটি বাড়ি থেকে নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে বাগুইআটি থানার পুলিশ। পরে ওই বছরের ১৮ আগস্ট নূর হোসেন, ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বারাসাত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় বাগুইআটি থানা পুলিশ। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দমদম কারাগার কর্তৃপক্ষ নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। ১৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নূর হোসেনকে। গ্রেপ্তারকৃত ২৩ জনের উপস্থিতিতে ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চার্জ গঠন সম্পন্ন হয়। শুনানীর সময়ে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা ২৩ জনের অব্যাহতি আবেদন করলেও আদালতে সেটা নাকচ করে দেন। পলাতক ১২ জন সহ সাত খুনের দুটি মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ জনের সকলের বিরুদ্ধেই আদালতে চার্জ গঠন করা হয়। ফলে ১২জনের অনুপস্থিতিতেই মামলার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে ১২ জনের পক্ষে ৫জন আইনজীবী নিযুক্ত করেন রাষ্ট্রপক্ষ।

ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছিলো, দন্ডিতরা যে ধরনের অপরাধ করেছেন তারপরও যদি তাদের উপযুক্ত সাজা না দেওয়া হয় তাহলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা তৈরি হবে। দেশের জনগণের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাবের প্রতি মানুষের যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। কিন্তু কতিপয় সদস্যের কারণে সামগ্রিকভাবে গোটা বাহিনীকে দায়ী করা যায় না। কিছু উশৃঙ্খল র‌্যাব সদস্যের কারণে এ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে না। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন। এদিকে মামলার বিচারের দুটি ধাপ পেরিয়ে গেলেও এখনো পলাতক আছেন দন্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি। এদের মধ্যে তিনজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ও দু’জন যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও