ভোটের আগে উত্তাপ নারায়ণগঞ্জে পোশাক শিল্পে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৮ পিএম, ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার



৩ ডিসেম্বর বিসিকের সংঘর্ষের একটি চিত্র।
৩ ডিসেম্বর বিসিকের সংঘর্ষের একটি চিত্র।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জের পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। পরপর কয়েকটি ঘটনায় শ্রমিকদের রণমূর্তি অতঙ্কিত করে তুলেছে গোটা নারায়ণগঞ্জকেই। তবে সব কর্মকান্ডে বহিরাগত শ্রমিকনেতাদের ইন্ধন থাকে বলে দাবি করেন শ্রমিক নেতারা। তবে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোর ভূমিকায় রয়েছেন পুলিশ প্রশাসন। তবে এধরনের কোন ঘটনা যেন আর না ঘটে সেই প্রত্যাশা পোশাক কারখানার মালিক সংগঠনের নেতাদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলিত বছরের শেষে দিকে এখনও পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ ৪টি ইস্যুতে শ্রমিকেরা আন্দোলন করেছেন। ফলে যেমন গাড়ি ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ সহ পুলিশ শ্রমিক সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েক শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ ছিল যানবাহন। ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।

৫ ডিসেম্বর বুধবার সকালে উৎপাদন মজুরী বৃদ্ধির দাবিতে বিসিকের ‘এন আর গার্মেন্টস’ নামে কারখানার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করে। এতে করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও মুক্তারপুর সড়কের তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়।

শ্রমিকেরা জানান, ফকির অ্যাপারেলসের মতোই এনআর গার্মেন্টের শ্রমিকেরা অত্যাধুনিক মেশিনের উৎপাদন মজুরী বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে মালিকপক্ষ এতে অস্বীকার জানালে বুধবার সকালে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ওইসব কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহীন জানান, ফকির অ্যাপারেলসে শ্রমিকেরা একটি চায়না মেশিনে কাজের মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল। তেমনি ভাবে বুধবার এনআর গার্মেন্টস শ্রমিকেরা দাবি জানিয়ে আন্দোলন করে। পরে মালিকপক্ষ আশ্বাস দিলে শ্রমিকেরা শান্ত হয়ে কাজে ফিরে যায়।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের বলেন, বুধবার সকালে এনআর গার্মেন্টস শ্রমিকেরা একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এসময় অন্য গার্মেন্টস থেকেও শ্রমিকদের বের করতে চেষ্টা করলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তবে মালিক পক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে শ্রমিকেরা শান্ত হয়ে চলে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যায়।

একই দাবিতে গত ৩ ডিসেম্বর ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীর ফকির অ্যাপারেলস কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষে আহত হয় অর্ধশতাধিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়ন করতে হয় অতিরিক্ত পুলিশ।

ফকির অ্যাপারেলস কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলন হলেও ওইদিন ভাঙচুর করা হয় আরো ১৫ থেকে ২০টি পোশাক কারখানা। রাস্তা পার্কিং করে রাখা মালবাহী যানবাহনের পাশাপাশি কারখানার ভিতরে থাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। তবে ফকির অ্যাপারেলসের বাইরে গিয়ে অন্য পোশাক কারখানায় হামলার ঘটনাকে বহিরাগত শ্রমিক নেতাদের ইন্ধনে হয়েছে দাবি করেছেন পোশাক কারখানা মালিক কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক নেতারা। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর মূল হোতাকে শনাক্ত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

এর আগে গত ৩১ আগস্ট বুধবার বিকেলে ফতুল্লার কাঠেরপুর এলাকার ‘মেট্রো নিটিং অ্যান্ড ডাইং’ কারখানায় ভূত আছড়ের ভূয়া অভিযোগ তুলে শ্রমিকদের মধ্যে আতংক দেখা দেয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ সেখানে যায় ও গার্মেন্টসটি ছুটি ঘোষণা করে।

২৪ অক্টোবর বিসিকের ফেম অ্যাপারেলস নামে পোশাক কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুতে বিক্ষোভ শুরু করে সহকর্মীরা। এসময় শ্রমিকেরা কারখানা ভাঙচুর সহ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে।

২২ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে ‘সোয়াদ ফ্যাশন’ নামে রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকেরা বেতন বোনাস সহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করে। এতে ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর ও একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহীন বলেন, শ্রমিকেরা কখনো আন্দোলনে যেতে চায় না। তারা তাদের ন্যায পাওনা পেলেই খুশি। যখন না পায় তখনই আন্দোলন করে। কিন্তু কখনো কারখানার বা কোন সম্পদের ক্ষতি করে না। যারা এগুলো করে তারা সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে গিয়ে বহিরাগতরা করে।

বিকেএমইএ এর সাবেক সহ সভাপতি ও বিসিক গার্মেন্ট মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পেছন থেকে কেউ ইন্ধন দিয়ে ফকির অ্যাপারেলসে ভাঙচুর করিয়েছে। কেউ না কেউ এটার সঙ্গে জড়িত। ধারণা যেসব শ্রমিক নেতার বিসিকে প্রবেশ করা নিষেধ তারাই এখানে হামলা করেছে। আমরা এ ধরনের কর্মকান্ড দেখতে চাই না।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-৪ নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকেরা মূলত কম শিক্ষিত। আবার অনেক আছে শিক্ষিত না সেজন্য বেতন বৃদ্ধি নিয়ে ঝামেলা হয়। একজন শ্রমিকের বেতন বেশি বাড়ে অন্যজনের কম। কিন্তু এটা বাড়ে তাদের স্কেল অনুযায়ী। এটাই শ্রমিকেরা মেনে নিতে চায় না। তবে আমরা শ্রমিকদের এ বিষয়গুলো ভালো ভাবে বুঝাতে চেষ্টা করছি। এছাড়া আজও বুধবার এনআর শ্রমিকদের এগুলো বুঝানোর মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এ শ্রমিকদের পিছনেও শ্রমিক নেতাদের গডফাদার ও দুষ্টু প্রকৃতির লোক রয়েছে। যারা চায় এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে স্বার্থ হাসিল করতে। কিন্তু এগুলোও আমাদের কঠোর নজরদারীতে আছে। নির্বাচনের পর আমরা এগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করবো। তাছাড়া শ্রমিকদের বিষয়ে আমাদের কঠোর নজরদারী রয়েছে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও