চাষাঢ়ায় পানিবন্দী শ্রম কার্যালয়, প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৮ পিএম, ২ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার



চাষাঢ়ায় পানিবন্দী শ্রম কার্যালয়, প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত শিল্প ও বাণিজ্য নগরী নারায়ণগঞ্জে শিল্প কারখানা রয়েছে কয়েক হাজার। তবে ওই সকল শিল্প কারখানার তদারকি সংস্থা সহকারী শ্রম পরিচালকের কার্যালয়টি শুকনো মৌসুমেও রয়েছে পানিবন্দী। শ্রমিকদের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রটিরও ভগ্নদশা। চাষাঢ়া শহীদ মিনার সংলগ্ন বেইলী টাওয়ারের পার্শ্ববর্তী শ্রম পরিদর্শকের কার্যালয় এবং বাগে জান্নাত মহল্লায় অবস্থিত শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের আশেপাশের এলাকা অনেক উচু হয়ে পড়ায় এবং কার্যালয়  দু’টি নিচু হয়ে পড়ায় বছরজুড়েই পানিবন্দী অবস্থাতেই থাকছে কার্যালয় দু’টি। যাতে দুর্ভোগের শেষ থাকছেনা প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আগত সেবাপ্রার্থীদের। এদিকে ওই কার্যালয়টি বহুতল ভবনে রূপান্তর এবং তাতে শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারের উর্ধ্বতদের প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনেও আলোর মুখ দেখেনি।

জানা গেছে, শ্রমিকদের কল্যাণে, চিকিৎসা ও সেবাসহ তাদের বিভিন্ন সমস্যাদি নিরসনের জন্য তিন দশক পূর্বে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র চাষাঢ়ায় নির্মিত হয়েছিল সরকারী শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র ও সহকারী শ্রম পরিচালকের কার্যালয়। তবে বর্তমানে বেহাল ওই দু’টি কার্যালয়ের।

শহরের চাষাঢ়া শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় বেইলী টাওয়ারের পার্শ্ববর্তী সহকারী শ্রম পরিচালকের কার্যালয়টির বেহাল দশা। বর্ষা মওসুমে তো রয়েছেই শুস্ক মৌসুমেও কার্যালয়টি রয়েছে পানিবন্দী। জলাবদ্ধতার কারণে সেবা প্রার্থীরা যেমন ওই কার্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেনা তেমনি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছেন চরম দুর্ভোগে।

ওই সহকারী শ্রম পরিচালকের কার্যালয়টি ভেঙ্গে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ ও তাতে শ্রম আদালত স্থাপনের বিষয়ে বেশ কয়েক বছর আগে একটি অনুষ্ঠানে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন শ্রম প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া গেল বছরের এপ্রিল মাসে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, শ্রমজীবী মানুষের আইনি সেবা প্রাপ্তি সহজ করতে টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও রংপুরে শ্রম আদালত স্থাপন করা হবে। তিনি বলেন, ‘ঢাকায় বিদ্যমান ৩টি শ্রম আদালতের মধ্যে ২টি শ্রমঘন এলাকা- টঙ্গী ও নারয়ণগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে। এছাড়া, সিলেট ও রংপুরে ২টি নতুন শ্রম আদালত স্থাপন করা হবে।’ তবে মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের নানা প্রতিশ্রুতির পরেও তাদের সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।

অপরদিকে শহরের চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মহল্লায় অবস্থিত সরকারী শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের কার্যালয়ের মূল ভবন ও কর্মকর্তাদের জন্য দু’টি কোয়ার্টার রয়েছে। কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত দু’টি কোয়ার্টার দীর্ঘদিন ধরেই পরিত্যাক্ত হয়ে পড়েছে। সকল মওসুমেই ওই দু’টি কোয়ার্টারে পানি জমে থাকে। নানা ধরনের আগাছার কারনে কোয়ার্টার দু’টি অনেকটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো হয়ে পড়েছে। মূল ভবনটিতে শ্রমিকদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য আউটডোর এবং শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন সভা ও খেলাধুলা করার জন্য ইনডোর রয়েছে। তবে সেটিও বেশ ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পলেস্তরা খসে পড়েছে। তার উপর বর্ষা মওসুমে জলাবদ্ধতার কারনে অফিস করতে পারেন না কেউই। আউটডোরে রোগীদের দেখে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করার জন্য শ্রম মন্ত্রনালয় থেকে প্রতিবছর বরাদ্দ দেয়া হয়। পূর্বে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা এখানে এসে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিতেন। কিন্তু বর্তমানে কোন শ্রমিক এই কার্যালয়ের ধারে কাছেও ঘেষেন না। শ্রমিক কলোনীতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া ও তদারকি এবং বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিকদের বিনামূল্যে পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী বিতরণ ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধকরন শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের অন্যতম কাজ হলেও অফিসের ভগ্নদশার কারনে শ্রমিকরা এখানে আসছেন না। তারা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কাজ করে থাকেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত অফিসে আসলেও বসতে না পারার কারনে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই বাড়ি ফিরে যান। আবার অনেক সময় অফিসের বারান্দাতেই বসে অফিসের সময় অতিবাহিত করে থাকেন।

শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী স্থানে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উপ মহা পরিদর্শকের আধুনিক কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর শ্রম কল্যাণ কেন্দ্রের জমিতে পিপিপি চুক্তিতে একটি ৩০০ শয্যার বেসরকারী হাসপাতাল নির্মাণের কথা রয়েছে। যাতে ১০০ শয্যা শ্রমিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। ওই স্থানে বেসরকারী হাসপাতালটি নির্মাণের কথা রয়েছে দিল্লির ফরটিস হাসপাতালের। গেল বছরের এপ্রিলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠানসমূহের উপ মহা পরিদর্শকের আধুনিক কার্যালয় উদ্বোধন করতে এসে শ্রম প্রতিমন্ত্রী ওই বেসরকারী হাসপাতালের বিষয়ে বলে গিয়েছিলেন। ওই হাসপাতালটিতে শ্রমিকরা স্বল্পমূল্যে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাবে বলেও জানানো হয়েছিল।

এদিকে দীর্ঘদিনেও নারায়ণগঞ্জে শ্রম আদালত ও হাসপাতাল স্থাপনের কাজ শুরু না হওয়ায় শ্রমিক অধ্যুষিত নারায়ণগঞ্জের শ্রমিকরা এই দু’টি সেবা থেকে দীর্ঘদিন ধরেই বঞ্চিত রয়েছে।

২০১৪ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার। মালিক শ্রমিক দ্বন্দ্বের কারণে মামলার এ সংখ্যা দুই বছরে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে থাকার কারণে খর্ব হচ্ছে শ্রমিক অধিকার। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকায় ৩টি, চট্টগ্রামে ২টি, খুলনা ও রাজশাহীতে একটি শ্রম আদালত এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালসহ মোট ৮টি আদালতে উল্লিখিত মামলা বিচারাধীন। বিচারাধীন মামলার মধ্যে ঢাকায় ৩টি আদালতে ঝুলে আছে ১০ হাজার ১৫৭টি মামলা, চট্টগ্রামের ২টি আদালতে এক হাজার ৫০২টি, রাজশাহীর শ্রম আদালতে ২৯১টি, খুলনায় ৯৪০টি। এ ছাড়া শ্রম আদালতের আপিল ট্রাইব্যুনালে ২৪৬টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। উল্লিখিত মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা গত দুই বছরে অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের পর বছর এসব মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় পড়ে থাকায় শ্রমিকেরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মনে করেন।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও