আবারো বুড়িগঙ্গা দখল করে পলাশের সাম্রাজ্য

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:২২ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার

আবারো বুড়িগঙ্গা দখল করে পলাশের সাম্রাজ্য

৮ মাস আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লঞ্চঘাট থেকে পাগলা পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি অর্থদন্ড ও জব্দকৃত বালু ও পাথর নিলামে বিক্রি করা হয়েছিল। তবে কিছুদিন যেতে না যেতে আবারো শুরু হয়েছে নদী দখলের কার্যক্রম। বর্তমানে আবারো বুড়িগঙ্গা নদী দখল করে ফতুল্লার দাপা থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীরে জাতীয় শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের সাম্রাজ্য চলছে। নদীর তীরবর্তী কয়েক একর জায়গা দখল করে বসানো হয়েছে একাধিক সুউচ্চ ক্রেন। নদীর তীর ভরাট করে অবাধে চলছে বালু, পাথর ও কয়লার ব্যবসা। এমনকি নদীর তীর রক্ষায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়েতেও চলছে লোড আনলোডের কার্যক্রম।

জানা গেছে, ২০০৯ সালের জুন মাসে হাইকোর্ট রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু এই ৪টি নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’কে নির্দেশ দেয়। জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র যৌথ উদ্যোগে সিএস ও আরএস অনুযায়ী জরিপ করে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে। ২০১১ সালে শুরু হয় সীমানা নির্ধারণী পিলার স্থাপনের কাজ। ২০১২ সালে শুরু হয় শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গায় ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রভাশালী ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা বালু, পাথর, ইট, সুরকী, কয়লা, গাছের গুড়ি ফেলে ওয়াকওয়ে দখল করে রেখেছে। আবার কোথাও কোথাও রেলিং ভেঙ্গে গাছের গুড়ি গেড়ে বালু ইট সুরকী ফেলে নদী ভরাট করে এবং বাশের খুঁটিগেড়ে জেটি বানিয়ে মালামাল লোড আনলোড করে আসছে। যার কারণে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল । ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশ ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, সরকার কর্তৃক নির্মিত ওয়াকওয়ে তারা অন্যায়ভাবে ব্যবহার সঙ্গে ব্যবসার কারণে সেটা ভেঙে ফেলেছে।

এদিকে ওই জিডি দায়েরের পর ওই বছরের ২৮ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত একটানা পাগলা থেকে ফতুল্লার লঞ্চঘাট পর্যন্ত বিআইডিব্লিউটিএর নিবার্হী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম বানু শান্তির নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। ফতুল্লা থানা পুলিশ ও বিপুল সংখ্যক আনসার বাহিনীর সদস্য অংশ নেয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিআইডিব্লউটি এর ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম-পরিচালক আরিফ উদ্দিনসহ বিআইডব্লিউটিএ’র  অন্যান্য কর্মকর্তারা। ওই অভিযানে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ বুড়িগঙ্গার তীরে জাতীয় শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের সাম্রাজ্য তছনছ করে দেয়া হয়। পলাশের অনুগামী শ্রমিক নেতা মোকারম সর্দারকে ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন ভ্রাম্যমান আদালত। এছাড়া ফতুল্লা বালুরঘাট এলাকায় হাজী আলাউদ্দিনের অবৈধ বালুরঘাটের অবৈধ ১০টি স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জব্দকৃত বালু ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়। ওই অভিযানের কারণে দীর্ঘদিন ফতুল্লা লঞ্চঘাট থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত নদী দখলদারদের তৎপরতা বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আবারো সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বিতর্কিত শ্রমিক নেতা কাউসার আহাম্মেদ পলাশের সাম্রাজ্য।

এদিকে সরেজিমনে ফতুল্লা বালুরঘাটের সামনে নদীর তীর দখল করে চলছে বালু ও ইটের ব্যবসা। দাপা বালু ও পাথরঘাট এলাকায় নদীর কয়েকশ’ ফুট এলাকা ভরাট ও দখল করে বালু, পাথর ও চীনামাটির ব্যবসা করছেন একাধিক ব্যবসায়ী। এই এলাকার বেশ কিছু স্থানে ওয়াকওয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে একাধিক বাশের জেটি। ওয়াকওয়ের উপরেই চলছে বালু ও পাথরের ব্যবসা। ওয়াকওয়ের পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিশালাকারের ভারী ভারী পাথর। ওই পাথরের চাপে ওয়াকওয়ের অবস্থা করুন। যেন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি। অনেক স্থানেই ভেঙ্গে গেছে। আবার কোন কোন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশালাকারের একাধিক ক্রেন স্থাপন করে নদীর তীরে নোঙর করে রাখা বিশালাকারের জাহাজ থেকে পণ্য লোড আনলোড করা হচ্ছে। ওয়াকওয়ের উপরে ও নদীর তীরে বসানো হয়েছে একাধিক বিশালাকারের মেশিন। এই এলাকায় পলাশের সেকেন্ড হ্যান্ড হচ্ছেন মোহাম্মদ আলী ট্রেডিং করপোরেশনের মালিক মোহাম্মদ আলী। চিটাগাং থেকে জাহাজযোগে আনা পাথর স্তূপ করে রাখা হয়েছে নদীর তীরে।

আলীগঞ্জে টিসিবির ভবন সংলগ্ন এলাকা থেকে পিডব্লিউডি খেলার মাঠ পর্যন্ত এলাকাতেই মূলত ওয়াকওয়ের ত্রাহিদশা। আলীগঞ্জ মাদরাসা সংলগ্ন ঘাট থেকে কয়েকশ’ ফুট ওয়াকওয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে এখন ওয়াকওয়ের চিহ্ন বলতেই নেই। অনেক স্থানেই ওয়াকওয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। আলীগঞ্জ মাদরাসা ঘাটে নদীর তীর দখল করে বসানো হয়েছে একাধিক বিশালাকারের ক্রেন। ২/৩টি এক্সাভেটরও (ভেকু) রয়েছে। অবাধে চলছে বালু, কয়লার লোড আনলোডিং কার্যক্রম। স্তুপীকৃত করে রাখা হয়েছে বালু ও কয়লা। স্থাপন করা হয়েছে একাধিক বাশের জেটি। তবে এর পাশাপাশি চোরাই তেল বিক্রির একটি পল্টি দোকানও দেখা গেছে। ওয়াকওয়ের উপরেই ট্রাক থামিয়ে লোড আনলোড চলছে।

এ বিষয়ে এর আগে মোহাম্মদ আলী বলেছিলেন, আমি নদীর জায়গা দখল করি নাই। আমাদের শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশ।

জানা গেছে, ফতুল্লা, আলীগঞ্জ, পাগলাবাজার এলাকার ওয়াকওয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ করে এলাকার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তারা ব্যবসা করছে। আমাদের কোটি কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ভেঙে তারা সেখে কয়লা, বালু, সাদা সিমেন্ট সহ নানা রকম ব্যবসা করছে। অনেকেই কাউসার আহমেদ পলাশের নাম বলেছে। তার নেতৃত্বে ওখানে রশিদ হাজী, শাহাদাৎ হোসেন সেন্টু এরা বেশ কিছু প্রভাবশালী লোক এ কাজ করছে। মূলত এগুলোর মধ্যে কাউসার আহমেদ পলাশের নামই বেশি শোনা যাচ্ছে। তার ছত্রছায়া এগুলো হচ্ছে। যারা এখানে নতুন নতুন গদি বানাচ্ছে শোনা যাচ্ছে কাউসার আহমেদ পলাশ এগুলো উদ্বোধন করেছে। ফতুল্লার ২৩টি শ্রমিক সংগঠন পলাশের নিয়ন্ত্রনে।

বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক আরিফউদ্দিন বলেন, আমরা গত বছর মে মাসে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছিলাম। শীঘ্রই ওইসকল এলাকায় অভিযান চালানো হবে।

১৬ ডিসেম্বর দুপুরে জেলা সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গনে জেলার শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, দাড়ি রেখে টুপি মাথায় দিয়ে চাঁদা তুলবেন, হয় আপনি থাকবেন নয় আমি থাকব। গার্মেন্টস থেকে চাঁদা নিবেন, আবার শ্রমিকদের নিয়ে স্লোগান দিবেন তা হবে না।

এখানে উল্লেখ্য যে, কাউসার আহমেদ পলাশ নিজেকে ফতুল্লার একমাত্র ও অদ্বিতীয় শ্রমিক নেতা মনে করেন। খোদ আদালতে দায়ের করা জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে পলাশ ওই দাবী করেন। তাঁর দাবী, তিনি ফতুল্লার সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রমিক নেতা। শ্রমিক নেতা শব্দটি উচ্চারিত হলেই তাঁকেই প্রথম বোঝানো হয়।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন। ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।


বিভাগ : অর্থনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও