৫০ হাজার ইয়াবা কেলেংকারীতে ওসির নাম না থাকা যুক্তিসঙ্গত না

ইত্তেফাক হতে নেওয়া || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৯ শনিবার

৫০ হাজার ইয়াবা কেলেংকারীতে ওসির নাম না থাকা যুক্তিসঙ্গত না

প্রায় ৫০ হাজার পিস ইয়াবার মামলায় পুলিশের দুজন সদস্যের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসেছিল নারায়ণগঞ্জ সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলামের নাম। ঐ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থাকার পরেও ওসিকে আসামি না করেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা (আইও)।

আইওর এ ধরনের ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, তদন্তকালে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সত্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কি না তা নিরূপণের দায়িত্ব মামলার বিচারকের। সেজন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তারও বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার বা আসার কোনো সুযোগ নেই। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে স¤প্রতি এ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়, আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে, ইয়াবা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অযৌক্তিক ও ভ্রান্তভাবে ঐ পুলিশ কর্মকর্তাকে চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করেননি। এজন্য মামলাটির অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন।

রায়ে বলা হয়, এটা স্পষ্ট যে, একজন সহ-অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি আরেক জনকে দোষী সাব্যস্ত করতে যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। তবে এটা অন্য সাক্ষ্য প্রমাণকে প্রমাণিত করতে একটা প্রাসঙ্গিক ঘটনা বা বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু তদন্ত পর্যায়ে একজন আসামির জবানবন্দির সত্যতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষমতা তদন্ত কর্মকর্তার নেই। এ কারণে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নয়, এমন কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির প্রধানকে নির্দেশ দেওয়া হলো।

২০১৮ সালের ৭ মার্চ নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার রুপালি আবাসিক এলাকা থেকে সদর মডেল থানার এএসআই সরোয়ার্দি ও মাদকবহনকারী সাবিনা আক্তার রুনুকে ৪৯ হাজার পিস ইয়াবা ও নগদ ৫ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।

এ ঘটনায় বন্দর থানায় দায়েরকৃত মামলার আসামি পুলিশের এএসআই আলম সরোয়ার্দি আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, রুনুকে ইয়াবাসহ আটকের পর ওসি কামরুল ইসলামকে আমি ফোন করি। উনি আমাকে নিরাপদ স্থানে যেতে বলেন। এরপর ঘাটের কাছেই বাসা হওয়ায় আমি আসামিসহ আমার বাসায় চলে যাই। পরে ওসি আলামত (৪৯ হাজার পিস ইয়াবা) ও ৫ লাখ টাকা রেখে রুনুসহ দুজনকে এসআই মোর্শেদের কাছে দিতে বলে। মোর্শেদ আসামি রুনুকে নিয়ে বাসার নিচে যাওয়ার পর আমাকে ফোন দিয়ে অপর আসামিকে ছেড়ে দিতে বলে। আসামি ছেড়ে দেওয়ার আগে আমি আলামত ও টাকা রেখে দেই। ঐ আলামত থেকে ৫ হাজার পিস ইয়াবা এনে ওসির নির্দেশমতো রাস্তা থেকে জনি নামে একজনকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসি। রাতে ডিবি অভিযান চালিয়ে আলামত ও টাকা জব্দ করে।

কনস্টেবল মো. আসাদুজ্জামান জবানবন্দিতে বলেন, সরোয়ার্দির বাসায় গিয়ে দেখি রুনু ও আ. রহমানকে দেখতে পাই। সে দুজনকে ইয়াবাসহ ধরেছে। মাদকগুলো থানায় না এনে বাসায় আনার কারণ জিজ্ঞাসা করলে সরোয়ার্দি বলেন, ওসি কামরুল স্যার আমাকে আসামিসহ মাদকগুলো বাসায় রাখতে বলেছে।

পুলিশের দুজন সদস্যের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ওসি কামরুলের নাম আসার পরেও তাকে বাদ দিয়ে গত আগস্ট মাসে ১২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজিমউদ্দিন আল আজাদ। মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি কনস্টেবল আসাদুজ্জামানের জামিন আবেদন পর্যালোচনাকালে বিষয়টি হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আসে। এরপরই তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব এবং এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। হাইকোর্টে দেওয়া ব্যাখ্যায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, দুজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ছাড়া পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় ওসিকে আসামি করা হয়নি।

আইওর ঐ ব্যাখ্যা আইনগতভাবে কতটা সঠিক সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও এস এম শাহজাহানের মতামত গ্রহণ করে হাইকোর্ট। তারা আদালতে অভিমত দিয়ে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার প্রধান কাজ মামলার তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা। তার কোনো ক্ষমতাই নেই মামলার তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দেওয়ার। ফলে তদন্ত কর্মকর্তা ওসিকে আসামি না করার ব্যাপারে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটা আইনগতভাবে সঠিক নয়।


বিভাগ : আইন আদালত


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও