লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫৯ পিএম, ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ বুধবার

লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১০ নং ওয়ার্ডের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে অবস্থিত বেসরকারী করণকৃত নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলটিতে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের কার্যক্রম এখনো বন্ধ হয়নি। হাইকোর্টের আদেশে কয়েক বছর ধরে মিলটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক। চলতি মাসের শুরুতে মিলটিতে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধের দাবিতে মিলটির বর্তমান চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়ার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছিল আন্দোলনরত শেয়ারহোল্ডাররা। তৎকালে জেলা প্রশাসক তাদেরকে আশ্বস্তও করেছিলেন। কিন্তু গত এক মাসেও বন্ধ হয়নি মিলটিতে নির্মাণ কাজ। বরং আগের চেয়ে বেশ জোরেশোরেই চলছে নির্মাণ কাজ। 

নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল শেয়ারহোল্ডার স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম জানান, নিট কনসার্ন গ্রুপ অবৈধভাবে মিলটির অভ্যন্তরে ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে অবৈধ পাইলিং কাজ, নির্মাণ সামগ্রী স্তুপিকৃতকরণ ও ভেকু দিয়ে মাটি অপসারণের কাজ করছে। গত ২ জানুয়ারী আমরা মিলটির বর্তমান চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়ার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে তাকে মিলটির বর্তমান অবস্থার কথা জানালে জেলা প্রশাসক বিষয়টি তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু নির্মাণ কাজ বন্ধ হওয়াতো দূরের কথা আগের চেয়ে বেশ জোরেশোরেই চলছে নির্মাণ কাজ। এ বিষয়ে মিলটির বর্তমান চেয়ারম্যান জেলা প্রশাসক যদি কোন পদক্ষেপ না নেন তাহলে মিলটি রক্ষায় আমরা বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতনদের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবো। 

আন্দোলনরত শেয়ারহোল্ডাররা জানান, ২০০১ সালে ২১ মার্চ ৫১০ জন শেয়ার হোল্ডারদের মালিক বানিয়ে মিলটি হস্তান্তর করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। পরে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন প্রধানের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ দীর্ঘ এক যুগ ধরে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করে বলে অভিযোগ শেয়ারহোল্ডারদের। সাবেক পরিচালনা পর্ষদ মিলটিতে একজন বিনিয়োগকারী নিয়োগের কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে ৩৮২ জনের শেয়ার হাতিয়ে নিয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করে। ১৮ একর ৬৫ শতাংশের উপর গড়ে ওঠা শতবছরের পুরনো এই মিলটির আনুমানিক মূল্য ৭০০ কোটি টাকা হলেও মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় মিলটি দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার লোকজন এমনটিই অভিযোগ শেয়ারহোল্ডারদের। ৫৩ জন শেয়ারহোল্ডার শেয়ার বিক্রি করতে রাজী না হওয়ায় তাদের উপর গত ৫ বছর ধরে চালানো হয়েছে নির্যাতনের স্টীম রোলার। ২০১৩ সালের ৩১ আগষ্ট বকেয়া বিলের অজুহাতে মিলের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় মিলের দুর্নীতিবাজ পরিচালনা পর্ষদ। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র নিয়ে হামলাও চালিয়েছে। ২০১৪ সালের ২১ অক্টোবর পরিচালনা পর্ষদের লোকজন শেয়ারহোল্ডারদের কলোনীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এক শেয়ারহোল্ডারের রিট পিটিশন অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারী হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চের জাস্টিস মোঃ রেজাউল হাসান নির্বাচন দেয়ার আদেশ দেন। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নিরপেক্ষ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে ও শেয়ারহোল্ডারদের সরাসরি ভোটে পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক পদে নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন। পরে ওই বছরের ১১ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বার্ষিক সাধারণ সভা আহবান করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। ওই দিন অবৈধ পরিচালনা পর্ষদের সন্ত্রাসী বাহিনী শেয়ারহোল্ডারদের সম্মেলনকক্ষে প্রবেশে বাধাঁ দেয়। এতে করে শেয়ারহোল্ডাররা বার্ষিক সাধারণ সভায় প্রবেশ না করে বাহিরেই অবস্থান নেন। পরে জেলা প্রশাসক নিট কনসার্ন গ্রুপের শেয়ার হস্তান্তরের কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে তাতে জয়েন্ট স্টক রেজিষ্টারের বৈধতা না পাওয়ায় বার্ষিক সাধারণ সভা স্থগিত করেন। যে কারণে হাইকোর্টের আদেশে অদ্যাবধি মিলটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক। 

এদিকে গত পাঁচ বছরে ধরে শেয়ারহোল্ডারদের কলোনীতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। গত ১৭ নভেম্বর । নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য এমপি শামীম ওসমান নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলের অভ্যন্তরে গণসংযোগে গেলে অর্ধশত শেয়ারহোল্ডার ও তাদের পরিবাররা দীর্ঘ ৫ বছর ধরে বিদ্যুৎহীন থাকার বিষয়টি অবগত করলে তিনি তাৎক্ষনিক ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। পরে গত ৪ ডিসেম্বর দুপুরে তাদের সংযোগ প্রদান করেছে ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ। 

শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগ, হাইকোর্ট ঐতিহ্যবাহী মিলটির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ভাঙচুরে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তাতে কোনরূপ কর্ণপাত করেনি বিগত দুর্নীতিবাজ পরিচালনা পর্ষদ এবং নিট কনসার্ন গ্রুপের মালিকপক্ষ ও তাদের লোকজন। বেশীরভাগ স্থাপনা ভেঙ্গে বিরানভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বেশ কিছু স্থানে পাইলিংও করেছে। ভেকু দিয়েও চলছে মাটি অপসারণের কাজ। পূর্বতন দুর্নীতিবাজ পরিচালনা পর্ষদ ও নিট কনসার্ন গ্রুপের লোকজন সেখানে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে নির্মাণ সামগ্রী স্তুপীকৃত করছে। অথচ মিলটি শ্রমিকদের কাছে হস্তান্তর করেছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। কিন্তু কিছুসংখ্যক দুর্নীতিবাজ পরিচালনা পর্ষদের কারণে ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের এই বিশাল মিলটি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় দখলে নিতে চাইছে নিট কনসার্ন গ্রুপ।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও