৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, মঙ্গলবার ২০ নভেম্বর ২০১৮ , ৬:২০ অপরাহ্ণ

rabbhaban

একই অফিসে দু’টি সমিতি চালাচ্ছিল প্রতারক চক্র


সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:০৩ পিএম, ৪ নভেম্বর ২০১৮ রবিবার


একই অফিসে দু’টি সমিতি চালাচ্ছিল প্রতারক চক্র

নারায়ণগঞ্জে সমবায় সমিতির নামে ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়া একটি প্রতারক চক্র একটি অফিসে দুই নামে দু’টি সমবায় সমিতি চালাচ্ছিল। মার্কেটের বাহিরের সাইনবোর্ডে আদর্শ মডার্ন মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড সাটানো থাকলেও ভেতরে অফিসের প্রবেশপথের উপর সাটানো ছিল মডার্ন মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড। জেলা ও সদর উপজেলা সমবায় অফিসের একাধিক কর্মকর্তার যোগসাজশে ওই প্রতারক চক্রটি গ্রাহকদের দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে।

জানা গেছে, হাবিবুর রহমান, রুহুল আমিন হাওলাদার, সাজেদা আইরিন এনি, নাসিমা আক্তার, মজিবুর রহমান হাওলাদার, মীর্জা নুরুল আমিন নামের একটি প্রতারক চক্র প্রথমে মডার্র্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে একটি সমবায় সমিতির রেজিষ্ট্রেশন নেন। পরে ওই চক্রটিই আবার ২০১১ সালে আদর্শ মডার্র্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে অপর একটি সমবায় সমিতির রেজিষ্ট্রেশন নেন। তারা শহরের শহরের চাষাঢ়া পানোরমা প্লাজার ষষ্ঠ তলায় অফিস নিলেও তাদের রেজিষ্ট্রেশন নেয়ার ক্ষেত্রে অফিসের ঠিকানা উল্লেখ ছিল শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু সড়ক (বিবি রোড)। ওই প্রতারক চক্রটি পানোরমা প্লাজার বাহিরের দিকে আদর্শ মডার্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাইনবোর্ড লাগালেও তাদের অফিসে প্রবেশমুখের উপর লাগিয়েছিল মডার্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাইনবোর্ড। সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ২৪ মার্চ আদর্শ মডার্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের (নিবন্ধন নং ১০১) অনুমোদনের ক্ষেত্রে সকল কাগজপত্র সম্পাদন করিয়ে দিয়েছিলেন জেলা সমবায় অফিসের পরিদর্শক আলমগীর যিনি কয়েকদিন আগে পাগলায় গ্রাহকদের হাতে অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ওই সমিতির পরিদর্শক হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন। সমিতির রেজিষ্ট্রেশন নেয়া প্রতারক চক্রের সকলেই বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা। অথচ নিয়মানুযায়ী কোন সমিতির রেজিষ্ট্রেশন পেতে হলে সমিতির সদস্যদের ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। কিন্তু সেই নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে বাহিরের জেলার বাসিন্দাদের রেজিষ্ট্রেশন দিয়েছেন অসাধু সমবায় কর্মকর্তারা। পরিদর্শক আলমগীরের পরে সমবায় সমিতিটিতে দীর্ঘদিন ধরেই অডিটের দায়িত্বে ছিলেন সদর উপজেলার সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক নাসির উদ্দিন। তিনিও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ওই সমিতির অডিটের দায়িত্বে ছিলেন।

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানান, নিয়মানুযায়ী কোন সমবায় সমিতিতে কোন পরিদর্শক কিংবা সহকারী পরিদর্শক নিয়মিত পরিদর্শন করতে পারেন না। কিন্তু নিয়মের ব্যতয় ঘটিয়ে পরিদর্শক আলমগীর ও সহকারী পরিদর্শন নাসিরউদ্দিন বারংবার ভুয়া অডিটের মাধ্যমে প্রতারক চক্রকে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছেন। কোন সমিতি যদি ব্যাংকিং প্রথা অর্থাৎ সদস্যদের থেকে এফডিআর গ্রহণ করে তাহলে সেই অর্থের ২৫ ভাগ ব্যাংকে জমা রাখার বিধান রয়েছে। কিন্তু সমিতির অডিটকারী অফিসাররা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ওইসকল বিষয় এড়িয়ে গেছেন। এছাড়া কোন ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা অকার্যকর হলে সেটা জেলা ও উপজেলা সমবায় অফিসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো। কিন্তু দীর্ঘ ৭ বছর ধরে পরিদর্শক আলমগীর ও সহকারী পরিদর্শন নাসিরউদ্দিন ওই সমিতিটি পরিদর্শন করে গেলেও তারা এ বিষয়ে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেননি। গত ৬ মাস ধরে সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পদে নাজমুল হুদা আসলেও তিনিও বিভিন্ন সমিতিতে থাকা অনিয়মের বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেননি। এমনকি বিভিন্ন মাধ্যমে ওই সমিতির কয়েকজন সদস্য সমিতিটির অনিয়মের বিষয়ে তাকে অবহিত করলেও তিনি তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। কোন সমিতি প্রতারণা করলে উপজেলা সমবায় অফিস থেকে মামলা দায়ের করার কথা। কিন্তু সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নাজমুল হুদা মামলা দায়েরতো দূরের কথা কোন ধরনের পদক্ষেপও নেননি।

এদিকে ওই প্রতারক চক্র সমবায় সমিতির নামে গ্রাহকদের ২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ৩১ অক্টোবর সকালে ভুক্তভোগী গ্রাহক সালাহউদ্দিন খন্দকার নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, তিনি, আসমা, ডলিসহ গ্রাহকদের কাছ থেকে শতকরা ১৬শতাংশ মুনাফা দেয়ার কথা বলে নারায়ণগঞ্জ মডার্ন মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোহাইটি লিমিটেড খুলে হাবিবুর রহমান হাওলাদার, নাসিমা আক্তার, রুহুল আমিন হাওলাদার, এনি আক্তার ২কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মালিকদের সকলেই বাগেরহাট জেলার বাসিন্দা। ২ কোটি টাকা নেয়ার পর শহরের চাষাঢ়া পানোরমা প্লাজার ষষ্ঠ চলায় অফিস নিয়ে তারা ৮ মাস ধরে গ্রাহকদের মুনাফা দেয় এবং আরো মূলধন সংগ্রহ করে। পরে গত ৪ অক্টোবর সকালে অফিস বন্ধ করে তারা সকলেই উধাও হয়ে যায় এবং তাদের সাথে যোগাযোগের কোন মাধ্যমই রাখেনি। দ্রুত তাদেরকে আইনের আওতায় এনে গ্রাহকদের অর্থ আদায়ের জন্য অভিযোগে উল্লেখ করে ভুক্তভোগীদের পক্ষে সালাহউদ্দিন।

প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা সমবায় অফিসের কতিপয় অসাধু ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশেই ভিন্ন জেলার বাসিন্দারা ভুয়া সমিতি খুলে একের পর গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গত কয়েক বছরে শতাধিক সমবায় সমিতি শুধুমাত্র সদর উপজেলা এলাকা থেকে উধাও হয়েছে। যাতে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দারা হারিয়েছে কয়েক শতকোটি টাকা। সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হলেও অসাধু ও দুর্নীতিবাজ সমবায় কর্মকর্তারা জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিক বনে গেছেন।

এ বিষয়ে জানতে সদর উপজেলার সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক নাসির উদ্দিনের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি জানান, সেখানে একটি ইন্সুরেন্স বন্ধ হয়ে গেছে বলে আমি শুনেছি। আমাদের সাথে কোন আর্থিক সম্পর্ক নেই তাদের, এসব অভিযোগ মিথ্যা। মাল্টিপারপাসে মানুষ অতি লোভে পড়ে মুনাফার আশায় টাকা দিয়ে লাভ খেতে গিয়ে এমন বিপদে পড়ে। একটা ব্যাংক থেকে লোন নিতে কত কাগজপত্র লাগে আর মাল্টিপারপাসে গেলেই টাকা পাবে এমন আশায় তারা সেখানে গিয়ে বিপদে পড়ে। তিনি জানান, এক বছর অডিট না হলে এমনিতেই মাল্টিপারপাস থাকেনা। আমরা নিয়মিত অডিট করি তবে এটার কথা আমার জানা নেই। গ্রাহকদের কাছ থেকে এমন কোন অভিযোগও আমরা পাইনি।

জেলা সমবায় অফিসের পরিদর্শক আলমগীরের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান, তাদের কাছে এ বিষয়ে কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিবেন।

জেলা সমবায় অফিসার আখিরুল আলম জানান, কোন সমবায় সমিতি গ্রাহকদের অর্থ নিয়ে উধাও হয়েছে এমন অভিযোগ তাদের কাছে কেউ করেনি। অন্য জেলার বাসিন্দারা ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে সমিতির অনুমোদন কিভাবে নিচ্ছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন সমিতির রেজিষ্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সাধারণত স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বার ও কাউন্সিলরদের সত্যায়নের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে থাকে। অন্য উপজেলার বাসিন্দারা আরেক উপজেলা থেকে নেয়ার নিয়ম নেই। তিনি নতুন এসেছেন এসকল বিষয়ে তিনি খোঁজ খবর নিবেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

অর্থনীতি -এর সর্বশেষ