লবন নিয়ে জালিয়াতি : নিতাইগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১৭ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার

লবন নিয়ে জালিয়াতি : নিতাইগঞ্জে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

সাধারণ মানুষকে লবনের বদলে ‘বিষ’ খাওয়ানোর সিন্ডিকেটের হোতাদের সন্ধানে নেমেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইতোমধ্যে ৩টি লবনের কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এছাড়া দু’টি কারখানাকে অর্থদন্ড করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ৭ ফেব্রুয়ারী বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের নিতাইগঞ্জে অবস্থিত ৩টি লবনের কারখানায় অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বৃহস্পতিবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন আইনে পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানে নারায়ণগঞ্জ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকপক্ষকে অপরিস্কার অপরিচ্ছন্ন ও লবনে পর্যাপ্ত আয়োডিন না থাকায় নগদ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা এবং আলী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক পক্ষকে লাইসেন্স নবায়ন না থাকায় নগদ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ওই দু’টি প্রতিষ্ঠানসহ শাহে মদিনা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ এই ৩টি লবন কারখানা থেকে লবনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারী মোকাম। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ ও আশেপাশের এলাকায় বর্তমানে ২০ টির ন্যায় লবন মিল রয়েছে। এছাড়া লবন ব্যবসায়ী বা আড়তদার রয়েছেন ৩০ জনের ন্যায়। এই মোকাম থেকে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লবন সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দেশী লবন চাষ করার পর এটির রং থাকে লালচে। লবন মিলে এটি রিফাইন করার পর এটির রং সাদা হয়। দেশে লবণ বাজারজাত হচ্ছে ভ্যাকুয়াম, মেকানিক্যাল ও সনাতন এ তিন পন্থায় পরিশোধন হয়ে।

নারায়ণগঞ্জে দেশী লবনের সিংহভাগ আসে কক্সবাজার থেকে। দেশী লবন নারায়ণগঞ্জের মিলগুলোতে সনাতন পদ্ধতিতে লবন রিফাইন বা পরিশোধনের কাজ করে থাকে। এসিআই সল্ট লিমিটেড, ইউনাইটেড সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, পূবালী ভ্যাকুয়াম ইভ্যাপোরেটড সল্ট প্ল্যান্ট, ডায়না ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড ও মোল্লা সল্ট (ট্রিপল রিফাইনড) ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ক্রিস্টাল, মধুমতি, মুসকানসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ভ্যাকুয়াম ও মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে পরিশোধনের পর প্যাকেটজাত লবণ হিসেবে বাজারজাত করছে।

নিতাইগঞ্জ ও আশেপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা বেশীরভাগ লবনের মিলগুলোতে রিফাইন বা পরিশোধনের আধুনিক মেশিনারিজ নেই বললেই চলে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই সনাতন পদ্ধতিতে লবন পরিশোধন করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে কমপক্ষে একডজন লবন মিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট বা শিল্প লবনকে দেশীয় লবন বলে বাজারজাত করছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল লবন বা গ্লোবাল সল্ট এর সুবিধা হচ্ছে এটি দেখতে রিফাইন করা খাবার লবনের মতোই সাদা। তাই এটি আমদানী করার পরপর বস্তা খুলেই সাধারণ লবনের সঙ্গে মিশিয়ে ছোট ছোট প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করা যায়। শিল্প লবন রিফাইন করতে হয়না।

ফলে রিফাইন করা বাবদ টাকা বেঁচে যায়। ফলে এটি খুচরা বাজারে খাবার লবনের চাইতে কেজি প্রতি দশ থেকে বারো টাকা কমে বিক্রি করা যায়।

দাম কম হওয়ায় এ লবন দেশের বাজারে ব্যাপক চলছে। আর এ সুযোগে ভোক্তাদের প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একডজনের ন্যায় লবন মিল। নারায়ণগঞ্জের কয়েকজন মিল মালিক ও আড়তদার মিলে এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য বলে জানা গেছে। তবে ওই সিন্ডিকেটকে ডাইংয়ে ব্যবহারের জন্য আনা ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট সরবরাহ করছে চট্টগ্রামের কয়েকজন আমদানীকারক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লবন মিল মালিক ও আড়তদারদের অভিযোগ, বাংলাদেশ লবন মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি  ও শাহে মদিনা সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক দুলাল রায় হলেন ওই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা। তার বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ডিএস এন্টারপ্রাইজ। এছাড়া সে কুমিল্লা সল্ট ও বাণিজ্যালয় সল্টের সঙ্গেও জড়িত। এসকল প্রতিষ্ঠানে দুলাল রায়ের ছোট ভাই দিলীপ রায়ও জড়িত। এছাড়াও আলীগঞ্জের আজমেরী সল্ট ভাড়া নেয়া চট্টগ্রামের বাসিন্দা ব্রোকার জাহিদও এই শিল্প লবনের একজন ডিলার। তারা চট্টগ্রামের আমদানীকারকদের কাছ থেকে শিল্প লবন এনে নিজেদের কারখানায় কিংবা গোডাউনে মজুদ রেখে সেগুলো ছোট মিল মালিকদের কাছে সরবরাহ করে। তাদের পরেই অন্যতম হোতা হলো  কাশীপুর সল্ট ইন্ডাষ্ট্রিজের মালিক সোহাগ ও কোয়ালিটি সল্টের মালিক কমল সাহা। এছাড়াও ওই চক্রে আরো রয়েছে উত্তরা সল্ট ইন্ডাষ্ট্রিজের ছোট দুলাল, নারায়ণগঞ্জ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মোঃ মাইনউদ্দিন আহাম্মেদ, আলী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মোঃ রফিক, হারুন ট্রেডার্সের মোঃ বাবুল, সপ্তডিঙ্গা সল্ট ইন্ডাষ্ট্রিজের মোহন বাবু, খাজা গরীবে নেওয়াজ সল্ট ইন্ডাষ্ট্রিজের মালিক কামাল দেওয়ানসহ একডজন মিল মালিক ও ব্যবসায়ী। ওই সকল প্রতিষ্ঠানে আমদানীকৃত ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট বা শিল্প লবনকে রাতের আধাঁরে ছোট আকারের প্যাকেটে ভরে ফেলা হয়। কখনো বিএসটিআই কিংবা জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমান আদালত অভিযানে আসলে তারা যাতে পরীক্ষা করে কিছু ধরতে না পারে সেজন্য আয়োডিন মিশ্রিত সাধারণ লবনের সঙ্গেও এই শিল্প লবন মিশ্রন করা হয়। লোকচক্ষু ও প্রশাসনকে ফাঁকি দিতে গভীর রাত থেকে ভোর অবধি চলে ভেজালের এই কার্যক্রম।

প্রতিদিনই নিতাইগঞ্জের গোডাউনগুলোতে আসছে ডাইং ক্যামিকেল হিসেবে আমদানীকৃত ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট। বিশেষ করে নিতাইগঞ্জে শীতলক্ষ্যার তীরে গোডাউনগুলোতে ওই সকল ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট মজুদ করা হয়ে থাকে। এছাড়া মদনগঞ্জ এলাকাতেও কিছু গোডাউনে রয়েছে যেগুলোতেও ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট মজুদ করা হয়েছে।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরেই সাধারণ মানুষকে লবনের বদলে ‘বিষ’ খাওয়ানোর সিন্ডিকেটের হোতারা রয়ে গেছে ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। বরং অসাধু ওই চক্রের হোতারা অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বনে গেছে অঢেল সম্পদের মালিক। আলিশান বাড়ি, ফ্ল্যাট, বিলাশবহুল গাড়ির মালিকও। একসময় যাদের লবনের মিল চালানো দায় হয়ে পড়েছিল আজকে তাদের বিত্ত বৈভবের খতিয়ান শুনলে অনেকেরই চোখ কপালে উঠবে।

গত কয়েক মাসে লবনের বদলে সাধারণ মানুষকে বিষ খাইয়ে হঠাৎ করেই ধনকুবের বনে গেছে চক্রটি। কারণ আমদানি-নিষিদ্ধ খাওয়ার লবণের ওপর মোট ৮৯ দশমিক ৪২ শতাংশ শুল্ককর এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লবণ আমদানিতে ৩৭ শতাংশ শুল্ককর আরোপিত আছে। এই হারে শুল্ক পরিশোধের পরও প্রতি কেজিতে আমদানি খরচ হয় ৫ টাকা ৬৯ পয়সা। ফলে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে তা খাওয়ার লবণ হিসেবে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশীয় লবন বাজারজাত করা হচ্ছে ২৩ টাকা দরে। অথচ শিল্প লবনকে খাবার লবন হিসেবে বাজারজাত করা হচ্ছে ১৫-১৬ টাকা দরে। দাম কম হওয়ায় মফস্বল এলাকাগুলোতে এই লবন কম দামে কিনে নিচ্ছে বিভিন্ন পাইকাররা। আর সরকারের শুল্ক ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন অনেকেই। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন লবন কারখানার মালিক একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকও বনে গেছেন।

উল্লেখ্য সম্প্রতি দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ভোজ্য লবণ আমিদানি-নিষিদ্ধ হওয়ায় শিল্প লবণের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চাহিদার দ্বিগুণের বেশি আমদানি হওয়া শিল্প লবণ খোলাবাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর অপেক্ষা স্থানীয় বাজারে অপরিশোধিত লবণের মূল্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে অপরিশোধিত লবণের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে। স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীগণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশিয়ে বাজারজাত করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।’ ট্যারিফ কমিশন বলছে, কস্টিক সোডার কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাওয়ার লবণের মতোই। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে তার সঙ্গে সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার ও গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম ক্লোরাইড মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন, শিল্প লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন। কিন্তু গত অর্থবছর দেশে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ টন লবণ আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে প্রায় ৪ গুন বেশী ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট আমদানি করা হয়েছে।

এর মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ টন, হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ টন আমদানি হয়েছে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও