শীতলক্ষ্যায় মিনি ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজিতে ক্ষুব্দ এলাকাবাসী

সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৬ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার



ফাইল ফটো
ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮নং ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ে মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের একটি সিন্ডিকেটের যোগসাজশে স্থানীয় কাউন্সিলরের অনুগামীরা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হওয়ায় ক্ষুব্দ এলাকাবাসী। তাদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে নাসিকের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ে সোচ্চার থাকায় গত ৯ মাস আগে নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ হলেও ৯ মাসের ব্যবধানে নিতাইগঞ্জ আবার ফিরছে স্বরূপে। তবে এবার শুধু নিতাইগঞ্জ এলাকাতেই নয় শীতলক্ষ্যা মোড় ও বাপ্পী স্মরণীতেও মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড গড়ে উঠতে শুরু করেছে। এছাড়া ভরাটকৃত বিকে রোড খালেও মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড বসানোর পায়তারা চলছে। এতে করে ক্ষোভ আরো বাড়ছে ১৮নং ওয়ার্ড এলাকাবাসীর।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাজেট অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় এমপি সেলিম ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শহরের নিতাইগঞ্জে ট্রাক স্ট্যান্ড উঠানো ও ফুটপাত হকারমুক্ত রাখার দাবী করেন সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তিনি বলেন, এমপি সেলিম ওসমান চাইলেই নিতাইগঞ্জ এলাকাটি স্ট্যান্ডমুক্ত রাখতে পারে। কারণ এসব ট্রাকের কারণে প্রচন্ড যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশনের নগর ভবনও অবরুদ্ধ হয়ে যায় যানজটের কারণে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেলিম ওসমান ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে দিনের বেলায় ট্রাক না রাখার নির্দেশনা দেন। দিনের বেলায় ট্রাক রাখতে না পারলে প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছেড়ে দেয়ারও কথা বলেন সেলিম ওসমান।

পরে গত ৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে এমপি সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে নিতাইগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সিদ্ধান্ত হয় ১ আগষ্ট থেকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে পাইকারী মোকামে লোক আনলোড রাতের বেলায় চলবে। দিনের বেলায় কোন ট্রাক থাকতে পারবেনা এমনকি তাদেরকে শহরের বঙ্গবন্ধু ও সিরাজদ্দৌলা সড়ক দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হবেনা। রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত নিতাইগঞ্জের বোটখালের উপরে লোড আনলোড করবে ব্যবসায়ীরা। একটি ট্রাক লোড আনলোডে সর্বোচ্চ সময় পাবে সর্বোচ্চ ৩ ঘন্টা। এছাড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের কতগুলো ট্রাক প্রবেশ করতে পারবে সেটাও নির্ধারণ করা দেয়া হয়। যদি কেউ নির্দেশনা অমান্য করে দিনের বেলায় ট্রাক নিয়ে অবস্থান করে তাহলে তাকে জরিমানা ছাড়াও ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল দেয়া হবে। ২ মাস পুলিশের পাশাপাশি ৪০ জন আনসার সদস্য কাজ করার জন্য আনসার কমান্ডারের হাতে ১৫ লক্ষাধিক টাকার চেক তুলে দেন এমপি সেলিম ওসমান।

ওই সভায় সেলিম ওসমান ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মানুষের শান্তির জন্য নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে সহযোগিতা করতে হবে। তবে এখানেই শেষ নয় আমরা এরপর বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাতসহ নাগরিক সমস্যা নিয়ে কাজ করবো। আপনারা কোন ধু¤্রজালের সৃষ্টি করবেন না। দেশের অনেক স্থানেই রাতের বেলায় লোড আনলোড হচ্ছে। চেঞ্জ অর ডাই অর্থাৎ পরিবর্তন করো নয়তো মর। কারো ব্যাক্তিগত স্বার্থের জন্য আমরা রাস্তা ব্যবহারের অনুমতি দিব না। রাতের বেলায় লোড আনলোডের জন্য ট্রাক ভাড়া বাড়ানো যাবেনা। দরকার হলে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দিবে। কোন ধরনের সুপারিশ মানবো না।’

এদিকে ৯ মাস পূর্বে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকারী ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিতাইগঞ্জে ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার পরে যানজটের অন্যতম স্থান হিসেবে পরিচিত নিতাইগঞ্জ এলাকায় ফিরে এসেছিল শৃঙ্খলা। তবে গত কিছুদিন ধরে নিতাইগঞ্জের ট্রাকে পণ্য লোড আনলোডের ক্ষেত্রে কোন নিয়মই মানছেনা। নাসিকের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদের বিষয়ে সোচ্চার থাকলেও ১৮নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কবির হোসাইনের লোকজন শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ে বসিয়েছেন মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড। যেখানে পার্কিংয়ের জন্য ট্রাক প্রতি ৩০০ টাকা এবং লোড আনলোড বাবদ ২০০ টাকা করে আদায় করছেন কাউন্সিলরের লোকজন। এছাড়া শহীদ বাপ্পী স্মরনীতেও চলছে ট্রাক থামিয়ে লোড আনলোড। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক ট্রাক পার্কিং করে চলছে লোড আনলোড। যেখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর মেয়র অনুগামীরা ট্রাকস্ট্যান্ড ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় নিতাইগঞ্জ এলাকাতেও ভেঙ্গে পড়েছে নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা। এখন দিনের বেলাতেই শুধু নিতাইগঞ্জেই নয় পূর্বের ন্যায় নিমতলীতেও রাস্তার দুই পাশে গাড়ি পার্কিং করে লোড আনলোডের কার্যক্রম চলছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, কাউন্সিলরের অনুগামী হিসেবে পরিচিত স্বপন, রাজু, শফিকুল ও রতন প্রধান দিনের শিফটে কাজ করেন। রাতের শিফটে কাজ করেন আরো ৪ জন। দিনে ডিউটির জন্য তাদেরকে দৈনিক ১ হাজার টাকা এবং রাতে যারা ডিউটি করেন তারা পান এক হাজার ২০০ টাকা করে। তারা ট্রাক প্রতি ৩০০ টাকা এবং লোড আনলোড বাবদ ব্যবসায়ীদের থেকে ২০০ টাকা করে নিচ্ছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০-৭০টি ট্রাক থেকে শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন সড়কে লোড আনলোড করা হচ্ছে। যা থেকে প্রতিদিন তাদের চাঁদা আদায় হচ্ছে কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া বিকে রোডেও ট্রাক থামিয়ে চলছে লোড আনলোড কার্যক্রম।

এদিকে ওই মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড ও চাঁদাবাজির বিষয়ে কাউন্সিলর কবির হোসাইন নিরব থাকলেও কয়েকটি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন আটা ময়দা মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। সাধারণ সম্পাদক তার বিবৃতিতে মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড  ও চাঁদাবাজির বিষয়টি অস্বীকার করলেও আটা ময়দা মিল মালিক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন ওরফে গম জসিমের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি জানান, শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ে লোড আনলোডের বিষয়ে তারা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে মৌখিকভাবে আবেদন জানালে মেয়র আইভী তাদেরকে বলেছেন যদি কাউন্সিলর কবির হোসাইন সম্মতি দেন এবং কোন ধরনের যান চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি না ঘটে তাহলে শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ে তারা লোড আনলোড করতে পারবেন।

নাসিকের কাউন্সিলর ও ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি শফিউদ্দিন প্রধানের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি জানান, নিতাইগঞ্জে শুধু খালঘাটে (বোটখাল) লোড আনলোড করার বিষয়ে এমপি সেলিম ওসমান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। আমরা সকাল ৯টার পর থেকে পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনাল থেকে ৩০টি করে ট্রাক ছেড়ে থাকি। তবে কে বা কারা বিভিন্ন সড়ক দিয়ে ট্রাক প্রবেশ করিয়ে শীতলক্ষ্যা পুল মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে লোড আনলোড করাচ্ছে। ইতিমধ্যে এলাকাবাসীসহ গণমান্য ব্যক্তিবর্গরা মুঠোফোনে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু ব্যাক্তিগত ব্যস্ততার কারণে আমি সরেজমিনে নিতাইগঞ্জে যেতে পারিনি। তিনি আরো বলেন, মিল মালিক সমিতির কারসাজিতেই নিতাইগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ড নিয়ে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। তাদের কারণে নিতাইগঞ্জ শীতলক্ষ্যাবাসী অস্বস্তিতে রয়েছে। তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে এই অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড ও চাঁদাবাজির সঙ্গে কে বা কারা জড়িত। তবে এই চাঁদাবাজির সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক কেউ জড়িত নয়। আমি এ বিষয়টি নিয়ে নাসিকের মেয়র, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে শীঘ্রই কথা বলবো।

এদিকে স্থানীয় এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শীতলক্ষ্যা পুল মোড়ে মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড বসানোর কারণে ক্ষুব্দতা বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন গণমান্য ব্যক্তিবর্গ সিটি মেয়রের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে নালিশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া যদি মিনি ট্রাকস্ট্যান্ড অপসারণের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করে তাহলে সম্মিলিতভাবে এলাকাবাসী ট্যাক্স প্রদান বন্ধকরা সহ কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হবেন বলে জানা গেছে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও