২৯ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮ , ১:৩৯ অপরাহ্ণ

UMo

কালীরবাজারে প্রাচীন পেশার বেহাল দশা


সোহেল রানা, স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:০৬ পিএম, ৫ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার


কালীরবাজারে প্রাচীন পেশার বেহাল দশা

প্রাচীন এক পেশা হচ্ছে স্বর্ণ দিয়ে গয়না তৈরী করা। এ কাজে প্রয়োজন অসাধারণ দক্ষতার। যে দক্ষতা অর্জন করতে সময় লাগে পাঁচ থেকে দশ বছল। কারিগর তার দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ হাতের নিপুণতা এবং দক্ষতায় তৈরী করেন নান্দনিক সব ডিজাইনের গহণা। যা শোভা পায় নারীদের অঙ্গে। এসব গহণা বাড়িয়ে দেয় নারীর সৌন্দর্য।

এক সময় স্বর্ণ দিয়ে গহণা তৈরীতে শুধু স্বর্ণ শিল্পীর হাতের ছোঁয়ার উপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে এই পেশাতেও লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। এখন স্বর্ণের গহণা তৈরীতেও ব্যবহার হচ্ছে নানান ধরণের যন্ত্র। যন্ত্রের ব্যবহার যেমন কাজকে সহজ করেছে তেমনি বিপাকেও ফেলেছে তাদের। একদিকে যেমন কমেছে স্বর্ণের চাহিদা তেমনি বেড়েছে আমদানি করা গহণা বা রেডিমেট গহণার ব্যবহার। ফলে কাজের পরিমাণ কমেছে অনেক। এতে বিপাকে পড়েছেন স্বর্ণ শিল্পীরা।

কালীরবাজার স্বর্ণপট্টিতে স্বর্র্ণ ব্যবসায়ী ও স্বর্ণ শিল্পীদের মাধ্যমে জানা যায় আগের তুলনায় কারিগর কমেছে কয়েক গুণ। কাজ শিখতে যে সময় লাগে সে তুলনায় আয় হচ্ছে না তাদের। ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই এই পেশা ছাড়তে হচ্ছে তাদের। নতুন করে কেউ আর এই পেশায় আসতে চায় না। এখন যারা এই পেশার সাথে যুক্ত আছেন তারা সকলেই পুরাতন কারিগর। যাদের অধিকাংশই বংশপরম্পরায় এই পেশার সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন এই পেশা এতটাই মন্দা যে, কোনো শিল্পীই আর পরিবারের কাউকে এই পেশায় যুক্ত করতে চান না।

দেশে এই পেশার মানুষদের কাজের পরিমাণ কম থাকলেও বিদেশে কারিগরদের বেশ ভালো চাহিদা রয়েছে বলে জানান তারা। বিশেষ করে দুবাই, বাহারাইনের মত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এর ব্যপক চাহিদা রয়েছে। তবে এই পেশার জন্য সরকারিভাবে কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় সেই সুযোগও কাজে লাগাতে পারছেন না তারা। তাবে যাদের টাকা আছে তারা টাকা খরচ করে বিদেশ যাচ্ছেন। অন্যরা হয় এইভাবেই কাজ করে যাচ্ছেন নয়তো পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশার সাথে যুক্ত হচ্ছেন।

নিজেদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় কালীর বাজারের হৃদয় স্বর্ণ শিল্পালয়ের কারিগর গৌরাঙ্গ পালের সাথে। প্রায় ১২ বছর ধরে এই মার্কেটে কাজ করছেন তিনি। হাতের বালা বা চুড়িতে ডিজাইন করেন তিনি। নিউজ নারায়ণগঞ্জকে তিনি জানান, এই পেশায় বিভিন্ন ধাপ আছে। যেমন আমি হাতের বালা বা চুড়ীতে ডিজাইন করি। তেমনি অন্য একজন বালা গোল করে দেয়। আমার কাজ শেষ হলে অন্য একজন পালিশ করবে। সর্ব শেষ বালার ভিতরে ছাচ ভরবে।

তিনি বলেন, ‘‘আমার এই ডিজাইনের কাজ শিখতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগেছে। আমার বড় ভাই এই কাজ করে। তার মাধ্যমেই এই পেশায় আসা। মাত্র ২ বছর হইছে আমি কাজের বিনিময়ে টাকা পাই। ১০ বছর শুধু কিছু খরচ দিতো। ১২ বছর পর এখন দেখছি এই পেশার খুবি বেহাল অবস্থা। ১০ বছর শ্রম দিয়ে কাজ শিখলাম, এখন ছাড়তেও পারি না। যে কাজ পাই তা খুবি সামান্য। খেয়ে পড়ে কোনো ভাবে বেঁচে থাকার মত অবস্থা।’’

কালীর বাজার স্বর্ণ শিল্পী ইউনিয়নের সভাপতি অরুণ কুমার দত্ত নিউজ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ৪০ বছরেরও অধিক সময় ধরে এই পেশার সাথে যুক্ত আছি। বংশপরম্পরায় এই পেশা পেয়েছি। আগে প্রচুর কাজ হতো। কিন্তু এখন চাহিদা অনেক কম। ফলে আমাদের অবস্থাও খুব একটা ভালো না।

এসময় তিনি আরো বলেন, এই মার্কেটে এক সময় অনেক কারিগর ছিল। এখন অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। অনেকেই এখন দিগুবাবুর বাজারে সবজি বিক্রি করেন। আবার অনেকেই গার্মেন্টস লাইনে ঢুকে গেছে। বর্তমানে যে আয় তাতে এই পেশায় টিকে থাকা খুব কঠিন।

এই পেশায় মনে হয় আমরাই হাতে তৈরী করার কারিগরের শেষ প্রজন্ম। আমাদের পরে মনে হয় আর কেউ এই পেশায় আসবে না। ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে গহণা তৈরী করতে কম করে হলেও দুই দিন সময় লাগে। আর দুই দিন বা তার বেশি সময় কাজ করে কারিগররা ৫০০-৮০০ টাকা মজুরি পায়। অথচ সাধারণ লেবারের মজুরিও দৈনিক ৫০০ টাকার কম না। অথচ তাদের কাজ মিখতে হয় না। আর আমাদের কাজ শিখতে সময় লাগে কম করে হলেও ৫ বছর। কারোকারো ৮-১০ বছর সময় লাগে।

কাজের পরিমাণ কম কেন জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের দেশে গহণা বাইরে থেকে আসে। কিন্তু আমাদের দেশের গহণা বাইরে যায় না। ফলে আমাদের কাজের পরিমাণ খুব কম।

এসময় তিনি আরো জানান, যদি আমাদের তৈরী গহণা বিদেশে রপ্তানি করা যায় অথবা আমাদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করে যে দেশগুলোতে কারিগরের চাহিদা রয়েছে সেই দেশে পাঠানো যায় তাহলে দেশের এবং আমাদের দুই এরই উন্নয়ন সম্ভব।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

অর্থনীতি -এর সর্বশেষ