ভীত অবন্তীর শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহবান ডিসির

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৭ পিএম, ৭ জানুয়ারি ২০১৯ সোমবার

ভীত অবন্তীর শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহবান ডিসির

জানুয়ারীতে গ্রেড ভিত্তিক বেতন ঘোষণার পর থেকে শিল্প নগরী বিসিকে অবস্থিত ক্রোনি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেডে আন্দোলন শুরু হয়। এর জের ধরেই শ্রমিকদের তিন দিন ধরে চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৭দফা দাবিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে শ্রমিকেরা।

সোমবার ৭ জানুয়ারি দুপুর দেড়টায় অবন্তী ও শাহিল গ্রুপের প্রায় পাঁচ শতাধিক শ্রমিকের উপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক তরিকুল সুজন, রাজনীতি ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান খান রিচার্ড, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহিন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি শুভদেব।

লিখিত স্মারকলিপির উল্লেখিত দাবিগুলো হলো ১. ছাঁটাইকৃত সকল শ্রমিককে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। ২. ৬/১২/২০১৮ তারিখে মালিকের সাথে লিখিত চুক্তি মোতাবেক ঘোষিত ১২হাজার টাকা মজুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। ৩. গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিকদের মুক্তি দিতে হবে ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ৪. প্রডাকশনের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। ৫. কারখানার ভিতর-বাহিরে বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং হামলাকারী সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। ৬. নারী শ্রমিকদের উপর গালিগালাজসহ সকল নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। ৭. বেআইনিভাবে সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে।

স্মারকলিপি গ্রহণ শেষে জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া বলেন, ‘গার্মেন্টের মালিক পক্ষ ও বিকেএমইএ এর সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। সমস্যার অনেকাংশেই সমাধান হয়েছে। বিকেএমইএ এর সভাপতি দেশের বাইরে আছেন। তিনি আসেলে পুরোপুরি সমাধান করা হবে।’

এসময় তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের মঙ্গলবার থেকে কাজে যোগদানের জন্য আহ্বান জানান। তবে মালিক পক্ষের ক্যাডারদের হামলা ও মারধরের ভয়ে শ্রমিকেরা জেলা প্রশাসকের এমন আহ্বানে কিছুটা বিচলিত হয়ে পরেন। শ্রমিকদের দাবি গার্মেন্টে যাওয়ার পর নতুন করে আবার তাদের উপর হামলা হতে পারে। এবং তাদের দাবিগুলোও মেনে নেওয়া হবে না। এমনকি তাদের হত্যাও করতে পারে মালিক পক্ষ। তারা দাবি করেন আগে যাতে সমস্যার সমাধান করা হয় তারপর তারা কাজে যোগদান করবে।

শ্রমিকদের এমন শংকায় একমত প্রকাশ করে শ্রমিক নেতা ইকবাল হোসেন সকলকে শান্ত করেন এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ এবং শ্রমিক নেতাদের উপস্থিতিতেই তাদের গার্মেন্টে ঢুকানো হবে বলে আশ্বস্ত করলে সকলে রাজি হন।

আন্দোলনরত শ্রমিকদের মাধ্যমে জানা যায়, জানুয়ারি হতে গার্মেন্টের বিভিন্ন সেকশনের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু গ্রেডিং সিস্টেমের কারণে গার্মেন্টের হেলপারের বেতনের কাছাকাছি অপারেটর ও আইরন ম্যানের বেতন হয়েছে। যে কারণে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছে। আন্দোলনের শুরুতে গ্রেডিং সিস্টেম ঠিক করে বেতন বৃদ্ধির জন্য আবেদন জানালে উল্টো শ্রমিকদের হুমকি দেওয়া হয় এবং ১০৪৩ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়। পরবর্তিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে।

শ্রমিকদের মাধ্যমে আরো জানা যায়, মালিক পক্ষ প্রথমে অপারেটর এবং আয়রনম্যানের বেতন ১১হাজার থেকে ১২হাজার টাকা পর্যন্ত করার ঘোষণা দিলেও পরবর্তিতে সকলের বেতন ৯হাজার ৫০০টাকা করা হয়। কিন্তু হেলপারদের বেতন দেওয়া হয় ৮হাজার টাকা। যা এই আন্দোলনের অন্যতম কারণ।

বিকেল ৩টা অবধি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান শেষে বিকেলে চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেন তারা। এসময় সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এমএ শাহিন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দুলাল সাহা, গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলার সমন্বয়ক তরিকুল সুজন, রাজনীতি ও শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান খান রিচার্ড, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি শুভদেবসহ অবন্তী কালার টেক্স লিমিটেড এর কয়েক শতাধিক নারী ও পুরুষ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ৬ জানুয়ারি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এর উপ মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে এবং গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএতে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করেছিল শ্রমিকরা।

বিকেএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি ও বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, আমরা কোন শ্রমিককে ঠকাতে চাইনা। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি বছর শ্রমিকদের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিতে হয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিকেএমইএ’র সভাপতি সেলিম ওসমান এমপি শ্রম বান্ধব। শ্রমিকদের আগের মজুরী ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে নতুন ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী ৮ হাজার টাকা করেছেন। এখন দেখা গেছে যেসকল কারখানায় একজন শ্রমিক ৫ বছর ধরেই কাজ করছে তার ইনক্রিমেন্ট অনুযায়ী সে ৮ হাজার ৭০০ টাকা পাওয়ার কথা কিন্তু মালিকপক্ষ তাকে দিচ্ছে ৯ হাজার ২০০ টাকার উপরে। অনেকেই মনে করছেন সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী তার মূল বেতন বাড়েনি কিন্তু সেটা সঠিক নয়। কারণ শ্রম আইন অনুযায়ী ওই শ্রমিকের বেতন প্রতি বছরই ইনক্রিমেন্ট হারে বেড়েছে। দেখা গেছে ৬নং গ্রেডে যে শ্রমিক গত বছর আমার কারখানায় যোগ দিয়েছে যে নতুন মজুরী কাঠামো অনুযায়ী পাবে ৮ হাজার ৪০০ টাকা। কিন্তু কিছু সংখ্যক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যার বিদেশীদের অর্থের মদদে শ্রমিকদের উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে বিপথগামী করছে। আমরা আশঙ্কা করছি ক্রোনি গ্রুপের অবন্তী কালার টেক্সের শ্রমিকদেরকেও ভুল বুঝিয়ে ওই স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী উস্কানীর মাধ্যমে শান্ত পরিস্থিতি অশান্ত করে তুলতে পারে। তাই এ বিষয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি আরো বলেন, গত নভেম্বরে রপ্তানীর গ্রোথ যেখানে ২০ শতাংশের উপরে ছিল ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশেই উস্কানীদাতাদের কারণে গার্মেন্ট শিল্পে অস্থীতিশীল পরিবেশের কারণে রপ্তানীর গ্রোথ ১৮ ভাগ কমে গেছে। তিনি আরো বলেন, সকল শ্রমিক খারাপ নয়। ৯৫ ভাগ শ্রমিকই কাজ করতে চায়। কিন্তু ৫ ভাগ শ্রমিক রয়েছে যারা বিপথগামী হয়ে থাকে।

নারায়ণগঞ্জ শিল্প পুলিশের এসপি জাহিদুল ইসলাম জানান, শ্রমিক আন্দোলনের নামে অরাজকতা করলে শিল্প সম্পদ বাঁচাতে প্রয়োজেনে গুলি করতে হলে আমরা করব। এসব নিয়ে ছাড় নেই। আমরা এসব নাশকতাকারির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছ্।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও