৪ আশ্বিন ১৪২৫, বৃহস্পতিবার ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

গোগনগরে সিমেন্ট কারখানা ও বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রন নিয়ে উত্তেজনা


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫৯ পিএম, ১৩ জুন ২০১৮ বুধবার


গোগনগরে সিমেন্ট কারখানা ও বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রন নিয়ে উত্তেজনা

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নে বিভিন্ন সিমেন্ট কারখানার ব্যবসা ও বালুর ব্যবসা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের বিরোধ তুঙ্গে রয়েছে। এছাড়াও জমি দখল, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ, বিভিন্ন সেক্টর দখল নিয়ে আধিপত্যের লড়াইয়ে প্রায়শই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা। যাতে বিতর্কের বেড়াজালে রয়েছেন গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের বেশীরভাগ জনপ্রতিনিধিই। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে তারা একদিকে যেমন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন তেমনি শক্তিমত্তার লড়াইয়েও বিতর্কে বিধছেন।

সম্প্রতি দুইপক্ষের বিরোধের জের ধরে বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে যাতে বিরাজ করছে উত্তেজনা। এর আগে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের জের ধরে একাধিক হত্যাকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে। যে কারণে আবারো বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এবং হত্যাকান্ডের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেনা এলাকাবাসী।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নটি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা। গোগনগরের পাশের ইউনিয়নটি হচ্ছে মুক্তারপুর। আর গোগনগর ইউনিয়ন ও মুক্তারপুর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় রয়েছে বেশ কিছু সিমেন্ট কারখানা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শাহ সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, মেট্রো সিমেন্ট, ক্রাউন সিমেন্ট, আল্ট্রাটেক সিমেন্ট। আর এই সিমেন্ট কারখানাগুলোর ওয়েস্টেজসহ বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারী ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করাকে কেন্দ্র করে প্রায়শই ঘটছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা।

২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর মেট্রো সিমেন্টের লেবার ঠিকাদারী নিয়ে বিরোধের জের ধরে ঠিকাদার জসিমকে একটি কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে ডেকে এনে ৫ জন মিলে দৌলত মেম্বারের মালিকানাধীন সমরাট ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডার্স অফিসের ২য় তলায় নিয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। আর লাশটি গুম করার পরিকল্পনা করে রুমের দরজা আটকে রাখে। পরে ২৭ ডিসেম্বর জসিমের ব্যবহৃত মোবাইলটি চর সৈয়দপুর এলাকার সাবেক মেম্বার দৌলত হোসেনের অফিসের একজন বাক প্রতিবন্ধী কর্মচারীর কাছ থেকে উদ্ধার করে নিহতের পরিবারের লোকজন। পরে ওই প্রতিবন্ধীর দেয়া তথ্যমতে চর সৈয়দপুরে দৌলত মেম্বারের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সমরাট ট্রান্সপোর্টের ২য় তলার একটি কক্ষ থেকে জসিমের জবাই করা লাশ উদ্ধার করা হয়। এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ লোকজন সাবেক মেম্বার দৌলত হোসেনের বাড়িতে আগুন অগ্নিসংযোগ করে ও বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ময়না বেগম বাদী হয়ে দৌলত মেম্বার ও তার ছেলে সমরাট সহ ৫ জনের নাম উল্লেখ করে ১১ জনের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। ৩১ ডিসেম্বর কিলিং মিশনে থাকা আমিনুল হক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পরে মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ দৌলত মেম্বারের ছেলে মামলার দ্বিতীয় আসামী কাশেম আহম্মদ ওরফে সমরাটকে ঢাকার চকবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। এর ওই বছরের ৭ এপ্রিল শুক্রবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় কৃষকলীগ নেতা দৌলত মেম্বারকে। গ্রেফতারকৃত দৌলত জেলা কৃষকলীগের সহসভাপতি পদে রয়েছে। এছাড়া একসময়ে সে ডাকাত সর্দার হিসেবে পরিচিত ছিল।

এদিকে সিমেন্ট কারখানা ছাড়াও বালুর ব্যবসা ও জমি দখল নিয়েও বেপরোয়া গোগনগর এলাকার ক্যাডাররা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠপট্টি এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর পূর্ব তীরে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে ভরাটকৃত প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট এলাকা অবমুক্তের মাধ্যমে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে শুরু হওয়া অভিযানে বাধা দেয় ভরাটকারীরা। অভিযানের দ্বিতীয় দিনে বিআইডব্লিউটিএ নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের একটি টিম এক্সাভেটর (ভেকু) ও ড্রেজারের মাধ্যমে ভরাটকৃত অংশ অপসারণ করতে গেলে দখলদার ও ভরাটকারী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার নূর হোসেন, গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওশেদ আলীর পুত্র কাশেম এবং আলী আহাম্মদ বেপারীর নেতৃত্বে তাদের লোকজন বাধা দেয়। এসময় তাদের অনুগামী সন্ত্রাসীরা ওই এলাকায় অস্ত্র সহকারে মহড়া দেয় বলেও জানা গেছে।

ওই এলাকা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার নূর হোসেন ও গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওশেদ আলীর পুত্র কাশেমের নেতৃত্বে এবং কিছু অংশে আলী আহাম্মদ বেপারী ভরাট করে ডকইয়ার্ড নির্মাণ করেছেন। তবে গত ২২ মে জলাশয় আইনকে ভঙ্গ করে ধলেশ্বরী নদীর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠপট্টি খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় নদীর পূর্ব তীরে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে নদীর প্রায় ১০ হাজার বর্গফুট এলাকা ভরাট করে অবৈধভাবে দু’টি ডকইয়ার্ড গড়ে তোলায় আলী আহাম্মদ বেপারীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং ২ মাসের মধ্যে ভরাটকৃত অংশ সরিয়ে নদীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় বেঁধে দেয় ভ্রাম্যমান আদালত। বিআইডব্লিউটিএ`র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম বানু শান্তির নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। এদিকে ওই অভিযান পরিচালনার সময় এর আগে বাধা প্রদানকারী গোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড মেম্বার নূর হোসেন ও তার অনুগামীদের ডকইয়ার্ড এলাকায় দেখা গেলেও পুলিশ ও আনসার সদস্যরা উপস্থিত থাকায় তাদের তৎপরতা তেমন একটা দেখা যায়নি। তবে এর কিছুদিন পরেই আলী আহাম্মদ বেপারীর বিরুদ্ধে তাদের জমি দখলের অভিযোগ করেন কতিপয় ব্যক্তি। এলাকাবাসী জানান, মুক্তিযোদ্ধা জুলহাস মাতবরের ৪২ শতাংশ, জোহরা খাতুন ও হালিমা খাতুনের ১২০ শতাংশ জমি দখল করে আছেন আলী আহাম্মদ বেপারী। অপর দিকে জমির বায়না সুত্রে মালিক নুর হোসেন সওদাগর, মিলন মিয়া বলেন,আমরা উল্লেখিত ব্যক্তিদের নিকট ১৬২ শতাংশ জমির বায়না করেছি। সম্প্রতি এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতন্ডা হয়। এ সময় আলী আহাম্মদ বেপারী তার লোকজন জড়ো করলে উভয় পক্ষের মধ্যে উক্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সদর মডেল থানার এসআই সামসুল ঘটনাস্থলে সঙ্গীয় ফোর্স সহ পৌছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসেন।

এদিকে গত ৩১ মার্চ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের চর সৈয়দপুরে প্রিমিয়ার সিমেন্টের জমিতে বালু ভরাটকে কেন্দ্র করে গোগনগর ইউপি চেয়ারম্যান নওশেদ আলী ও সাবেক মেম্বার দৌলত গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা প্রশমিত হলেও বিরোধ এখনো তুঙ্গে রয়েছে। ঘটনার পর আহত বাবু চিকিৎসা শেষে সদর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেয়ায় সাবেক দৌলত মেম্বারের ছেলে ও তার লোকজন এ হামলা করে। লিখিত অভিযোগে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, গত এক বছর ধরে প্রিমিয়ার গ্রুপের জমিতে বালু ভরাট কাজ করছিল নওশেদ আলীর সমর্থক বাবু সোহেল রানাসহ আরো কয়েকজন। কয়েকদিন ধরে দৌলত মেম্বারের ছেলে কাশেম ওরফে সমরাটের নেতৃত্বে জুলহাস, চাঁনবাদশা, সাবের আলী, আলী আকবর, সুমন সরদার, বাবু ও রিফাত মিলে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। শনিবার বেলা ১১ টার দিকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নওশেদ আলী চর সৈয়দ পুর এলাকায় যায় মিমাংসা করার জন্য। এসময় দৌলত মেম্বারের লোকজন বর্তমান চেয়াম্যান নওশেদ আলী ও তার লোকজনের উপর হামলা করে। তাদের হামলায় চেয়ারম্যানসহ ৫ জন আহত হয়। মামলার আসামীদের মধ্যে রয়েছে গোগনগর ইউপি’র সাবেক মেম্বার দৌলত মিয়ার পুত্র জসিম হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী কাশেম সমরাট, চেয়ারম্যান নওশেদ আলী হত্যা প্রচেষ্টা মামলার আসামী তার সেকেন্ড এন্ড কমান্ড আক্কেল আলীর পুত্র চান বাদশা, মৃত আকরাম আলী সরদারের পুত্র গোগনগর ইউপির ৯নং ওয়ার্ড মেম্বার জুলহাস মাদবর, দৌলত মিয়ার পুত্র ফয়সাল, কামাল, খায়ের বাদশা, আলী আকবর, সুমন সরদার, মোঃ বাবু, আওলাদ, রুপম, রিফাত, সিফাত সহ অজ্ঞাত নামা ৭ থেকে ৮ জন সন্ত্রাসী।

এদিকে সিমেন্ট কারখানার ঠিকাদারী ব্যবসা নিয়ে বিরোধে গত ৯ জুন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের চর সৈয়দপুরে সন্ত্রাসী কাশেম সমরাট বাহিনী কর্তৃক শাকিলকে অপহরণ করে নিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে ও কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আব্দুর রহমান ট্রান্সপোর্টের মালিক মোঃ সোহেল বাদী হয়ে কাশেম সমরাটকে প্রধান আসামী করে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা (নং ৩৩) দায়ের করেছে।

মামলার বিবরনে বাদী পুরান সৈয়দপুর এলাকার জলিল মিয়ার পুত্র মোঃ সোহেল উল্লেখ করেন, চর সৈয়দপুর কাঠপট্রি এলাকায় আব্দুর রহমান ট্রান্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। উক্ত ট্রান্সপোর্টে প্রতিদিন সিমেন্ট, কয়লা, পাথর ও সিলেকশন বালু লোড আনলোড হয়। উক্ত এলাকার দুস্কৃতিকারী কাশেম সমরাট ও তার বাহিনী প্রায় সময় বাধা প্রদান করতো। আমার ছোট ভাই রানা প্রতিবাদ করলে হুমকি দিত। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ জুন রাত সাড়ে ১১ টায় বাদীর দোকানের কর্মচারী মোঃ শাকিল কাজ করাকালীন সন্ত্রাসী চর সৈয়দপুর এলাকার দৌলত মেম্বারের পুত্র কাশেম সমরাট ও ফয়সাল, রুস্তমের পুত্র সাইফুল, আবুল মেম্বারের পুত্র বিজয় ও শাহ পরান, জুলহাস মেম্বারের পুত্র সুমন সরদার ও তাওলাদ সরদার, মৃত আক্কেল আলীর পুত্র চান বাদশা,খায়ের বাদশা ও আলী আকবর, আব্দুস সাত্তারের পুত্র রুপম, রিফাত ও লিটন, কেরামত আলীর পুত্র মোকসেদুল, আব্দুল রবের পুত্র বাবু,হাজ্বী আনসার আলীর পুত্র জ্বীন কামাল সহ অজ্ঞাত নামা ৮/৯ জন সন্ত্রাসী দা, রামদা, কিরিচ, লাঠি লোহার রড সহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ছোট ভাই রানাকে খোঁজ করে। কর্মচারী শাকিল কারন জানতে চাইলে কাশেম সমরাট হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো কিরিচ দিয়ে মাথায় কোপ মারে। হাত দিয়ে নিজেকে রক্ষা করলে হাতে কোপ লাগে। ফয়সাল শাকিলের কাছে থাকা ২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, মোবাইল সেট, অফিসের জিনিসপত্র ভাংচুর করে যার মূল্য ২ লাখ টাকা ক্ষতি সাধন করে। এ সময় সাইফুল, বিজয় ও শাহ পরান ক্যাশ বাক্স ভাংচুর করে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে সদর মডেল থানার ওসি কামরুল ইসলাম জানান, গোগনগরের সংঘর্ষের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার আসামীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোকনা কেন তাদেরকে ছাড় নেই।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

অর্থনীতি -এর সর্বশেষ