লবনের বদলে ‘বিষ’ এক চালানেই কোটিপতি

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪১ পিএম, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শনিবার

লবনের বদলে ‘বিষ’ এক চালানেই কোটিপতি

ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট ব্যবহার হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশিং পাউডার হিসেবে। এটি আমদানি করা হয় শিল্প লবণ হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, শিল্প খাতের ধবধবে সাদা এই দানাদার লবনে আয়োডিন মিশ্রিত করে বাজারজাত করা হচ্ছে।

শুধু ছোটখাট লবন মিল কিংবা আড়তদারই নয় বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লোকজনও এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। কারণ লবনের একটি চালান বাজারজাত করতে পারলেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার সুযোগ।

বিশেষ করে এক কেজি ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বিক্রি করে ওই অসাধু চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতি কেজি ১০ টাকা। ১০০০ টনের একটি চালান বাজারজাত করতে পারলেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে আমদানীকৃত সোডিয়াম সালফেট আসছে প্রায় ৫০ হাজার টন। এদিকে লবন নামধারী ওই ইন্ডাস্ট্রিয়াল সল্ট বা গ্লোবাল সল্ট তথা সোডিয়াম সালফেট খেতে থাকলে কিডনী ও লিভার নষ্ট ছাড়াও ক্যান্সার আক্রান্ত সহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

রসায়ন বিশেষজ্ঞ সূত্রে জানা যায়, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট বা ‘গ্লুবার সল্ট’ বাজারে ‘গ্লোবাল সল্ট’ নামে সমধিক পরিচিত। এর রাসায়নিক নাম ‘সোডিয়াম সালফেট ডেকাহাইড্রেট’। সাদা দানাদার এ পদার্থটি রাসায়নিকভাবে খুব সক্রিয়। ফলে সহজে বিযোজিত হয় না। কিন্তু অধিক তাপে বিযোজিত হলে নিরপেক্ষ লবণ হিসেবে থাকে। গ্লুবার সল্ট লন্ড্রিতে ডিটারজেন্ট, গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিতে ফাইনিং এজেন্ট (বাতাস দূর করার উপকরণ), কার্পেট ফ্রেশনার (ময়লা পরিষ্কারক) হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাছাড়া ডায়িং ও স্প্যানিং কারখানা, পেপার মিল, জুট মিল, চামড়া পরিশোধন, জুতার চামড়া পরিশোধন কারখানায় ব্যবহৃত হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্লেবাল সল্ট মানুষের শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে। সাধারণত যে লবণ (সোডিয়াম ক্লোরাইড) খাওয়া হয় তা সহজে হজম হয়। কিন্তু গ্লোবাল সল্ট সহজে হজম হয় না। বরং ডিহাইড্রেটেড প্রক্রিয়ায় পানি শোষণ করে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি করে। তা ছাড়া সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে মেশালে এর দ্রব্যতা কমে যায়। এ লবণ শরীর সহজে শোষণ করতে পারে না। এর প্রভাবে অ্যাজমা, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, নিম্ন রক্তচাপ সহ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগ দেখা দিতে পারে। এমনকি কিডনি ও লিভার নষ্ট, ক্যান্সার আক্রান্ত ও পেটের পীড়ার বহুমুখী রোগ বাসা বাঁধতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, সোডিয়াম ক্লোরাইডের (খাবার লবণ) সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশ্রিত হলে তা খাওয়া যাবে না। এই মিশ্রণটি মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তিনি বলেন, সোডিয়াম সালফেট সাধারণত পেপার মিল, টেক্সটাইল মিল, ডিটারজেন্ট তৈরিতে, ড্রাইং এজেন্ট (কাপড় পরিষ্কার) হিসেবে এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিসহ বিভিন্ন কলকারখানায় ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি মানবদেহের কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এছাড়াও নারী ও শিশুদের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি বলে জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সেলিম রেজা বলেন, আমি রসায়নের উপরে অধ্যয়ন করেছি। খাবার লবনের একটি ভৌত পরীক্ষা হলো এটি খোলা অবস্থায় রেখে দিলে সেটি আদ্রতা অর্থাৎ জলীয় বাস্প শোষনের মাধ্যমে ভিজে যায়। কিন্তু সেটা যদি না হয় তাহলে বুঝতে হবে ওই লবনে ভেজাল রয়েছে। 

এদিকে চাহিদার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি সোডিয়া সালফেট কেন এবং কারা আমদানি করছে তা নিয়ে কোন তদন্ত হচ্ছে না। উপরন্তু সোডিয়াম সালফেটের আমদানির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আগস্ট পর্যন্ত গত তিন মাসে সোডিয়াম সালফেট আমদানি হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার টন। অধিকাংশ চালান এসেছে চীন থেকে। কিছু কিছু থাইল্যান্ড, ইরানসহ কয়েকটি দেশ খেতে এসেছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে সোডিয়াম সালফেট আসছে প্রায় ৫০ হাজার টন। এত বিপুল পরিমাণ এ পণ্য কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার কোন নজরদারি নেই। প্রাপ্ত তথ্য মতে, এর একটি বড় অংশ এডিবল সল্ট হিসাবে মানুষের খাবারের লবণ হিসাবে বাজারজাতই হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ভোজ্য লবণ আমিদানি-নিষিদ্ধ হওয়ায় শিল্প লবণের আমদানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। চাহিদার দ্বিগুণের বেশি আমদানি হওয়া শিল্প লবণ খোলাবাজারে ভোজ্য লবণ হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারদর অপেক্ষা স্থানীয় বাজারে অপরিশোধিত লবণের মূল্য বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে অপরিশোধিত লবণের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য উৎসাহিত হচ্ছে। স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীগণ সোডিয়াম ক্লোরাইডের সঙ্গে সোডিয়াম সালফেট মিশিয়ে বাজারজাত করার ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।’

ট্যারিফ কমিশন বলছে, কস্টিক সোডার কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম সালফেট দেখতে খাওয়ার লবণের মতোই। অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ সোডিয়াম সালফেট আমদানি করে তার সঙ্গে সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার ও গার্মেন্ট শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা সোডিয়াম ক্লোরাইড মিশিয়ে বাজারে বিক্রি করছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৬ থেকে ১৭ লাখ টন, শিল্প লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন। কিন্তু গত অর্থবছর দেশে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৮ টন লবণ আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে প্রায় ৪ গুন বেশী ইন্ডাষ্ট্রিয়াল সল্ট আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে সোডিয়াম ক্লোরাইড ৮ লাখ ৯০ হাজার ১৮০ টন, হোয়াইট সোডিয়াম সালফেট ৫ লাখ ২৪ হাজার ৮৪ টন ও সোডিয়াম সালফেটস ২৬ হাজার ৫৩০ টন আমদানি হয়েছে।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও